১. শুরুর কথা

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমি বাংলাদেশ আর অস্ট্রেলিয়ার হিউম্যান রিসোর্স বা মানবসম্পদ বিভাগে কাজ করছি। কমার্শিয়াল ব্যাংক, সার্ভিস অর্গানাইজেশন, ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম, কোথায় কাজ করিনি! একশোর বেশি ডিসিপ্লিনারি আর অভিযোগের ঘটনা আমি নিজের হাতে সামলেছি। এত কিছু দেখার পর আমার মনে একটা অদ্ভুত ধারণা তৈরি হয়েছে। ম্যানেজারদের এই যে মিথ্যা বলার প্রবণতা, এটাকে আমি আর মানুষের ব্যক্তিগত চরিত্রের দোষ বলে মনে করি না। আমার মনে হয়, এটা কাঠামোগত একটা রোগ।

ভদ্র কর্পোরেট ভাষায় এই মিথ্যাচারকে আমরা বলি "ট্রাস্ট ডেফিসিট" বা "ইন্টিগ্রিটি গ্যাপ"। আসলে মিষ্টি কথায় এই জঘন্য বিষয়টাকে একটু ঢেকে রাখার চেষ্টা আরকি। কিন্তু সত্যিটা হলো, এই মিথ্যাচার একটা প্রতিষ্ঠানকে ভেতরে ভেতরে ঘুণপোকার মতো কুরে কুরে খায়। একজন ম্যানেজার যখন মিথ্যা বলেন, তিনি শুধু তার সামনের মানুষটাকেই ঠকান না। তিনি পুরো অফিসের পরিবেশটাকে এমনভাবে দূষিত করেন যে, এরপর আর কোনো সিদ্ধান্তই ঠিকঠাক নেওয়া যায় না।

আমি খুব কাছ থেকে এই ছকটা দেখেছি। একটা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এক বড় কর্তাকে দেখেছি, যিনি জুনিয়রদের চমৎকার সব কাজ নিজের নামে চালিয়ে দিতেন। আর কোনো কাজে ঝামেলা হলে, যে কাজের অনুমতি তিনি নিজেই দিয়েছিলেন, সেটার দায় অবলীলায় চাপিয়ে দিতেন ওই জুনিয়রদের ঘাড়ে। বছরের পর বছর ওপর মহলে তার খুব সুনাম ছিল। এরপর একদিন রুটিনমাফিক এক অডিটে ধরা পড়ল তার আসল চেহারা। কাগজে-কলমে তার কাজের সাথে কথার কোনো মিল নেই। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, প্রতিষ্ঠান এই বিষয়টা বুঝে ওঠার আগেই তার প্রমোশন হয়ে গেল!

আমি আরেকজন ডিপার্টমেন্ট হেডের কথাও জানি। ভদ্রমহিলা তার অধিনস্তদের প্রত্যেকের সাথে আলাদা আলাদা গল্প করতেন। যার সাথে কথা বলতেন তাকে তোষামোদ করতেন আর যে সামনে নেই তার নামে আজেবাজে কথা বলতেন। তার বিভাগে প্রতি বছর ৪০ শতাংশ মানুষ চাকরি ছেড়ে পালাত। চার বছর ধরে এই অবস্থা চলল। অফিস ভাবল এটা হয়তো কোনো রহস্যময় "কালচারাল ইস্যু"। শেষমেশ এক্সিট ইন্টারভিউয়ের খাতা ঘাঁটতেই আসল ঘটনা পরিষ্কার হলো।

ম্যাকিয়াভেলি তার 'দ্য প্রিন্স' বইয়ে একটা চমৎকার কথা বলেছিলেন। মানুষ নাকি এতই সরল আর বর্তমানের প্রয়োজনে এতটাই অন্ধ থাকে যে, যে প্রতারণা করতে চায়, সে সবসময়ই এমন কাউকে পেয়ে যায় যে প্রতারিত হতে প্রস্তুত। আমাদের এই আধুনিক কর্পোরেট অফিসগুলো, যেখানে এত এত এইচআর পলিসি আর লিডারশিপের গালভরা বুলি, এগুলো আসলে ফ্লোরেন্সের সেই পুরোনো রাজদরবার ছাড়া আর কিছুই নয়। যেখানেই ক্ষমতার স্তর আছে, সেখানেই প্রতারণা করার একটা লোভ থাকে। যেখানেই অস্বচ্ছতা আছে, সেখানেই প্রতারকদের পোয়াবারো। এই ধরনের ম্যানেজাররা যে অফিসে আছেন, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রশ্ন হলো, শেষ পর্যন্ত এদের কী হয়? এদের চারপাশের মানুষগুলোরই বা কী হয়? আর একজন বুদ্ধিমান কর্মীর যখন এমন ম্যানেজারের পাল্লায় পড়েন, তখন তার কী করা উচিত?

