রাতের শেষে ভোর হয় এটাই স্বাভাবিক ৷ কিন্তু কোনটা বেশি সুন্দর রাত ? নাকি ভোর ? আস্তে আস্তে সূর্যের আভা ঢাকার রাজ পথে পড়ছে ৷ আলোয় নাকি অনেক কিছু ধরা পড়ে ৷ আলো নাকি অন্যায় অবিচার সব ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দেয় ৷ এখন তাহলে অমন একটা সময় ই হবে ৷ কাড়ন রাতের যত কুৎসিত, যত গ্লানি  আলোয় আলোকিত হয়ে যাবে ৷

রমনা পার্কের সাইট ধরে একটা ফুট পাথ এ বসে আছি ৷  মাথাটা প্রচুর ধরেছে ৷ কোনও একটা মেডিসিন খেয়ে সোজা বিছানায় যাওয়া উচিত ৷ কিন্তু কি এক নেশায় পেয়ে বসেছে ৷ উঠতে ইচ্ছে হচ্ছে না ৷ প্রচন্ড শীত ৷ কুয়াশা বৃষ্টির মত  পড়ছে ৷ কেউ আমার শার্ট ধরলে হয়তো বলবে ঘেমে ভিজে গেছে ৷ শীতে হুডি ছাড়া টিশার্ট  পড়ি না কিন্তু হায় আজ তা ও পড়ি নাই ৷ প্রচন্ড শীতে নির্ঘাত নিউমোনিয়া হবে মনে মনে হচ্ছে ৷ দূরে একটা ল্যাম্প পোষ্ট জ্বলছে ৷ তার নিচে দুটো ছোটো বাচ্চা একটা পাতলা বস্তা গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে ৷ একজনের পুরো শরীর ঢাকলে  আরেক জনের শরীর বের হয়ে যাচ্ছে ৷ কখনো হয়তো পা কখনো হয়তো হাত ৷ কিছুক্ষণ পর পর এ পুরো শরীর ঢাকছে তো ওর পাশে টানা পোড়ন হয়ে যাচ্ছে ৷ কিছুক্ষণ পড়ই সূর্য উঠবে ৷ আমার ধরণীর বুকে প্রাণ ফিরে আসবে  এই দুটো বাচ্চা ছেলে হয়তো আরেকটি রাত কোনও মতে কাটিয়ে দেওয়ার সময় গুনছে ৷

 

আমি ফুটপাথ এর যে পাশে বসে আছি তার অপর পাশে এক বৃদ্ধ সারা রাত ধরে কাতরাচ্ছে ৷

সম্ভবত কোনও অসুখে ভুগছে ৷ ব্যথায় যন্ত্রণায় এই নিশ্চুপ, স্তব্ধ রাতে যেন বোমা ফাটাচ্ছে ৷ আমি দু একবার ভেবেছিলাম দেখে আসব নাকি , কি সমস্যা ! কিন্তু আমাকে আজ কিসে পেয়ে বসেছে আমি জানি না ৷ আমি যেন ট্রাই পড়ে রাখা একটা ক্যামেরা ৷ রাতের আধার কেটে ভোর আসবে সেটা যেমন ক্যামেরায় বন্দি করতে হলে দীর্ঘ সময় ক্যামেরার রিল চলতে হয় আমিও যেন তেমন ৷ কোনও ভাবেই আমার যায়গা থেকে সরে যাওয়া  চলবে না ৷ আজ আমি  দেখতে চাই, পিচ ঢালা পথে কিভাবে ভোর আসে ৷

দূর থেকে একটা যান্ত্রিক শব্দ আসছে ৷ সম্ভবত অনেক দূর থেকে ৷ কিছুক্ষণ পড় বুঝতে পারলাম  একটা নয় দুটো ৷ একটা অবশ্যই পুলিশের গাড়ির সাইরেন ৷ কিছুক্ষণ পড়ে তা আবার মিলিয়ে ও গেল ৷ সূর্যের আভা এখন একটু একটু আসতে শুরু করেছে ৷ রমনা পার্কের গাছ গাছালির ফাঁক ফোকর দিয়ে অল্প বিস্তর আলোর আভা আসতে শুরু করেছে ৷  দূর থেকে রমনা পার্কের গার্ডদের বাঁশির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে ৷ পার্কের ভেতর দিয়ে আসার সময় বেশ কয়েক জনকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখেছি  ৷ ঘুমচ্ছিল বললে হয়তো ভুল হবে ৷ আরেকটি রাত পার করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছিল ৷ অপেক্ষা ছিল সেই কাঙ্ক্ষিত ভোর এর ৷

ব্যাপার টা অনেক অদ্ভুত ৷ সবাই ভোর এর অপেক্ষায় ৷ কিন্তু যখন ভোর আসবে তখন কি হবে ? আমরা কিছু যখন পেতে চাই,  পেয়ে গেলে কি করি ? কখনো ভেবে দেখে নি আমি ৷ কিছুক্ষণ ভাবতে চাইলাম পারলাম না ৷ আমার চিন্তায় ব্যধাত ঘটাল কিছু মানুষের উচ্চ স্বর  আর বাঁশির শব্দ ৷ কিছুক্ষণ পড় এক দল পুরুষ মহিলা বেড়িয়ে এল রমনা পার্ক থেকে ৷ দুজন দৌড় ও দিল ৷ বাকি যারা তাড়াও পা চালিয়ে কোন দিকে চলে গেল বোঝা গেল না ৷ গার্ডদের হাসি ঠাট্টার শব্দ পাওয়া গেল ৷ ফিরে যাচ্ছে ওরা ৷

সূর্যের আলো আসতে শুরু করেছে পুরো দমে ৷ রাস্তা ঘাট একদম পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে ৷ আমি ভাবলাম ব্যাপারটা কি হল ? সূর্য উঠার প্রতিটা মূহুর্ত দেখতে চেয়েছিলাম ৷ কিন্তু সূর্যটা কখন উঠে গেল ? কখন এত আলো ছড়াতে শুরু করল ? নিজের উপর বিরক্ত লাগল ৷ সারা রাত এই শীতে কষ্ট করে শেষ পর্যন্ত মূহুর্তটা আমার উপভোগ করা হল না ?

