বড় সাহেবের ঈশ্বরত্ব: এক নিখাদ কর্পোরেট বিনোদন
বসার ঘরটায় অদ্ভুত একটা পবিত্র নীরবতা। উপাসনালয়ে যেমন থাকে আরকি। বড় সাহেব, থুড়ি, কোম্পানির ঈশ্বর তার চিরাচরিত একটা অকাট্য যুক্তি দিচ্ছিলেন। এই একই ঘরে বসে এই একই যুক্তিতে তিনি আগেও বহুবার দুনিয়া উদ্ধার করেছেন।
রিস্ক ম্যানেজমেন্টের হেড ভদ্রমহিলার বোধহয় জীবনের মায়া কমে গিয়েছিল। তিনি একটু ঝুঁকে একটা হিসেব দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কেউ তার কাছে এই হিসেব চায়নি, তবু তিনি দিলেন। বড় সাহেব তাকে থামালেন না। ঈশ্বরের অসীম ধৈর্য! তিনি কথা শেষ করতে দিলেন। তারপর ভদ্রমহিলার দিকে এমনভাবে মায়াবী হাসি হাসলেন, যেন অবোধ শিশু একটা আস্ত বোকামি করে ফেলেছে। খুব নরম গলায়, প্রায় আশীর্বাদ করার মতো ভঙ্গিতে বললেন যে তিনি সব বুঝতে পারছেন, কিন্তু এসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তিনি আগেই ভেবে রেখেছেন। এরপর কথা স্বাভাবিকভাবেই অন্যদিকে ঘুরে গেল।
চল্লিশ মিনিট পর মিটিং নামের এই পুণ্যস্নান যখন শেষ হলো, ততক্ষণে মিটিংয়ের আরও তিনজন বড় কর্তা নিজেদের প্রশ্নগুলো সযত্নে গিলে ফেলেছেন। হজমও হয়ে গেছে। পরদিন সকালে রিস্কের হেড ভদ্রমহিলা তার শঙ্কার কথা জানিয়ে একটা ইমেইল করলেন। নির্দিষ্ট কাউকে পাঠালেন না, কারণ ঈশ্বরের কাছে ইমেইল পাঠানোর কোনো ডিরেক্টরি নেই। শুধু ফাইলের জন্য রেখে দিলেন। আঠারো মাস পর কোম্পানির যখন সত্যি সত্যিই বারোটা বাজল, ইনভেস্টিগেশন হলো। ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি কাউকে কিছু বলেছিলেন কি না। তিনি শপথ করে বললেন যে তিনি বলেছিলেন, কিন্তু শোনার মতো পৃথিবীতে তখন কোনো মানুষ ছিল না, সবাই তো তখন ঈশ্বরের ভক্ত।
মানবসম্পদ বা এইচআর নামের এক অদ্ভুত পেশায় আমি কাজ করছি এক দশকের বেশি সময় ধরে। বাংলাদেশ আর অস্ট্রেলিয়া মিলিয়ে আমার এই বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতায় এমন নাটক আমি বহুবার দেখেছি। বড্ড চেনা এই চিত্রনাট্য।
অর্জিত এক ঐশ্বরিক অসুখ
এই যে ক্ষমতা পাওয়ার পর মানুষের এই হঠাৎ ঈশ্বর হয়ে যাওয়ার রোগ, এর কিন্তু রীতিমতো ডাক্তারি ব্যাখ্যা আছে। ২০০৯ সালের কথা। 'ব্রেইন' নামের এক জার্নালে ডেভিড ওয়েন আর জোনাথন ডেভিডসন নামের দুই সাইকিয়াট্রিস্ট খুব চমৎকার একটা ব্যাপার লিখলেন। যুগ যুগ ধরে অফিসের সাধারণ কর্মচারীরা কর্তাদের মধ্যে যা দেখে এসেছেন, তারা সেটার একটা গালভরা নাম দিলেন 'হুব্রিস সিনড্রোম'। সোজা বাংলায়, ক্ষমতার অহংকার। এটা এমন এক চমৎকার মানসিক অবস্থা যা মাত্রাতিরিক্ত সাফল্যের কারণে বাড়ে, আর চারপাশের মানুষের তেলবাজিতে ফুলেফেঁপে ওঠে।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই রোগটা কিন্তু জন্মগত নয়। মানুষ এটা অনেক কষ্টে অর্জন করে। বড় সাহেবরা যখন দীর্ঘদিন কোনো বাধা ছাড়া ক্ষমতা ভোগ করেন, তখন এই রোগ তাদের পেয়ে বসে। খুব নীরবে আসে, আবার কখনো কখনো বড্ড দ্রুত আসে।
