ফজলুল করিম সাহেবের গল্প – ২

এই লেখাটি পড়ার আগে ফজলুর করিম সাহেবের গল্প টি পড়ে আসুন ৷ আমি এইচআর-এ কাজ করি। অনেকে জিজ্ঞেস করে, "এইচআর মানে কী করো আসলে?" আমি বলি, "মানুষের কষ্টের কথা শুনি।" তারা একটু অবাক হয়। ভাবে, এটা আবার কোনো কাজ? আমিও মাঝে মাঝে ভাবি।

ভয় দিয়ে অফিস চলে, মানুষ চলে না

রফিকুল ইসলাম সাহেব সম্পর্কে একটা কথা চালু ছিল: "স্যার চেয়ারে বসলে চেয়ারটাও ভয় পায়।" হাসির গল্প। কিন্তু ভেতরে একটা বেদনা আছে।আমরা এইচআর-এ এটাকে বলি Toxic Culture বাংলায় বললে, ভয়ের সংস্কৃতি। যেখানে মানুষ কাজ করে, কিন্তু মনটা পড়ে থাকে ঘরে। যেখানে অফিসার সভায় বসে মাথা নাড়ে, কিন্তু ভেতরে ভাবে, "কথা বললে বিপদ।" এই পরিবেশে পারফরম্যান্স হয়। কিন্তু খুব ধীরে ধীরে ভেতর থেকে একটা ক্ষয় হতে থাকে। মানুষ ছেড়ে চলে যায়। ভালো আইডিয়াগুলো জন্মের আগেই মরে যায়। আর একদিন দেখা যায়, অফিসটা চলছে বটে, কিন্তু আসলে কেউ নেই।ফজলুল করিম সাহেব সেই অফিসে এলেন। আর প্রথম দিন পিয়নকে বললেন, "কালাম ভাই।"শুধু একটা "ভাই"। কিন্তু সেই একটা শব্দে পুরো অফিসের দেওয়াল একটু কাঁপল।

নেতা সবার শেষে কথা বলে

ফজলুল করিম সাহেবের একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে। তিনি মিটিংয়ে সবার শেষে কথা বলেন।এটা শুনতে ছোট ব্যাপার। আসলে এটা অনেক বড়।যে নেতা আগে কথা বলে, বাকি সবাই তার কথার সাথে মাথা মেলায়। কারণ কে আর ডিজিএম সাহেবের সাথে দ্বিমত করতে যাবে? ফলে সভায় অনেক মুখ থাকে, কিন্তু কণ্ঠ থাকে একটাই।আর যে নেতা শেষে কথা বলে, সে আগে শোনে। সবার কথা শোনে। জুনিয়র অফিসারের কথা শোনে। এমনকি ছয় মাসের প্রবেশনারি অফিসার নাজমুলেরও।নাজমুল প্রথমবার ডিজিএম সাহেবের কাছ থেকে প্রশ্ন পেয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। তারপর বন্ধুকে ফোন করে বলেছিল, "তুই বিশ্বাস করবি না।"এইচআর-এ এটাকে বলি Psychological Safety। মানে, কথা বললে বিপদ হবে না এই নিশ্চয়তা। এই নিশ্চয়তা ছাড়া মানুষ কখনো সত্যিকারের কাজ করতে পারে না। গবেষণা বলে, এই নিরাপত্তাবোধ না থাকলে অফিসে সেরা আইডিয়াগুলো কখনো বাইরে আসে না। সেগুলো ডেস্কের ড্রয়ারে পড়ে থাকে। অথবা মানুষের বুকের ভেতরে।

মানুষ দোষী নয়, সিস্টেম দায়ী

মনিরুল সাহেব ভুল করেছেন। ক্রেডিট ফাইলে গলদ। পুরনো পৃথিবীতে কী হতো? শোকজ। হয়তো সাসপেনশন। একটা ভয়ের বার্তা, যাতে বাকিরা ঠিকঠাক থাকে। কিন্তু ফজলুল করিম সাহেব বললেন, "ভুল থেকে শেখাটাই আসল।" তারপর বললেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা: "সমস্যা শুধু তোমার একার না। সিস্টেমেও গলদ আছে।" এই কথাটা বলতে অনেক সাহস লাগে। কারণ এই কথাটা স্বীকার করে যে আমরাও দায়ী। প্রতিষ্ঠানও দায়ী। আমরা এইচআর-এ বলি, Blame Culture থেকে বেরিয়ে Learning Culture তৈরি করো। কিন্তু করা সহজ না। কারণ শাস্তি দেওয়া সহজ, বোঝা কঠিন। মনিরুল সাহেব সেই ঘরে থেকে বের হয়েছিলেন চোখ লাল করে। কিন্তু মুখে একটা অদ্ভুত স্বস্তি ছিল। সেই স্বস্তিটাই আসল। ওটাই মানুষকে আবার কাজে ফেরায়। ভয় দিয়ে মানুষ কাজ করে, কিন্তু সম্মান দিয়ে মানুষ প্রাণ ঢেলে কাজ করে।

চুরি না করা একটা নেতৃত্বের গুণ

তানজিনা একটা আইডিয়া দিয়েছিল। ডিজিটাল ব্যাংকিং নিয়ে। ভালো আইডিয়া। ফজলুল করিম সাহেব সেটা তার নিজের নামে পাঠাননি। তানজিনার নামে পাঠিয়েছেন। এই ঘটনাটা শুনতে স্বাভাবিক মনে হয়। আসলে এটা ব্যতিক্রম। আমরা কর্পোরেট জগতে কতবার দেখেছি, জুনিয়রের আইডিয়া সিনিয়রের প্রেজেন্টেশনে যায়। কতবার দেখেছি, পরিশ্রমের কৃতিত্ব অন্য কারো ঘরে যায়। তানজিনা সেদিন কাঁদেনি। কিন্তু চোখ ভিজে গিয়েছিল। সেই চোখের জলের মধ্যে একটা বড় সত্য ছিল। মানুষ স্বীকৃতির জন্য প্রাণ দিতে পারে। আর এইচআর-এর ভাষায়, Recognition একটি সবচেয়ে সস্তা অথচ সবচেয়ে কার্যকর engagement টুল। টাকা ছাড়া, পদোন্নতি ছাড়া, শুধু একটু স্বীকৃতিতে মানুষ আরও পাঁচ বছর প্রতিষ্ঠানে থাকে।

পদবী ক্ষমতা দেয়, বিনয় প্রভাব দেয়

জাহাঙ্গীর সাহেব বলেছিলেন, "জুনিয়ররা মাথায় উঠবে।" এই ভয়টা অনেকের আছে। সিনিয়র অফিসাররা ভাবেন, সীমানা না রাখলে শৃঙ্খলা নষ্ট হয়। ফজলুল করিম সাহেব একটা কথা বলেছিলেন। গাছের গল্প। ফলের ভারে যে গাছ নুয়ে পড়ে, সেই গাছেই ফল থাকে। বছরের শেষে সংখ্যাটা বলে দিয়েছে। পারফরম্যান্স বেড়েছে ২৩ শতাংশ। স্টাফ টার্নওভার কমেছে। কমপ্লায়েন্স ইস্যু প্রায় শূন্য। এটাকে আমরা এইচআর-এ বলি Sustainable Performance through Culture। মানে, চাপ দিয়ে নয়, পরিবেশ তৈরি করে ফলাফল আনা। চাপের ফলাফল তাৎক্ষণিক। কিন্তু সেটা দীর্ঘস্থায়ী নয়। পরিবেশের ফলাফল ধীর। কিন্তু একবার তৈরি হলে সহজে ভাঙে না।

এইচআর আসলে কী করে?