এগুলো যখন ভাবছিলাম  তখন দেখলাম  বাচ্চা দুটোর ঘুম ভেঙ্গেছে ৷ ঘুম ভেঙ্গেছে বললে হয়তো ভুল হবে ৷ ওদের আজ রাতের যুদ্ধে ওরা টিকে গেছে ৷ দুজন মিলে বস্তা টা গুছিয়ে গলা গলি করে চলে যাচ্ছে ৷ রাতে একজন যে আরেক জনের শরীর থেকে বস্তাটা নিয়ে যাচ্ছিল তা বেমালুম ভুলে গেছে ওরা ৷ দুজনের মুখে নিষ্পাপ একটা হাসি ৷ পেছন থেকে কোথা থেকে যেন একটা কুকুর দৌড়ে এল ওদের পেছনে ৷ কুকুর টাকে আয় আয় বলতে বলতে চলে যাচ্ছে ওরা , কিসের সন্ধানে যাচ্ছে কে জানে ৷ রাতের যুদ্ধ শেষে হয়তো এখন দিনের যুদ্ধের প্রস্তুতি পর্ব ৷ কুকুর টা ও যেন ওদের কথা বুঝতে পেরেছে ৷ ওদের পেছন পেছন কুকুর টা ও যাচ্ছে ৷ সম্ভবত কুকুর টা ও বুঝতে পেরেছে এই বাচ্চা দুটোর জীবন আর কুকুরটার জীবনের কোথায় যেন অনেক মিল !

মাথার ব্যথাটা বাড়ছে ৷ প্রচন্ড বাড়ছে ৷ কোনও কিছু পেয়ে গেলে সেটা পেয়েছি বুঝতেই পাওয়ার আনন্দের সময়টা চলে যায় ৷ ভোর ঠিকই সূর্যের আলো এনে দেয় ৷  তবে আলো কি আর্তনাদ গুলো, দুঃখ- কষ্ট, নোংরা মানুষিকতা গুলো, অন্যায় অবিচার গুলো কে ধুয়ে মুছে দেয়? নাকি আলোর গর্জনে সেগুলো স্রেফ ঢাকা পড়ে যায় ? আমাদের ব্যস্ততা গুলো কি আমাদের অমানুষ করে দিচ্ছে ? আমরা কি আলোয় আলোকিত হয়ে আলো ছড়ানোর ব্যস্ততায় ভুলে যাচ্ছি আলোর শেষে আধার এর কথা ? মানুষ বলে আলোয় নাকি ভাল দেখা যায় ! কিন্তু আমার কেন উল্টো হয় ? আমি কেন আধারে ভাল দেখি ৷ দিনের আলোয় কেন মানুষের কষ্ট গুলো দেখতে পাইনা ?  তবে কি আধার ই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমাদের বর্বরতাকে , আমাদের নিষ্ঠুরতাকে ? নাকি এ সমস্যা শুধু আমার ই ?

এখন আলোয় আলোকিত হয়ে গেছে  চার পাশ ৷ আমি আর ভাল দেখতে পাচ্ছি না ৷ মাথার ব্যথায় প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে ৷ সেই বৃদ্ধর কষ্টটা এখন বুঝতে পারছি ৷ বৃদ্ধটা এখন  কোনও শব্দ করছে না ৷ তার নিস্তর দেহটা পড়ে আছে ঢাকার পিচ ঢালা পথ এ ৷  ঢাকার পিচ ঢালা এই ব্যস্ত নগরীতে রাতের আগে কেউ হয়তো খেয়াল ই করবে না এই বৃদ্ধটা কে ৷ হয়তো গন্ধ ছড়ানো শুরু করলে কিছু মানুষ জড় হবে ৷ তার পর কোনও মতে তুলে নিয়ে মাটিতে পুতে ফেলা হবে৷  বাকি দায়িত্বটা প্রকৃতির ৷  আমি তো ক্যামেরা ম্যান ৷ আমার সামনে কেউ মড়ে গেলে আমার কিছু যায় আসে না ৷ আমি ব্যস্ত ছিলাম সূর্যোদয় এর ছবি মনে গেঁথে নেওয়ায় ৷ কে মরল তাতে আমার কি এসে যায় ৷ আমার দায়িত্ব অসাধারণ কিছু মূহুর্ত মনে গেঁথে নেওয়া আর কোনও দায়িত্ব আমার উপর দিও না ৷

আমি উঠে দাঁড়ালাম ৷ এবার বাড়ি ফিরতে হবে ৷  দিনের বেলায় আমি দেখতে পাই না ৷ দিনের আলোয় আমি অন্ধ হয়ে যাই ৷ মাথা ব্যথা সহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে ৷ কিছু একটা করা দরকার ৷

প্রথম প্রকাশিত , ২ জানুয়ারী ২০১৩