কর্পোরেট পাঁচালী: ন্যাড়া, বেলতলা ও একখানা আস্ত বাঁশ
দুনিয়ায় কত রঙ্গই না দেখা যায়! আর এই হাল আমলের কর্পোরেট পাড়ায় যে তামাশা চলে, তা দেখলে স্বয়ং বিধাতাও মাঝে মাঝে ভিরমি খাবেন। এখানে সবাই যেন এক একজন ঝানু খেলোয়াড়। তবে সবচেয়ে বিচিত্র খেলাটি জমে ওঠে মানবসম্পদ বা এইচআর বিভাগে। ধরুন, কোনো এক কোম্পানিতে এমন এক ব্যক্তি এইচআরের চেয়ারে বসেছেন, যিনি নিজের কাজের নাড়িভুঁড়ি কিছুই জানেন না। মাথায় ঘিলুর চেয়ে গোবর বেশি। ভেতরে সর্বদা এক অদ্ভুত ধুকপুকানি কাজ করে, এই বুঝি চাকরিটা গেল! তা এমন অপদার্থ লোক নিজের এই অযোগ্যতা ঢাকবেন কী করে? উপায় একটা আছে বটে। খড়কুটো ধরে বাঁচার মতো তিনি অফিসের সবচেয়ে জাঁদরেল ও ক্ষমতাধর কোনো ডিপার্টমেন্ট হেডের বগলের নিচে গিয়ে আশ্রয় নেন। ভাবখানা এমন, এই প্রবল প্রতাপশালী লোকের ছত্রছায়ায় থাকলে আমার বিদ্যের দৌড় আর কেউ টের পাবে না, আর চাকরিটাও দিব্যি টিকে যাবে।
এদিকে আবার ওই দাপুটে ডিপার্টমেন্ট হেডদের খাসলতও ভারী বিচিত্র। দুনিয়ার তাবৎ ডিপার্টমেন্ট হেডেরই প্রাণের বাসনা হলো গোটা এইচআর বিভাগটাকে আস্ত গিলে ফেলা এবং নিজের প্যান্টের পকেটে পুরে রাখা। এটা কর্পোরেট দুনিয়ার একদম আদি অকৃত্রিম নিয়ম। কেন রাখবেন না বলুন? বছর শেষে নিজের বিভাগের লবডঙ্কা পারফরম্যান্স তো ঢাকতে হবে। নিজের চাটুকার ও অপদার্থ সাগরেদদের তো ভালো রেটিং দিতে হবে। আর নিজের যাবতীয় আকাম কুকামের দায় কোনো নিরীহ বলির পাঁঠার ঘাড়ে চাপাতে হবে। এইচআর যদি পকেটে থাকে, তবে এই সব কুকর্ম করা তো একেবারে ডালভাত। নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে সব অপকর্ম তখন জায়েজ করে নেওয়া যায়। একজন এইচআর কর্তার সবার আগে এই মোদ্দা কথাটা বোঝা উচিত। এটা হলো এইচআরের অ আ ক খ। মানুষ যে তাকে ঘুঁটি বানিয়ে খেলবে এবং নিজের স্বার্থ হাসিল করবে, এই সহজ সত্যটা বুঝতে না পারলে এইচআরের চেয়ারে বসার কোনো মানেই হয় না। কিন্তু ওই যে বললাম, ঘিলুহীন লোক এই ফাঁদেই পরম আনন্দে পা দেন।
বছর শেষে যখন কর্মীদের আমলনামা বা পারফরম্যান্স মূল্যায়নের সময় আসে, তখন শুরু হয় আসল খেলা। ধরুন, ওই দাপুটে কর্তার এক পেয়ারের লোক সারা বছর মাছি মেরেছে, অফিসে এসে কেবল চা খেয়েছে আর আড্ডা দিয়েছে। উপরন্তু বড় কোনো প্রজেক্টে এমন একখানা মারাত্মক ভুল করেছে যে কোম্পানির লালবাতি জ্বলার জোগাড়। কায়দা কানুন বলছে তাকে কলার ধরে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার কথা। কিন্তু ওই অযোগ্য এইচআর কর্তা তখন জাদুকরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তিনি এমন একখানা ভোজবাজি দেখান যে ওই অপদার্থ কর্মীর নামের পাশে জিকজিক করে ওঠে আউটস্ট্যান্ডিং রেটিং। সাথে জোটে মোটা অঙ্কের বোনাস। আর বছর শেষের হিসাবের খাতা মেলাতে গিয়ে ঘাড় কাটা পড়ে অন্য কোনো নিরীহ কর্মীর, যে হয়তো গাধার মতো খাটুনি খেটেছে সারা বছর। তার কপালে জোটে জঘন্য রেটিং, আটকে যায় প্রমোশন। এইচআর কর্তা ভাবেন, তিনি ভারী একখানা বাহাদুরি করে ফেলেছেন। দাপুটে কর্তার সাথে উইকেন্ডে দামি রেস্তোরাঁয় কফি খাচ্ছেন আর ভাবছেন, তার মতো বুদ্ধিমান ও চতুর লোক এ তল্লাটে আর দুটি নেই।