এমডি সাহেব জিজ্ঞেস করেছিলেন, "সিক্রেট কী?" ফজলুল করিম সাহেব বলেছিলেন, "কোনো সিক্রেট নেই। আমি শুধু মানুষগুলোকে কথা বলতে দিয়েছি। শুনেছি। আর যেখানে আমি জানি না, সেটা স্বীকার করেছি।" এমডি সাহেব বলেছিলেন, "এটাই তো সবচেয়ে কঠিন কাজ।" এইটুকু কথার মধ্যে পুরো এইচআর-এর দর্শন আছে। শোনা। বিশ্বাস করা। নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা। আমরা এইচআর পেশাদাররা পলিসি বানাই, প্রক্রিয়া তৈরি করি, প্রশিক্ষণ পরিচালনা করি। কিন্তু আমাদের আসল কাজ হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যেখানে মানুষ তার সেরাটা দিতে পারে। সেই পরিবেশ তৈরি হয় না কড়াকড়ি দিয়ে। হয় বিশ্বাস দিয়ে।

আমরা কী চাই?

একটু থামি। আমরা এইচআর পেশাদার হিসেবে কী প্রতিষ্ঠা করতে চাই? চাই যে মনিরুল সাহেবরা ভুলের পর সংকুচিত না হোক, বরং শিখুক। চাই যে তানজিনারা জানুক তাদের আইডিয়া তাদেরই থাকবে। চাই যে নাজমুলরা মিটিংয়ে মুখ খুলতে পারুক, ভয়ে নয়, আগ্রহে। চাই যে কালামরা জানুক সে গুরুত্বপূর্ণ, শুধু চা বানায় বলেই নয়, মানুষ বলেই। এই চাওয়াগুলো পলিসি দিয়ে হয় না। হয় সংস্কৃতি দিয়ে। আর সংস্কৃতি তৈরি হয় একজন ফজলুল করিম সাহেবের মতো মানুষ দিয়ে। আমাদের কাজ হলো, সেই মানুষটাকে চেনা। তাকে সুযোগ দেওয়া। আর সম্ভব হলে, নিজেরাও একটু সেই মানুষটার মতো হওয়ার চেষ্টা করা। 

শেষে একটা ছোট কথা

চায়ের দোকানদার জিজ্ঞেস করেছিল, "আপনি কী করেন?" ফজলুল করিম সাহেব বলেছিলেন, "মানুষের কথা শুনি।" দোকানদার অবাক হয়েছিল। বলেছিল, "সেটাও একটা কাজ নাকি?" আমি এইচআর-এ কাজ করি। এই প্রশ্নটা আমার কাছেও আসে। আমি এখন বলি, হ্যাঁ। সবচেয়ে কঠিন কাজ। কারণ মানুষের কথা সত্যিকার অর্থে শুনতে হলে আগে নিজেকে একটু ছোট করতে হয়। নিজের পদবী, নিজের অভিজ্ঞতা, নিজের "আমি জানি" ভাবটা একটু সরিয়ে রাখতে হয়। এবং সেই ছোট হওয়ার মধ্যেই, ফজলুল করিম সাহেবের মতো, আসল বড় হওয়াটা লুকিয়ে থাকে। 

ফজলুল করিম সাহেবের গল্প

ফজলুল করিম সাহেব ব্যাংকের ডিজিএম হয়ে এসেছেন তিন মাস। তাঁর আগে যিনি ছিলেন, রফিকুল ইসলাম সাহেব, তিনি রিটায়ার করেছেন। রফিকুল সাহেব সম্পর্কে অফিসে একটা কথা চালু ছিল: "স্যার চেয়ারে বসলে চেয়ারটাও ভয় পায়।"

ফজলুল করিম সাহেব সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ। প্রথম দিন অফিসে এসে তিনি পিয়নকে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার নাম কী?"

পিয়ন আবুল কালাম একটু ঘাবড়ে গেল। এত বড় অফিসার নাম জিজ্ঞেস করছেন, এটা তার অভিজ্ঞতায় নেই। সে বলল, "জি স্যার, আবুল কালাম।"

"কালাম ভাই, আমাকে এক কাপ চা দেবেন? দুধ একটু কম দেবেন।"

কালাম প্রায় হোঁচট খেয়ে পড়ল। ডিজিএম সাহেব তাকে "ভাই" বলেছেন। এই ঘটনা দুপুরের মধ্যে পুরো অফিসে ছড়িয়ে গেল।

ফজলুল করিম সাহেবের একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে। তিনি মিটিংয়ে সবার শেষে কথা বলেন। প্রথমে সবাইকে বলতে দেন, জুনিয়র অফিসারদেরও। এমনকি প্রবেশনারি অফিসার নাজমুল, যে মাত্র ছয় মাস আগে জয়েন করেছে, তাকেও জিজ্ঞেস করেন, "নাজমুল, তোমার কী মনে হয়?"

নাজমুল প্রথমবার এই প্রশ্ন শুনে এতটাই চমকে গিয়েছিল যে কিছুক্ষণ কথাই বলতে পারেনি। পরে সে তার বন্ধু রাকিবকে ফোন করে বলেছিল, "তুই বিশ্বাস করবি না। ডিজিএম সাহেব আমার মতামত চাইছেন। আমার! ছয় মাসের প্রবেশনারি অফিসারের!"

রাকিব বলল, "লোকটা কি পাগল?"

নাজমুল বলল, "পাগল না। লোকটা অদ্ভুত।"

অফিসে একটা বড় সমস্যা হলো। এক কর্পোরেট ক্লায়েন্টের ঋণ নবায়নের ফাইলে গুরুতর ত্রুটি ধরা পড়ল। ক্রেডিট বিভাগের সিনিয়র অফিসার মনিরুল সাহেব দায়ী, এটা সবাই জানে। আগের ডিজিএম হলে মনিরুল সাহেবকে শোকজ করা হতো। হয়তো সাসপেনশন হতো। অফিসে একটা ভয়ের আবহ তৈরি হতো।

ফজলুল করিম সাহেব মনিরুল সাহেবকে ডাকলেন। দরজা বন্ধ করলেন। বাইরে সবাই কান পাতল। ভেতর থেকে কোনো চিৎকার এলো না। আধা ঘণ্টা পর মনিরুল সাহেব বের হলেন। তাঁর চোখ একটু লাল। কিন্তু মুখে একটা অদ্ভুত স্বস্তির ভাব।

পরে মনিরুল সাহেব তার সহকর্মী কে আমীনকে ললেন, "জানো স্যার কী বললেন? বললেন যে ভুল হতেই পারে। আমিও ভুল করি। কিন্তু ভুল থেকে শেখাটাই আসল। তুমি বলো, কোথায় সমস্যা হলো, আমরা একসাথে ঠিক করি।"

আমীন বলল, "সত্যি?"

মনিরুল সাহেব বললেন, "সত্যি। এবং সবচেয়ে বড় কথা, স্যার বললেন যে এই ফাইলের সমস্যাটা শুধু তোমার একার না। সিস্টেমেও গলদ আছে। আমরা সিস্টেমটাও দেখব।"

অফিসে একটা পরিবর্তন আসতে শুরু করল। ধীরে ধীরে, অনেকটা শীতের সকালে রোদ ওঠার মতো। টের পাওয়া যায় না, কিন্তু একসময় দেখা যায় চারদিক উষ্ণ হয়ে গেছে।

জুনিয়র অফিসাররা মিটিংয়ে কথা বলতে শুরু করল। আগে তারা চুপ করে বসে থাকত, নোট নিত, মাথা নাড়ত। এখন তারা আইডিয়া দেয়। কেউ কেউ খুব ভালো আইডিয়া দেয়। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের একটা নতুন প্রস্তাব এসেছে প্রবেশনারি অফিসার তানজিনার কাছ থেকে। ফজলুল করিম সাহেব সেটা ম্যানেজমেন্টে পাঠিয়েছেন, তানজিনার নামে।

তানজিনা যখন জানল তার নামে প্রস্তাবটা গেছে, সে বিশ্বাসই করতে পারেনি। সে ভেবেছিল স্যার নিজের নামে পাঠাবেন। বড় অফিসাররা তো সবসময় তাই করেন। জুনিয়রদের আইডিয়া নিজের বলে চালিয়ে দেন।

তানজিনা ফজলুল করিম সাহেবের রুমে গিয়ে বলল, "স্যার, আপনি আমার নামে..."