ডাক্তাররা এর চৌদ্দটা লক্ষণের কথা বলেছেন। এর মধ্যে বড় একটা লক্ষণ হলো, সাহেবরা নিজেদের আর অফিসকে এক করে ফেলতে শুরু করেন। মানে, "আমিই কোম্পানি, কোম্পানিই আমি"। ধীরে ধীরে তারা বাস্তব জগৎ থেকে বহুদূরে চলে যান। তারা শুধু সেটাই শোনেন যা তারা শুনতে চান। আসল তথ্যের দিকে তাদের আর নজর থাকে না। পৃথিবীর সব ডেটা তখন তাদের কাছে তুচ্ছ মনে হয়।
কীভাবে ঘটে এই অলৌকিক ঘটনা
এর পেছনের স্নায়বিক ব্যাখ্যাটা শুনলে হাসি পেতে পারে। ড্যাচার কেল্টনার নামের এক ভদ্রলোক প্রায় বিশ বছর ধরে গবেষণা করেছেন। তিনি দেখলেন, যেসব গুণের কারণে একজন মানুষ ক্ষমতার শীর্ষে ওঠেন, ক্ষমতা পাওয়ার পর সেই গুণগুলোই সবার আগে হাওয়া হয়ে যায়। মানুষের প্রতি সহানুভূতি, মনোযোগ, পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা সব কেমন যেন ম্যাজিকের মতো উধাও হয়ে যায়।
কর্মক্ষেত্রে মানুষের সমস্যা মেটাতে গিয়ে এই ব্যাপারটা আমি রোজই টের পাই। ২০১৪ সালে ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেল, ক্ষমতা মানুষের মস্তিষ্কের 'মিররিং রেসপন্স' কমিয়ে দেয়। মানে হলো, অন্যের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতাটা আর থাকে না। বস তখন শুধু নিজের জায়গাতেই বসে থাকেন।
শুধু স্নায়বিক নয়, আচরণগত পরিবর্তনও দেখার মতো। ২০১১ সালের আরেক গবেষণায় দেখা যায়, চরম আত্মপ্রেমী বড় কর্তারা অফিসের আসল অবস্থার কোনো তোয়াক্কাই করেন না। তারা শুধু হাততালি শুনতে ভালোবাসেন। ডেটা বা উপাত্ত তাদের কাছে ডালভাতের মতো, কোনো দাম নেই।
এই নাটকের নীরব মাশুল
এর মাশুলটা কিন্তু বেশ চড়া। দেখা গেছে, এই ধরনের আত্মপ্রেমী কর্তারা কোম্পানির জন্য চরম ঝুঁকি নিয়ে নেন। লাভ হোক বা ক্ষতি, জুয়াটা তারা বড় করেই খেলেন। আর টাকা তো কোম্পানির, নিজের পকেটের তো আর নয়!
তবে এর চেয়েও বড় ক্ষতিটা হয় একদম নীরবে। নিচের দিকের কর্মীদের মুখ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। এমি এডমন্ডসন নামের এক গবেষক দেখিয়েছেন, যেসব টিম ভালো কাজ করে তারা আসলে নিজেদের ভুলগুলো বেশি স্বীকার করে। ভুল না করাটা বড় কথা নয়, ভুল নিয়ে কথা বলতে পারাটাই আসল। কিন্তু যেখানে কর্মীরা চুপ থাকে, বুঝতে হবে সেখানে নিরাপত্তা নেই, সেখানে আছে বসের গজবের ভয়।
আমার নিজের কাজের জায়গা থেকেও বলতে পারি। একশর বেশি এমন ঘটনা আমি দেখেছি যেখানে কর্মীরা স্রেফ বিপদে পড়ার ভয়ে বসের কাছে আসল তথ্য লুকিয়েছে। এটা তারা একদিনে শেখে না, চারপাশের ছোট ছোট ঘটনা থেকে খুব যত্ন করে শেখে।
একজন ঈশ্বর-ভাবাপন্ন বড় সাহেব কোম্পানির এমন একটা অবস্থা দাঁড় করান যেখানে বোর্ড তাকে বাধা দেওয়া ছেড়ে দেয়। আর কর্মীরা সত্যি কথা বলা ছেড়ে দেয়। এরপর কোম্পানি যে বড় কোনো বিপদে পড়বে, সেটা ঠেকানোর আর কোনো উপায় থাকে না। সবাই মিলে তখন শুধু ধ্বংস দেখার অপেক্ষায় থাকে।
এই কাজটা কিন্তু বড় সাহেব একা করেন না। চারপাশের মানুষজন তাকে এই ঈশ্বর হতে পুরোপুরি সাহায্য করে। সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে বোর্ডের মেম্বাররা। তারা যখন বসের কথায় শুধু পুতুলের মতো মাথা নাড়তে থাকেন, তখন তারা আর নিয়ন্ত্রক থাকেন না, হয়ে যান স্রেফ দর্শক। বুদ্ধিমান কর্মীরা খুব দ্রুতই বুঝে ফেলেন যে বসের সাথে দ্বিমত পোষণ করার চেয়ে তার কথায় সায় দিলেই নিজের প্রমোশনটা দ্রুত হয়।