কিন্তু মশাই, গল্পের আসল ক্লাইম্যাক্স তো তখনো বাকি। ওই এইচআর কর্তা একটা খুব সোজা হিসাব বুঝতে ঘুলিয়ে ফেলেন। যে লোক নিজের সামান্য স্বার্থের জন্য কোম্পানির পিঠে ছুরি মারতে পারে, সে বিপদের দিনে তার কুকর্মের দোসরকে রক্ষা করবে, এমনটা ভাবা তো নিছক আহম্মকি। স্বার্থের সম্পর্ক হলো কাঁচা সুতোর মতো, একটু টান লাগলেই ছিঁড়ে ফর্টি। তাছাড়া এই ডিপার্টমেন্ট হেডরাও তো আর চিরস্থায়ী ইজারা নিয়ে বসেননি। তাদের মাথার ওপরও সর্বদা খাঁড়া ঝুলছে। কোম্পানির ব্যবসায় একটু মন্দা এলেই বা ম্যানেজমেন্টে নতুন কেউ এসে বসলেই সবার আগে এদের চেয়ার টলে ওঠে। আবার অন্য কোনো কোম্পানিতে দুপয়সা বেশি পেলেও এরা রাতারাতি পাততাড়ি গোটায়।
আসল মজাটা টের পাওয়া যায় ঠিক ওই বিপদের সময়। ডিপার্টমেন্ট হেড যখন দেখেন তার নিজের চাকরিতে টান পড়েছে, অথবা তিনি যখন অন্য কোম্পানিতে যাওয়ার জন্য স্যুটকেস গোছাচ্ছেন, তখন নিজের যাবতীয় পাপের বোঝা তিনি পরম মমতায় ওই এইচআর কর্তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেন। ইন্টার্নাল অডিটে যখন পারফরম্যান্স মূল্যায়নের এই পুকুরচুরি আর নিরীহ কর্মীদের ওপর জুলুমের খবর ফাঁস হয়, তখন সেই দাপুটে কর্তা ম্যানেজমেন্টের সামনে গিয়ে একেবারে ভাজা মাছটি উল্টে খেতে না পারার ভান করেন। অত্যন্ত নির্লিপ্ত গলায় বলেন, আমি তো শুধু আমার বিভাগের একটা খসড়া রেটিং দিয়েছিলাম। চূড়ান্ত মূল্যায়ন আর নিয়মকানুন দেখার দায়িত্ব তো এইচআরের। আমার সুপারিশ যদি নিয়মের বাইরে গিয়ে থাকে, তবে এইচআর কেন আমাকে আটকাল না?
ব্যস, এক কথাতেই সব শেষ! যিনি এতদিন প্রাণের দোসর ছিলেন, তিনি নিমেষেই বহুরূপীর মতো রং বদলে ফেলেন। এইচআর কর্তার তখন মাথায় হাত, চোখ ছানাবড়া। তিনি বুঝতে পারেন, যাকে তিনি পরম ত্রাতা ভেবেছিলেন, সে আসলে তার পিঠে একখানা আস্ত বাঁশ দিয়ে গেছে। নিজের চামড়া বাঁচাতে ওই দাপুটে কর্তা তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গীর বুকে ছুরি মারতে আধখান সেকেন্ডও ভাবেননি।
ততদিনে অবশ্য চিড়িয়া উড়িয়া গিয়াছে। নিজের অযোগ্যতা ঢাকতে গিয়ে যে এইচআর কর্তা ক্ষমতা আর লোভের ফাঁদে পা দিয়েছিলেন, তিনি আবিষ্কার করেন এই বিশাল দালানে তিনি বড্ড একা। যে নিরীহ কর্মীদের তিনি অন্যায়ভাবে পথে বসিয়েছিলেন, তাদের নীরব দীর্ঘশ্বাস তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। আর যে দাপুটে কর্তার জন্য তিনি নিজের পেশার ইজ্জত নিলামে তুলেছিলেন, সে তখন অন্য কোনো শহরের অন্য কোনো অফিসে বসে নতুন কোনো অপদার্থ এইচআরের সাথে দিব্যি খোশগল্প করছে। দুনিয়ার হালচাল মশাই এমনই, দিন শেষে সবাই নিজের আখেরটাই আগে গোছায়।