ফজলুল করিম সাহেব হাসলেন। তাঁর হাসিটা খুব সাধারণ। বললেন, "আইডিয়া তো তোমার। আমার নামে পাঠালে সেটা চুরি হয়ে যেত।"

তানজিনা কিছু বলতে পারল না। চোখ একটু ভিজে গেল।

কিন্তু সবাই কি ফজলুল করিম সাহেবকে পছন্দ করে? না। অফিসে কয়েকজন সিনিয়র অফিসার আছেন যাঁরা তাঁকে "দুর্বল" মনে করেন। তাঁরা বলেন, "এত নরম হলে চলে? ব্যাংকিং তো আর সমাজসেবা না।"

এসব কথা ফজলুল করিম সাহেবের কানে যায়। তিনি কিছু বলেন না। শুধু একটু হাসেন।

একদিন এভিপি জাহাঙ্গীর সাহেব সরাসরি বললেন, "স্যার, আপনি সবাইকে এত সুযোগ দিচ্ছেন। জুনিয়ররা মাথায় উঠবে।"

ফজলুল করিম সাহেব চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। বললেন, "জাহাঙ্গীর সাহেব, একটা গাছ যখন বড় হয়, তখন সে নিচু হয়ে যায়। ফলের ভারে। যে গাছে ফল নেই, সে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।"

জাহাঙ্গীর সাহেব কিছু বলতে পারলেন না।

বছরের শেষে ব্রাঞ্চের পারফরম্যান্স রিভিউ হলো। ফলাফল দেখে সবাই অবাক। ফজলুল করিম সাহেবের অধীনে থাকা ব্রাঞ্চগুলোর পারফরম্যান্স ২৩ শতাংশ বেড়েছে। স্টাফ টার্নওভার কমেছে। কমপ্লায়েন্স ইস্যু প্রায় শূন্যের কাছে।

হেড অফিসে প্রেজেন্টেশনের সময় এমডি সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, "ফজলুল সাহেব, আপনার সিক্রেট কী?"

ফজলুল করিম সাহেব বললেন, "কোনো সিক্রেট নেই স্যার। আমি শুধু মানুষগুলোকে কথা বলতে দিয়েছি। শুনেছি। আর যেখানে আমি জানি না, সেটা স্বীকার করেছি।"

এমডি সাহেব একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, "এটাই তো সবচেয়ে কঠিন কাজ।"

অফিস শেষে ফজলুল করিম সাহেব হেঁটে বাসস্ট্যান্ডে যান। তাঁর গাড়ি আছে, কিন্তু তিনি মাঝে মাঝে হাঁটতে পছন্দ করেন। পথে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা খান। দোকানদারকে জিজ্ঞেস করেন, "ব্যবসা কেমন?"

দোকানদার জানে না এই ভদ্রলোক একটা ব্যাংকের ডিজিএম। সে শুধু জানে, লোকটা ভালো। কথা বলতে ভালো লাগে।

একদিন দোকানদার জিজ্ঞেস করল, "আপনি কী করেন?"

ফজলুল করিম সাহেব বললেন, "চাকরি করি।"

"কোথায়?"

"একটা ব্যাংকে।"

"কী করেন ব্যাংকে?"

ফজলুল করিম সাহেব একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, "মানুষের কথা শুনি।"

দোকানদার হাসল। বলল, "সেটাও একটা কাজ নাকি?"

ফজলুল করিম সাহেব চায়ে চুমুক দিলেন। বললেন, "সবচেয়ে কঠিন কাজ।"

রাতে বাসায় ফিরে ফজলুল করিম সাহেব বারান্দায় বসেন। ঢাকা শহরের আকাশে তারা দেখা যায় না। কিন্তু তিনি জানেন তারা আছে। মেঘ আর ধোঁয়ার আড়ালে লুকিয়ে আছে।

তাঁর মনে পড়ে তাঁর বাবার কথা। বাবা ছিলেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। সারাজীবন মানুষকে শিখিয়েছেন। কিন্তু নিজে বলতেন, "আমি এখনো শিখছি।"

বাবা আরেকটা কথা বলতেন যা ফজলুল করিম সাহেব কখনো ভোলেননি: "যে মানুষ নিজেকে ছোট করতে পারে, সে আসলে সবচেয়ে বড়।"

ফজলুল করিম সাহেব জানেন যে এই কথাটা পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করে না। মানুষ বিশ্বাস করে পদ, ক্ষমতা, টাকা, এসবই মানুষকে বড় করে। কিন্তু তিনি দেখেছেন যে পদ চলে যায়। ক্ষমতা চলে যায়। টাকাও চলে যায়। যা থাকে, সেটা হলো মানুষের মনে একটুকরো জায়গা।

সেই জায়গাটুকু পেতে হলে বিনয় লাগে। আর বিনয় কোনো দুর্বলতা নয়। এটা একটা শক্তি। পৃথিবীর সবচেয়ে নীরব শক্তি।

পরদিন সকালে অফিসে ঢুকতে ঢুকতে ফজলুল করিম সাহেব দেখলেন কালাম দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। কালাম বলল, "স্যার, আজ চা কেমন করে দেব?"

ফজলুল করিম সাহেব হাসলেন। বললেন, "আজ তুমি ঠিক করো কালাম ভাই। তুমি তো আমার চেয়ে চা বেশি বোঝো।"

কালাম হাসল। জীবনে প্রথমবার সে অনুভব করল যে সেও গুরুত্বপূর্ণ। তারও মতামত আছে। তারও একটা পরিচয় আছে।

এবং সেই মুহূর্তে, সেই ছোট্ট হাসির মধ্যে, বিনয়ের আসল অর্থটা ফুটে উঠল। পদবি মানুষকে ক্ষমতা দেয়। কিন্তু বিনয় মানুষকে প্রভাব দেয়। আর প্রভাব, সেটাই তো আসল শক্তি।

সমাপ্ত।

এই লেখাটি ভাল লাগলে "একজন এইচআর পেশাদারের চোখে ফজলুল করিম সাহেবের চরিত্র বিশ্লেষণ" লেখাটিও পড়তে পারেন ৷

প্রতিষ্ঠানে Natural Justice / সুবিচার নিশ্চিত না করে কাউকে শাস্তি দিলে যা হয় !

গত সপ্তাহে পুরনো এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো।

বন্ধুর নাম বলব না। বললে সে লজ্জা পাবে। মানুষ লজ্জা পেলে কষ্ট পায়। আমি কাউকে কষ্ট দিতে ভালোবাসি না, অন্তত ইচ্ছা করে তো নয়ই। বন্ধুটির নাম না হয় রাখলাম "করিম"। এটা তার আসল নাম নয়। কিন্তু নামে কী আসে যায়? শেক্সপিয়ার বলেছিলেন, গোলাপকে যে নামেই ডাকো, তার গন্ধ একই থাকে। করিমকে যে নামেই ডাকি না কেন, তার চোখের ক্লান্তি একই থাকবে ।

করিম কাজ করে দেশের একটা বড় ফাইনান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানে। কতটা বড়? এতটাই বড় যে, রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে তাদের সাইনবোর্ড দেখে মাথা উঁচু করতে হয়। বিশাল কাচের দরজা, ঝকঝকে লবি, গেটে দাঁড়ানো দারোয়ানের ইউনিফর্ম পর্যন্ত ইস্ত্রি করা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, ভেতরে যারা কাজ করে তারা নিশ্চয়ই সুখী মানুষ। কিন্তু করিম ভেতরে কাজ করে। করিম জানে আসল গল্পটা কী।

আমরা বসেছিলাম একটা ছোট চায়ের দোকানে। দোকানটা পুরনো। বেঞ্চগুলো একটু নড়বড়ে। চায়ের কাপে হালকা দাগ। কিন্তু চা ভালো। এই শহরে দামি রেস্তোরাঁয় অনেক কিছু পাওয়া যায়, কিন্তু ভালো চা পাওয়া কঠিন। ভালো চা পেতে হলে এরকম পুরনো, একটু ভাঙাচোরা দোকানেই আসতে হয়। মানুষের বেলাতেও হয়তো এই কথা সত্যি। ভালো মানুষ পেতে হলে একটু ভেতরে তাকাতে হয়। চকচকে বাইরের দিকে তাকালে চলে না।