অফিসের এইচআর বা মানবসম্পদ বিভাগও এখানে পিছিয়ে নেই। তারা যদি সরাসরি বোর্ডের কাছে রিপোর্ট না করে বসের অধীনে থাকে, তবে তারাও বসের সুরেই হারমোনিয়াম বাজায়। এইচআর বিভাগ নিজে তৈরি করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি, এই মেরুদণ্ডহীন এইচআর কতটা ভয়ংকর হতে পারে। কাগজে-কলমে হয়তো অনেক সুন্দর সুন্দর নিয়ম থাকে, কিন্তু বাস্তবে সেই কাগজের কোনো দাম থাকে না।
মুক্তির উপায় (যদি আদৌ থাকে)
সমস্যা যখন কাঠামোগত, সমাধানও তাই হতে হবে। আমার অভিজ্ঞতার আলোকে আমি তিনটে কাজের কথা বলতে পারি, যদিও কেউ শুনবে কি না সন্দেহ আছে।
নেতৃত্বের ধরন: কাজটাকে শুধু বসের আদেশ পালন হিসেবে না দেখে, শেখার একটা প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে। ভুল হলে সেটা স্বীকার করার মানসিকতা থাকতে হবে (যদিও বসেরা কখনো ভুল করেন না!)। গুগলের এক গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মীদের মানসিক নিরাপত্তাই হলো একটা ভালো টিমের সবচেয়ে বড় শক্তি।
কাঠামোগত দ্বিমত: বোর্ডকে শক্ত হতে হবে। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার খারাপ দিকগুলো নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করার জন্য আলাদা একটা দল থাকতে হবে। ক্ষমতার একটা নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকা খুব জরুরি। একজন মানুষ যত বেশি দিন ক্ষমতায় থাকবেন, তাকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থাও তত শক্ত হতে হবে। তা না হলে তিনি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে ফেলবেন।
সাংস্কৃতিক পরিবর্তন: অফিসে দ্বিমত পোষণ করা মানেই যে বসের প্রতি বেইমানি, এই জং ধরা ধারণা বদলাতে হবে। পরিণত অফিসগুলোতে দ্বিমত করাকে সম্মানের চোখে দেখা হয়। অবাধ্য হওয়া আর কোম্পানির ভালোর জন্য সত্যি কথাটা বলা, এই দুটোর পার্থক্য বুঝতে হবে।
শেষ কথা
নেতারা যখন নিজেদের ক্ষমতাকে নিজেদের জ্ঞান বা প্রজ্ঞা ভাবতে শুরু করেন, তখন সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয় কোম্পানির প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতির। কোম্পানি তখন নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে ফেলে। নিচের দিকের সত্য কথাগুলো ফিল্টার হতে হতে, সুন্দর করে পালিশ হতে হতে একটা সময় রূপকথার গল্প হয়ে যায়। আর বড় কর্তাটি সবার শেষে গিয়ে আসল সত্যিটা জানতে পারেন, যখন আর কিছুই করার থাকে না।
একজন এইচআর প্রফেশনাল হিসেবে ডেটা আর বাস্তবের এই ব্যবধানটা আমি খুব ভালো বুঝি। যখন কোনো রেগুলেটর আসেন, কিংবা অডিটর বড় কোনো গরমিল ধরেন, অথবা খুব ভালো কোনো কর্মী চুপচাপ চাকরি ছেড়ে দেন, ততক্ষণে আর করার কিছু থাকে না। বড় কর্তাদের এই নৈতিক স্খলন কোনো দুর্বল মানুষের স্খলন নয়। এটা চরম সফল মানুষদের স্খলন। আর এই সফল মানুষদের পতন দেখতে যে কী অদ্ভুত লাগে, সেটা শুধু যারা দেখেছে তারাই জানে।