করিম চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, "ইয়ার, অফিসের কথা আর বলতে ইচ্ছে করে না।" আমি বললাম, "তাহলে বলিস না।" সে বলল, "কিন্তু না বললেও তো ভালো লাগছে না।" এই হলো মানুষের সমস্যা। কষ্টের কথা বলতেও চায় না, না বলেও থাকতে পারে না। আমি চুপ করে রইলাম। চুপ থাকাটাই কখনো কখনো সবচেয়ে বড় সাহায্য।

করিম বলল। অনেকক্ষণ ধরে বলল। আমি শুনলাম। মাঝে মাঝে মাথা নাড়লাম। একবার "হুম" বললাম। একবার "তাই নাকি" বললাম। এর বেশি কিছু বলার ছিল না। সে যা বলল তার সারমর্ম হলো এরকম। তার প্রতিষ্ঠানে কিছু একটা হয়েছে। একটা অভিযোগ। একটা তদন্ত। একটা শাস্তি। এই তিনটা জিনিস পরপর ঘটেছে, কিন্তু এর মাঝখানে যা থাকার কথা ছিল তা ছিল না। ন্যায্যতা ছিল না। সুবিচার ছিল না। একটু মানবিক আচরণ ছিল না।

যাই হোক। করিমের কথা থেকে একটু বেরিয়ে আসি। বেরিয়ে আসতে হবে, কারণ আজকে আমি একটু অন্য কথা বলতে চাই। বলতে চাই সেই প্রশ্নটার কথা, যেটা করিমের মুখের দিকে তাকিয়ে আমার মাথায় এসেছিল। প্রশ্নটা হলো, কোনো প্রতিষ্ঠান যখন কাউকে শাস্তি দেয়, তখন সেটা কতটুকু আইনসম্মত? আদালত সেই শাস্তির দিকে কীভাবে তাকান? কোন মাপকাঠিতে বিচার করেন? আমি জানি, এই প্রশ্ন শুনলে অনেকে ভাবছেন আহা, আইনের কচকচানি শুরু হলো। কিন্তু একটু ধৈর্য ধরুন। এই বিষয়টা আসলে শুধু আইনের না, এটা মানবিক মর্যাদার কথা। এটা করিমের মতো লক্ষ লক্ষ মানুষের কথা, যারা প্রতিদিন অফিসে যায়, কাজ করে, এবং আশা করে যে অন্তত তাদের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করা হবে।

আদালত প্রথমেই যেটা দেখেন, সেটা হলো নিয়মকানুনের বিষয়। প্রসিডিউরাল কমপ্লায়েন্স। নামটা ইংরেজি, কিন্তু ব্যাপারটা সহজ। মানে হলো, শাস্তি দেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠান কি নিয়ম মেনেছে? আশ্চর্যের বিষয় হলো, অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেদের বানানো নিয়মই মানে না।

প্রথম যে ধাপটা আদালত দেখেন সেটা হলো অভিযোগের নোটিশ, যাকে চার্জশিট বলে। করিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। ঠিক আছে, থাকতেই পারে। কিন্তু সেই অভিযোগটা কি তাকে লিখে জানানো হয়েছে? সুনির্দিষ্টভাবে? "তুমি অমুক তারিখে অমুক কাজ করেছ" এভাবে? নাকি শুধু মৌখিকভাবে বলা হয়েছে, "তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে" এইটুকু? এই পার্থক্যটা আকাশ-পাতাল। কারণ লিখিত চার্জশিট না পেলে করিম জানবে কীভাবে সে কোন বিষয়ে জবাব দেবে? অন্ধকারে তীর ছোঁড়া আর আত্মপক্ষ সমর্থন এক জিনিস নয়।

চার্জশিট পেলেই হবে না। করিমকে সময় দিতে হবে। পর্যাপ্ত সময়। সে যাতে ভালো করে ভেবেচিন্তে লিখিত জবাব দিতে পারে। তাড়াহুড়া করে "কাল সকালের মধ্যে জবাব দাও" বললে চলবে না। এটা শাস্তি দেওয়ার তাড়া, সুবিচারের আগ্রহ নয়। এরপর আসে তদন্ত কমিটির প্রশ্ন। তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে, এটা নিয়ম। কিন্তু কমিটিতে কারা থাকবে? ধরুন, যে ব্যক্তি করিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে, তার বন্ধু তদন্ত কমিটিতে। অথবা যে কর্মকর্তা করিমকে এমনিতেই পছন্দ করেন না, তিনি কমিটির প্রধান। এই কমিটির রিপোর্ট যাই আসুক না কেন, সেটা কি নিরপেক্ষ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে? নেই। আদালতও সেটা জানেন।

তদন্ত চলছে। করিম কি সেই তদন্তে নিজে উপস্থিত থাকতে পারবে? নিজের কথা বলতে পারবে? তার পক্ষে সাক্ষী দাঁড় করাতে পারবে? বিপক্ষের সাক্ষীকে জেরা করতে পারবে? যদি না পারে, তাহলে এটা তদন্ত নয়, এটা একটা পূর্বনির্ধারিত নাটক। তদন্ত শেষ হলো। রিপোর্ট জমা হলো। কিন্তু রিপোর্টে কি আছে? তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ আছে? নাকি শুধু আছে, "আমরা মনে করি অভিযুক্ত দোষী" এই একটা লাইন? একটা যুক্তিসঙ্গত রিপোর্টে থাকতে হবে কী অভিযোগ ছিল, কী প্রমাণ পাওয়া গেল, অভিযুক্ত কী বলল, এবং সব মিলিয়ে কমিটি কেন এই সিদ্ধান্তে এল। এই ব্যাখ্যাটা না থাকলে রিপোর্ট রিপোর্ট নয়, শুধু কাগজ। এবং সবশেষে, শাস্তিটা কি সঠিক কর্তার অনুমোদনে দেওয়া হয়েছে? প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার একটা কাঠামো থাকে। সেই নিয়ম না মানলে শাস্তিটাই অবৈধ, যতই যুক্তিসঙ্গত হোক না কেন। এই ধাপগুলোর যেকোনো একটাতেও যদি ফাঁক থাকে, আদালত বলে দেবেন, এই শাস্তি টেকসই নয়।

আমি করিমের কথা মনে করলাম। এই ধাপগুলোর কোনোটা কি তার ক্ষেত্রে সঠিকভাবে মানা হয়েছিল? তার ক্লান্ত চোখ দেখে মনে হলো, না।

এখন আসি আরও গভীর একটা জায়গায়। ধরুন, ওপরের সব ধাপ মানা হলো। চার্জশিট দেওয়া হলো, সময় দেওয়া হলো, কমিটি হলো, শুনানি হলো, রিপোর্ট হলো, সঠিক কর্তার অনুমোদন হলো। সব ঠিকঠাক। কিন্তু তারপরও আদালত থামেন না। তারপরও আদালত জিজ্ঞেস করেন, পুরো ব্যাপারটা কি সত্যিকার অর্থে ন্যায্য ছিল? এই প্রশ্নটা হলো ন্যাচারাল জাস্টিসের প্রশ্ন।

"ন্যাচারাল জাস্টিস" শব্দ দুটো আমার বেশ পছন্দের। প্রাকৃতিক বিচার। এমন বিচারের নিয়ম যেটা কোনো আইনের বইয়ে লেখা নেই, কিন্তু তবু যেকোনো সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষ সহজাতভাবে বোঝেন। কারণ এটা মানবিক। কারণ এটা স্বাভাবিক। ধরুন, আপনার পাঁচ বছরের ছেলে রান্নাঘরে গিয়ে বিস্কুটের কৌটা খুলেছে। বিস্কুট খেয়েছে। আপনি শাস্তি দিতে চান। কিন্তু শাস্তি দেওয়ার আগে কি একটু জিজ্ঞেস করবেন না, "কেন খেয়েছ?" হয়তো সে বলবে, "মা, আমার অনেক ক্ষিদে পেয়েছিল।" অথবা বলবে, "দাদা বলল খেতে।" না শুনে শাস্তি দিলে কী হয়? শাস্তিটা হয়তো শারীরিকভাবে প্রয়োগ হয়, কিন্তু ন্যায্য হয় না। এটাই ন্যাচারাল জাস্টিসের প্রথম স্তম্ভ।

ল্যাটিন ভাষায় "Audi Alteram Partem।" উচ্চারণটা কঠিন, কিন্তু অর্থটা সহজ। অন্য পক্ষের কথাও শোনো। এটা কেবল আইনি নিয়ম নয়, এটা মানবিক দায়িত্ব। যাকে শাস্তি দেবে, তাকে আগে কথা বলতে দাও। তার যদি কোনো ব্যাখ্যা থাকে, শোনো। তার যদি কোনো প্রমাণ থাকে, দেখো। তারপর সিদ্ধান্ত নাও। একপক্ষের কথা শুনে যদি সিদ্ধান্ত নাও, তাহলে সেটা সিদ্ধান্ত নয়, সেটা পক্ষপাত। করিমের ক্ষেত্রে কি এটা হয়েছিল? সে কি সত্যিকার অর্থে তার কথা বলার সুযোগ পেয়েছিল? নাকি শুধু কাগজে কলমে একটা সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যেটা ব্যবহার করলে কোনো লাভ হতো না? এই দুটো জিনিসের মধ্যে পার্থক্য আছে। আদালত সেই পার্থক্য বোঝেন।

ন্যাচারাল জাস্টিসের দ্বিতীয় স্তম্ভটা আরও সহজ করে বলি। ধরুন, আপনি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন। এখন সেই অভিযোগের তদন্ত করবেন আপনার বন্ধু, যিনি আপনাকে খুব পছন্দ করেন এবং আমাকে একদম পছন্দ করেন না। তদন্ত হলো। রিপোর্ট এল। স্বাভাবিকভাবেই রিপোর্টে লেখা আছে আমি দোষী। এই রিপোর্ট কি বিশ্বাসযোগ্য? না। কারণ তদন্তকারীর স্বার্থ ছিল। তার মনে আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল। ল্যাটিন ভাষায় একে বলে "Nemo Judex in Causa Sua" ৷ কেউ নিজের মামলার বিচারক হতে পারে না। আদালত এই ব্যাপারটা খুব ভালো করে বোঝেন। যদি প্রমাণ হয় যে তদন্তকারী বা বিচারকের একটুও পক্ষপাত ছিল, একটুও ব্যক্তিগত আক্রোশ ছিল, পুরো প্রক্রিয়াটাই অবৈধ হয়ে যায়। কাগজে কলমে সব ঠিক থাকলেও।

এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলি। ন্যাচারাল জাস্টিস লিখিত আইনের মতো নয়। লিখিত আইনে নির্দিষ্ট থাকে, এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে। কিন্তু ন্যাচারাল জাস্টিস হলো একটা উচ্চতর মানদণ্ড। এখানে বিচারক নিজের প্রজ্ঞা ব্যবহার করেন। সার্বিক পরিস্থিতি দেখেন। বলেন, "এই ঘটনার সামগ্রিক চরিত্রটা কি সুবিচারের ছিল?" যদি উত্তর "না" হয়, তাহলে সব নিয়ম মানলেও শাস্তি টেকে না। এটাই ন্যাচারাল জাস্টিসের সৌন্দর্য। এটা কেবল আইনের ভাষায় কথা বলে না, এটা মানবিক বিবেকের ভাষায় কথা বলে।

আমার মনে পড়ছে ছোটবেলার একটা ঘটনা। স্কুলে একবার ক্লাসের জানালার কাচ ভেঙে গেল। হেডস্যার সবাইকে লাইনে দাঁড় করালেন। তারপর যে ছেলেটা সবচেয়ে দুষ্টু, তাকে ডেকে বললেন, "তুই ভেঙেছিস, তাই না?" ছেলেটা বলল, "না স্যার, আমি করিনি।" হেডস্যার বললেন, "তুই মিথ্যা বলছিস। তুই সবসময় দুষ্টামি করিস।" ছেলেটাকে শাস্তি দেওয়া হলো। পরদিন জানা গেল, আসলে অন্য একটা ছেলে লুকিয়ে বল দিয়ে খেলতে গিয়ে কাচ ভেঙেছিল। হেডস্যার পূর্ব ধারণা দিয়ে বিচার করেছিলেন। তদন্ত করেননি। অন্য পক্ষের কথা শোনেননি। আর যাকে সন্দেহ করেছিলেন, তাকেই দোষী ধরে নিয়েছিলেন। এটাই ন্যাচারাল জাস্টিসের লঙ্ঘন। ছোট স্কুলে হোক বা বড় কর্পোরেট অফিসে, নীতিটা এক।

চায়ের দোকান থেকে বের হওয়ার পর অনেকক্ষণ হাঁটলাম। মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল। এই দেশে, এই শহরে, এই মুহূর্তে, করিমের মতো কতজন মানুষ আছে? যারা প্রতিদিন অফিসে যাচ্ছে। কাজ করছে। এবং ভেতরে ভেতরে জানছে যে তাদের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ হচ্ছে না, কিন্তু কিছু করার নেই বলে মনে করছে। হয়তো অনেকজন।

কিন্তু আসলে কিছু করার আছে। আইন আছে। আদালত আছে। এবং আদালত এই বিষয়গুলো খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন। প্রতিষ্ঠান শৃঙ্খলা রাখবে, এটা ঠিক আছে। শৃঙ্খলা ছাড়া প্রতিষ্ঠান চলে না। কিন্তু শৃঙ্খলার নামে যদি কাউকে অবিচার করা হয়, তাহলে সেটা শৃঙ্খলা নয়, সেটা ক্ষমতার অপব্যবহার। একটা ভালো প্রতিষ্ঠান শৃঙ্খলা এবং সুবিচার দুটোই একসঙ্গে রাখতে পারে। এই ভারসাম্যটাই একটা প্রতিষ্ঠানকে শুধু বড় নয়, মানবিক করে তোলে।

বাসায় ফিরে রাতে ঘুমাতে পারছিলাম না। করিমের কথা মনে পড়ছিল। তার ক্লান্ত চোখের কথা। জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবলাম, এই শহরে কত মানুষ এখন ঘুমাতে পারছে না। কত মানুষ কত রকম কষ্ট বুকে নিয়ে শুয়ে আছে। কেউ কেউ হয়তো আমার মতোই জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। এই শহরটা অনেক বড়। অনেক জটিল। কিন্তু মানুষের মনের দুঃখটা খুব সরল। তারা শুধু চায়, কেউ তাদের কথাটা শুনুক।

করিমও সেটাই চেয়েছিল। আমি শুনেছিলাম। কিন্তু আমার শোনায় তার চাকরির সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। তবু সে হয়তো একটু হালকা হয়েছিল। মানুষ কখনো কখনো সমাধান নয়, শুধু একজন শ্রোতা খোঁজে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের আগামী ১০ বছরের পূর্বাভাস

সামনের দশটা বছর খুব অদ্ভুত একটা সময় হতে যাচ্ছে। ভাবছেন সব যেমন আছে তেমনি চলবে? মোটেই না। বরংচ, বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর জন্য অপেক্ষা করছে এক বিরাট ওলট-পালট। এই ওলট-পালটের যুগে কী হতে পারে, তা নিয়ে কিছু কথা ভাবা যাক।

১. মেধাবীদের নিয়ে কাড়াকাড়ি

একটা ‘যুদ্ধ’ লেগে যাবে। তবে গোলাগুলির যুদ্ধ নয়, মেধাবী মানুষ চুরির যুদ্ধ। নতুন, চটপটে ডিজিটাল ব্যাংকগুলো পুরোনো, ঢিমেতালের ব্যাংক থেকে সব ভালো ভালো কর্মী যেমন হিউম্যান রিসোর্স, ডেটা, ক্রেডিট রিস্ক এনালিস্ট, আইটি এক্সপার্টদের ফুসলিয়ে নিয়ে যাবে। শুধু বেশি বেতনের লোভ দেখিয়ে নয়, পুরোনো আমলাতান্ত্রিক পরিবেশ থেকে মুক্তির আনন্দ দেখিয়েও। পুরোনো ব্যাংকগুলো হঠাৎ দেখবে, তাদের সব মাথাওয়ালা লোক হাওয়া।

২. সহজ ঋণ

বিকাশ বা নগদের মতো কোম্পানিগুলো আর শুধু টাকা পাঠানোর কাজে বসে থাকবে না। তারা রাতারাতি ‘ঋণের রাজা’ হয়ে উঠবে। তাদের কাছে থাকা কোটি কোটি মানুষের তথ্যের এনালাইসিস এআই দিয়ে এনালাইসিস করে এক মুহূর্তেই ছোট ছোট ঋণ দিয়ে দেবে। জামানত লাগবে না, কোনো কাগজে সই লাগবে না। পুরোনো ব্যাংকগুলো তাদের খাতা-কলমের হিসেব নিয়ে যা কোনোদিনও পারেনি, এরা তা করে দেখাবে।

৩. ডিজিটাল ঝড়

ব্যাংক খোলার জন্য তো সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। কিন্তু ব্যাংক খোলা তো আর মুদি দোকান দেওয়া নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩০০ কোটি টাকার একটা বিশাল শর্ত আছে। দেখা যাবে, এই নতুন স্বপ্নবাজদের অনেকেই শুরু করার আগেই ঝরে গেছে। যারা অনেক টাকা আর বড় বড় নাম নিয়ে আসবে (যেমন মোবাইল কোম্পানি বা বড় শিল্প গ্রুপ), কেবল তারাই টিকে থাকবে।

বোনাস: তবে ২০ - ২৫ বছর পর খুব সম্ভবত তখনকার দিনের ২০ - ৩০ কোটি টাকা দিয়েই ব্যাংক খোলা যাবে ৷ সেই ব্যাংকের মালিক এক মালিকানা বা ২-৩ জন হবে ৷ সর্বচ্চ ১০-৩০ জন কর্মকর্তা দিয়ে চলবে৷ ব্যাপারটা আরেকটি আর্টিকেল এ শেয়ার করব আছা করছি৷

৪. লাভ লোকসান এর হিসেব

পুরোনো ব্যাংকগুলো প্রথমে খুব চালাকি করবে। তারা তাদের খরচ কমাতে শয়ে শয়ে শাখা বন্ধ করে দেবে। এই সব ইট-পাথরের দালানগুলো রক্ষণাবেক্ষণে যে বিপুল খরচ হতো, তা বেঁচে যাবে। আর হঠাৎ দেখা যাবে, তাদের লাভ বেড়ে গেছে। কিন্তু এই হাসিটা হবে সাময়িক। এটা একটা ‘শেষ বাতি’ জ্বলে ওঠার মতো ব্যাপার। ভেতরের আসল অসুখটা তাতে সারবে না।

৫. ‘জোম্বি’ ব্যাংকের উদয়

কদিন পর ব্যাংকগুলো দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। একদল হবে খুব চটপটে, সময়ের সাথে তাল মেলানো ‘অ্যাজাইল’ ব্যাংক। আর বাকিরা হবে ‘জোম্বি’ ব্যাংক, বেঁচে আছে, কিন্তু ঠিক বেঁচে নেই। পুরোনো টেকনোলজি আঁকড়ে ধরে ধুঁকতে থাকবে। তাদের না থাকবে নতুন কিছু করার ক্ষমতা, না থাকবে পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাওয়ার উপায়।

৬. শাখাগুলোর বিদায়

আমরা যে রাস্তার মোড়ে মোড়ে ব্যাংকের শাখা দেখি, তার তিন-চার ভাগই হয়তো দশ বছরের মধ্যে হাওয়া হয়ে যাবে। এই যে নতুন প্রজন্ম আসছে, তারা ব্যাংকে যাওয়াটা একটা ঝামেলার কাজ বলে মনে করে। তাদের জন্য এই ইট-পাথরের দালানগুলোর কোনো দরকার নেই। তারা সব কাজ মোবাইলেই সেরে ফেলতে চায়।

৭. নতুন চেহারার শাখা

যে কয়েকটি শাখা টিকে থাকবে, সেগুলোর চেহারাও বদলে যাবে। মানুষ সেখানে আর টাকা জমা দিতে বা তুলতে যাবে না। বড় ব্যবসায়ীরা, যারা কোটি টাকার বাণিজ্য ঋণ চান, বা যারা নতুন বাড়ি বানাবেন, তারা সেখানে গিয়ে ম্যানেজারের সাথে কফি খেতে খেতে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবেন। যে কাজ মেশিন করতে পারে না, শুধু সে কাজই সেখানে হবে।

৮. ‘অদৃশ্য’ ব্যাংক

কিছু ব্যাংক আবার খুব অদ্ভুত একটা কাজ করবে। তারা ঠিক করবে, মানুষের সাথে আর সরাসরি ব্যবসা করবে না। তারা হবে ‘পাইপলাইন’-এর মতো। অন্য ছোট ছোট ফিনটেক কোম্পানিগুলো তাদের লাইসেন্স আর টেকনোলজি ব্যবহার করে ব্যবসা করবে, আর মূল ব্যাংকটি শুধু নেপথ্যে থেকে ভাড়া নেবে। আপনি হয়তো একটা অ্যাপ ব্যবহার করছেন, কিন্তু জানবেনই না যে তার পেছনের আসল ব্যাংকটা কে।

৯. স্বয়ংক্রিয় ফ্রন্টলাইন

ব্যাংকে গেলে যারা হাসিমুখে টাকা গুনে দেন, সেই ‘টেলার’ পদের মানুষেরা আর থাকবেন না বললেই চলে। তাদের ৮০ ভাগ কাজই করবে কথা বলা মেশিন (এআই) বা কিওস্ক। ২৪ ঘন্টাই তারা গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দেবে, লেনদেন করবে। যে মানুষগুলো এই কাজগুলো করতেন, তাদের হয় নতুন কিছু শিখতে হবে, নয়তো অন্য কাজ খুঁজতে হবে। এটা ভাবলে একটু মন খারাপ হতেই পারে।

১০. নিয়মের ‘চাপ’ কমানো

বাংলাদেশ ব্যাংকের এখন অনেক কড়াকড়ি নিয়ম আছে, বিশেষ করে ‘ক্লাউড’ কম্পিউটিং নিয়ে (অর্থাৎ তথ্য দেশের বাইরে রাখা যাবে না)। কিন্তু একসময় তারা দেখবে, এই কড়াকড়ির ফলে পুরোনো ব্যাংকগুলো আধুনিক হতে পারছে না, নতুনদের সাথে প্রতিযোগিতায় মারাই যাচ্ছে। তখন দেশের ভালোর জন্যই, বাধ্য হয়েই, তারা এই নিয়মগুলো একটু শিথিল করবে।

১১ . টিকে থাকার ‘যুদ্ধ ’

বড়, পুরোনো ব্যাংক এই ঝড়ে হাঁপিয়ে উঠবে। তারা নতুন টেকনোলজির পেছনে কোটি কোটি টাকা ঢালতে গিয়ে দেখবে, তাদের আর চলছে না। ব্যাঙ্ক গুলো তখন মার্জার এ যাবে। তবে তাতে শেষ রক্ষা হবে না। যারা ভাবছে এপ , এআই, অটোমেশন, অ্যাজিলিটির দরকার নেই তারা ফার্স্ট মুভার এডভান্ট্যাজ এ পিছিয়ে পড়বে৷ যারা এগুলোতে বিনিয়োগ করবো না তাদের উচিত এখনি ব্যবসা বন্ধ করে দেয়া। পরে আম ও ছালা দুটোই যাবে ৷

১২ . ‘সুপার-অ্যাপ’-এর রাজত্ব

আর সবচাইতে অদ্ভুত ভবিষ্যদ্বাণীটি হলো, দশ বছর পর হয়তো দেখা যাবে সবচাইতে বড় ‘ব্যাংক’ আসলে কোনো ব্যাংকই নয়। সেটা হয়তো একটা ‘সুপার-অ্যাপ’, যার মালিক কোনো এক মোবাইল ফোন কোম্পানি। সেই অ্যাপে আপনি গান শুনবেন, খাবার অর্ডার করবেন, আবার সেই অ্যাপেই আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকবে। ব্যাংকিং তখন আর আলাদা কিছু থাকবে না, এটা হবে জীবনের আর দশটা কাজের মতো একটা কাজ মাত্র। অদ্ভুত, তাই না? তবে এই বেপারটা ঘটতে ১ ০ বছরের বেশি লাগবে।

তেইশ বছরের অভিজ্ঞতা

পৃথিবীতে অদ্ভুত সব মানুষ। একেক জনের জগৎ একেক রকম। আমার এক পরিচিত ভদ্রলোক আছেন, ধরা যাক তার নাম আসাদ সাহেব।

তেইশ বছরের অভিজ্ঞতা

আসাদ সাহেব একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করেন। সমস্যা হলো, তিনি যে কাজটা করেন, তার খুব সামান্যই তিনি বোঝেন। কিন্তু তার আত্মবিশ্বাসের কোনো কমতি নেই। কথায় কথায় তিনি তার ‘তেইশ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা’র গল্প শোনান। এই তেইশ বছরে তিনি যে ঠিক কী শিখেছেন, সেটা একটা রহস্য।

তার প্রধান কাজ হলো অন্যেরা কে কী পারে না, তার তালিকা করা। তার মতে, অফিসের করিম সাহেব একটা গাধা। রফিক সাহেবের মাথায় কিচ্ছু নেই। আর নতুন যে ছেলেটা জয়েন করেছে, সে তো দুই দিন পর সব গোল্লায় পাকাবে। শুধু তিনিই তার তেইশ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে একা বসে আছেন।

আশ্চর্য হয়ে ভাবি, আসাদ সাহেবরা কেন এমন করেন?

এর একটা সোজা-সাপ্টা কারণ আছে। কারণটা হলো তারা ‘যোগ্যতা’ জিনিসটা কী, তা-ই বোঝেন না। একজন মানুষ যখন খুব কম জানেন, তিনি তখন ভাবেন, পৃথিবীর সব জ্ঞান তার মগজের ভেতর জমা হয়ে আছে। জানার যে একটা বিশাল সমুদ্র আছে, সেই বোধটাই তার তৈরি হয় না।

যে মানুষটা জীবনে শুধু পুকুর দেখেছে, সে সমুদ্রকে দেখে ভাববে"এতো বড় একটা পুকুর!"

ঠিক তেমনি, একজন অযোগ্য লোক যখন একজন যোগ্য লোককে কাজ করতে দেখেন, তিনি কিছুই বুঝতে পারেন না। তিনি নিজের ওই এক চিলতে জ্ঞান (কিংবা ওই তেইশ বছরের ভুয়া অভিজ্ঞতা) দিয়ে তাকে মাপতে বসেন। স্বাভাবিকভাবেই, হিসাবে গরমিল হয়ে যায়। তিনি তখন সিদ্ধান্ত নেন, ওই লোকটাও একটা আস্ত অযোগ্য।

মানব সম্পদের চোখে একে বলে Dunning-Kruger Effect সহজ কথায় এটি এমন একটি অবস্থা, যেখানে কম দক্ষ লোকেরা নিজেদের দক্ষতাকে অনেক বেশি করে দেখেন। তারা নিজেদের অযোগ্যতা বোঝার মতোও যোগ্য হন না, ফলে তারা অন্যের আসল যোগ্যতাও চিনতে পারেন না।

কাঁচের ঘরের বাসিন্দা

আসাদ সাহেবদের এই আচরণের পেছনে আরেকটি কারণ হলো তীব্র ভয়।

একজন যোগ্য মানুষ যখন সামনে এসে দাঁড়ায়, অযোগ্য মানুষটির বুক কেঁপে ওঠে। তার মনে হয়, এই বুঝি তার সব দুর্বলতা ধরা পড়ে গেলো! তার চেয়ারটা বুঝি নড়ে উঠলো!

এই ভয় থেকে বাঁচার জন্য তারা একটা অদ্ভুত খেলা খেলে। একে বলে 'আক্রমণ'। অন্য কেউ তাকে 'অযোগ্য' বলার আগেই, তিনি চিৎকার করে দশজনকে 'অযোগ্য' বলে বসেন। এটা তাদের আত্মরক্ষার একটা ঢাল। "আমি অযোগ্য নই, তোমরা সবাই অযোগ্য" এই বিশ্বাসটা তারা আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চান।

অযোগ্য মানুষেরা নিজেদের চারপাশে একটা কাঁচের ঘর তৈরি করে ফেলেন। সেই ঘরের ভেতরে বসে তারা খুব নিরাপদ বোধ করেন। বাইরে থেকে কেউ তাকালেই তাদের মনে হয়, লোকটা বুঝি তার ভুল ধরতে এসেছে। তিনি তখন আর দেরি করেন না। ঘর থেকেই বাইরের লোকটাকে উদ্দেশ্য করে ঢিল ছুঁড়তে শুরু করেন।

মানব সম্পদের চোখে একে বলে Ego Defense / Projection সহজ কথায় এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক আত্মরক্ষার কৌশল। মানুষ যখন নিজের কোনো দুর্বলতা বা দোষ (যেমন: অযোগ্যতা) মেনে নিতে পারে না, তখন সেই দোষটি সে অবচেতন মনে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয় বা অন্যের মধ্যে দেখতে পায়।

আসাদ সাহেবের ‘আগের অফিস’

আসাদ সাহেবের এই কাঁচের ঘর আমি সেদিন আবার দেখলাম।

অফিসে একটা নতুন সফটওয়্যার এসেছে। কাজ সহজ করার সফটওয়্যার। সবাই এটা নিয়ে খুব উৎসাহী। শুধু আসাদ সাহেব মুখ গম্ভীর করে বসে আছেন।

চায়ে চুমুক দিয়ে তিনি বলা শুরু করলেন, "হুম। ভালো। তবে আমাদের আগের অফিসে..."

এই "আগের অফিস" একটা অদ্ভুত জায়গা। আসাদ সাহেবের বর্ণনায় সেটা একটা স্বর্গরাজ্য। সেখানকার কফি মেশিন সোনা দিয়ে বাঁধানো ছিলো কিনা, তা অবশ্য তিনি বলেননি।

তিনি বলতে থাকলেন, "আমাদের আগের অফিসে যে সিস্টেমটা ছিলো, সেটা ছিলো বিশ্বমানের। এক ক্লিকে সব হয়ে যেতো। আমার তেইশ বছরের অভিজ্ঞতায় আমি ওরকম জিনিস আর দেখিনি। আমি নিজে সেই সিস্টেম বসানোর তদারকি করেছি।"

ম্যানেজার সাহেব খানিকটা বিরক্ত হয়ে বললেন, "আসাদ সাহেব, আপনি কি দয়া করে নতুন সিস্টেমটা একটু দেখবেন?"

আসাদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "দেখছি তো। কিন্তু মন ভরছে না। তেইশ বছর ধরে কাজ করি। ভালো-মন্দ বুঝি। আগের অফিসের মতো আর হবে না।"

সমস্যাটা অন্য জায়গায়। নতুন সফটওয়্যারটা আসাদ সাহেবের কাছে জটিল লাগছে। কারণ তিনি এটা শিখতে চান না। অথবা, শিখতে গিয়ে পারছেন না।

নিজের এই 'পারছি না' বা 'শিখতে ইচ্ছে করছে না'কে ঢাকার জন্য তিনি একটা চমৎকার ঢাল ব্যবহার করছেন। সেই ঢালের নাম "আগের অফিস"।

তিনি আসলে বলতে চান, "আমি এই নতুন জিনিসটা পারছি না।" কিন্তু সেটা না বলে তিনি বলছেন, "এই নতুন জিনিসটা ভালো না। আমার পুরোনোটাই ভালো ছিলো।"

এটা খুব আরামদায়ক একটা অবস্থান। এখানে নিজের অযোগ্যতা নিয়ে লজ্জিত হতে হয় না। উল্টো, পুরোনো অভিজ্ঞতার গাম্ভীর্য নিয়ে বর্তমানকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা যায়।

মানব সম্পদের চোখে একে বলে Rosy Retrospection এবং Status Quo Bias

    • Rosy Retrospection (সোনালী অতীত): এটি এমন একটি মানসিক ঝোঁক, যেখানে মানুষ অতীতকে বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর বা ভালো মনে করে। আসাদ সাহেব তার আগের অফিসের সব ঝামেলা ভুলে গেছেন। তার শুধু মনে আছে সেই পরিচিত পরিবেশের আরাম।
    • Status Quo Bias (পরিবর্তনে অনীহা): মানুষ স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তনকে ভয় পায়। পরিচিত অবস্থাকেই সে 'ভালো' বলে মনে করে। নতুন কিছু শেখার যে মানসিক চাপ, সেটা এড়ানোর জন্য আসাদ সাহেব বর্তমান সিস্টেমকে 'খারাপ' বলছেন এবং পুরোনো সিস্টেমকে 'ভালো' বলে আঁকড়ে ধরে আছেন।

    The Hidden Costs of Control: Why Micromanagement is Harming Your Team and How to Fix It

    Micromanagement is a destructive and surprisingly common management style that, despite often stemming from good intentions, can systematically undermine a team's health and productivity. Its prevalence is striking, with surveys showing that a vast majority of employees, as many as 79%, have felt its effects at some point in their careers. At its heart, this management style is defined by excessive control, an obsessive focus on minor details, and a deep reluctance to delegate tasks or decision-making power. In such an environment, employees are given very little autonomy, turning the manager into an indispensable hub for all activity and transforming the manager-employee dynamic from one of coaching to one of constant, granular oversight. The micromanager is easily recognisable through a consistent pattern of behaviours. They show a profound resistance to delegation, operating under the belief that they are the only one who can perform a task correctly, which creates a bottleneck and denies employees growth opportunities. They fixate on trivial details, often losing sight of broader strategic goals while nitpicking minor flaws in deliverables. This is coupled with an insatiable need for information, demanding constant updates and insisting on being copied on every email to maintain total visibility. All decision-making becomes centralised, discouraging independent thought and requiring approval for even the smallest actions. Perhaps most demoralising is the tendency to redo an employee's completed work, sending a clear message that their contribution is not valued. This pattern of behaviour, driven by a perpetual dissatisfaction with results, functions less like a set of bad habits and more like a behavioural dependency on control, used to soothe the manager's own anxieties and insecurities.

    To understand why this happens, we must look at the complex mix of internal psychology and external pressures that create a micromanager. The primary driver is often internal, rooted in a deep-seated fear and insecurity. A lack of trust in one's own abilities can be projected outward as a fear of failure, leading to a command-and-control style that serves as a defensive mechanism to protect a fragile ego. This is frequently combined with perfectionism and a sincere belief that their way is the only correct way, sometimes coupled with an extreme need for domination. However, external factors can also play a significant role. New managers promoted for their technical skills often lack leadership training and revert to the hands-on work they know best, struggling to let go of old responsibilities. Intense organisational pressure, such as high-stakes projects or a punitive culture that punishes failure, can also induce controlling behaviours as a desperate risk-mitigation strategy. For some, it is simply a learned behaviour, mimicking the only leadership style they have ever been exposed to. These factors converge in a destructive dynamic known as the paradox of perceived competence. A manager, driven by insecurity, believes their team is underskilled and implements controlling behaviours that strip employees of autonomy. This denies the team the very experiences needed for skill development, causing their critical thinking abilities to atrophy. Over time, the team becomes genuinely less capable and more dependent, fulfilling the manager's initial prophecy and justifying their continued micromanagement in a vicious cycle.

    The most immediate casualty of this management style is the individual employee, whose psychological well-being and professional capacity are systematically eroded. The daily reality of constant scrutiny and criticism creates a high-stress environment, leading to chronic anxiety, frustration, and eventual burnout. This relentless communication of distrust is deeply corrosive to self-esteem, causing even highly skilled employees to internalise the manager's lack of faith and fall into a paralysing cycle of self-doubt. Stripped of autonomy, employees feel powerless and devalued, which crushes morale and leads to disengagement. The chronic stress often spills into personal life, contributing to serious health issues like sleep interruptions, depression, and even an elevated risk of cardiovascular disease. Professionally, micromanagement actively stunts growth by suppressing creativity and initiative. Employees learn that it is safer to simply follow orders, extinguishing innovation and motivation. By insulating them from challenges and mistakes, this style denies employees the critical learning opportunities necessary for skill development, effectively halting their career progression. This damage is often inflicted through the weaponisation of feedback, where it becomes a tool for constant, negative criticism rather than for growth, fostering a culture where employees fear asking questions or admitting mistakes.

    The negative impact of a micromanager quickly spreads beyond the individual, poisoning the entire team dynamic. Trust, the foundation of any high-performing team, is the first casualty. The manager's behaviour is a constant declaration of distrust, creating an adversarial relationship that can become contagious, causing team members to become suspicious of one another. Operationally, the insistence on being the central node for all decisions creates massive inefficiencies and bottlenecks, as work grinds to a halt while waiting for approvals. Team members spend an inordinate amount of time on "performative work"—producing detailed reports and justifying their actions simply to appease the manager's anxiety, rather than achieving substantive goals. Over time, this fosters a culture of dependency and fear. The team loses its ability to function autonomously and becomes fragile in the manager's absence, while the psychological safety needed for innovation evaporates. This creates an illusion of productivity; a flurry of activity masks the reality that the team's collective energy has been redirected from value-creating objectives to internal, manager-facing appeasement, representing a massive and hidden drain on the organisation's resources.

    When this leadership style is tolerated, the localised dysfunction metastasises into an organisational blight with severe long-term consequences. One of the most direct costs is a dramatic increase in employee turnover, as micromanagement is consistently cited as a top reason why people resign. This exodus of talent is incredibly expensive, leading to a loss of institutional knowledge and lowering the morale of those who remain. Furthermore, micromanagement is the antithesis of an innovative culture. By creating an environment of fear and rigid adherence to process, it stifles the experimentation and risk-taking necessary for an organisation to adapt and survive in a competitive landscape. This fosters a toxic work environment built on distrust and fear, which damages the employer's brand and makes it increasingly difficult to attract and retain top talent. Ultimately, the cumulative impact of a demotivated workforce, workflow bottlenecks, high turnover, and a lack of innovation leads to a significant reduction in productivity and a direct hit to the company's bottom line. Micromanagement acts like an organisational immune disorder, where the company's own leadership attacks its most vital assets—its people's creativity and initiative, systematically weakening the organisation from within and leaving it vulnerable to decline.

    Ironically, the final victim of this destructive cycle is often the micromanager themselves. The relentless pursuit of control is a form of career self-sabotage. By refusing to delegate and getting mired in operational details, micromanagers become overloaded and neglect their core strategic responsibilities, putting them at high risk of burnout. Their career progression stalls because they fail to develop their team. In many organisations, a manager cannot be promoted without having a capable successor ready to take their place; by stunting the growth of their subordinates, micromanagers trap themselves in their current role. The departments they lead become inherently non-scalable, as any growth would overwhelm the manager who has become a bottleneck. This, combined with the powerful negative reputation that comes with being labelled a "micromanager," damages their credibility and limits future career opportunities. This is the ultimate control paradox: in their attempt to control every short-term, tactical outcome, they sacrifice the strategic, long-term influence necessary for their own success, ensuring their career potential remains unfulfilled.

    The clear antidote to the poison of micromanagement is a strategic and philosophical shift from control to empowerment. This is not a soft skill, but a critical business imperative. An empowering leader focuses not on the "how," but on the "what" and the "why." They set clear expectations and communicate the strategic context, then trust their team to determine the best way to achieve the goals. This requires mastering effective delegation, which means transferring genuine ownership and authority. Such a leadership style is built on a foundation of trust and psychological safety. It begins with extending trust first and reframing failure not as a punishable offence, but as an essential opportunity for learning and growth. This fosters an environment where employees feel safe to be candid, admit mistakes, and engage in the two-way communication that is vital for continuous improvement. The business case for this shift is compelling. Organisations that cultivate empowerment see higher employee morale, lower turnover, increased productivity, and a greater capacity for innovation, creating a powerful competitive advantage in a talent-driven market.