২. মিথ্যাবাদী ম্যানেজারের রকমফের

বছরের পর বছর ধরে কর্মীদের ফাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে আমি মূলত পাঁচ ধরনের ম্যানেজারের দেখা পেয়েছি। এরা যে একে অপরের চেয়ে একেবারে আলাদা তা নয়, তবে এদের প্রত্যেকেরই মানসিকতার একটা আলাদা ধরন আছে।

ক্রেডিট চোর: এরা জুনিয়রদের কাজ নিজের নামে ওপর মহলে চালিয়ে দিতে ওস্তাদ। এর পেছনের কারণটা কিন্তু শুধু লোভ নয়। আসলে নিজেদের যোগ্যতা নিয়ে এরা সবসময় একটা হীনমন্যতায় ভোগে। এরা ধরে নেয় অফিসে কাজের চেয়ে নিজেকে জাহির করাটাই আসল। এরা সাধারণত খুব গুছিয়ে কথা বলতে পারে, কারণ এই একটা গুণই তাদের সম্বল।

দায় এড়ানো ম্যানেজার: কোনো কিছু খারাপ হলেই এরা বলির পাঁঠা খোঁজে। ওপর মহলের কাছে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে সব দোষ ওই অধিনস্ত কর্মীর। রবার্ট হোগান নামের এক ভদ্রলোক লিডারশিপ নিয়ে অনেক দিন গবেষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, এই স্বভাবটা হলো ক্যারিয়ার ধ্বংস হওয়ার সবচেয়ে বড় লক্ষণ। এরা আসলে সবসময় একটা ভয়ে ভয়ে থাকে। একটু ভুল হলেই এদের মনে হয় এই বুঝি সব শেষ হয়ে গেল।

প্রতিশ্রুতি বিক্রেতা: এরা কর্মীদের কাছ থেকে কাজ, আনুগত্য আর ধৈর্য আদায় করে নেয় একের পর এক মিথ্যে প্রতিশ্রুতির মুলা ঝুলিয়ে। যে প্রমোশন কোনোদিন হবে না, যে বাজেট কোনোদিন আসবে না, বা যে স্বীকৃতি সবসময় অধরাই থেকে যাবে, এরা সেসবের স্বপ্ন দেখায়। আমার তো মনে হয়, প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সময় এরা নিজেরাও বিশ্বাস করে যে তারা সত্যি বলছে। আর এ কারণেই এরা সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক, কারণ এরা নিজেদের স্মৃতিকেই নিজেরা ধোঁকা দেয়।

তথ্য মজুতকারী: এরা অফিসের দরকারি তথ্যগুলোকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করে। টিমের সদস্যরা সব জরুরি কথা জানতে পারে একদম শেষ মুহূর্তে। এরা সমপর্যায়ের কলিগদের অন্ধকারে রাখে, আর ওপর মহলে এমনভাবে রিপোর্ট করে যা প্রায় রূপকথার মতো। এরা মনে করে, অফিসে নিজের গুরুত্ব ধরে রাখতে হলে সবকিছু একটা রহস্যের চাদরে ঢেকে রাখা প্রয়োজন।

গ্যাসলাইটিং সুপারভাইজার: এরা সবচেয়ে ক্ষতিকর। এরা অবলীলায় এমন সব ঘটনা অস্বীকার করে বসে, যা কর্মীরা নিজের চোখে দেখেছে বা ইমেইলে পড়েছে। এরা কর্মীদের এমনভাবে বোঝায় যে কর্মীরা নিজেদের স্মৃতিশক্তি বা বুদ্ধি নিয়েই সন্দেহ করতে শুরু করে। এটা শুধু সুযোগসন্ধানী ব্যাপার নয়, এটা একটা গভীর মানসিক সমস্যা। মাঝে মাঝে এটা এমন পর্যায়ে যায় যা অনেকটা নার্সিসিস্টিক বা অসামাজিক মানসিকতার মতো। এরা জুনিয়রদের ক্যারিয়ার শেষ করে দেয়, অথচ বাইরে থেকে দেখে বোঝার কোনো উপায় থাকে না যে এরা কোনো অন্যায় করেছে।

৩. এই ম্যানেজারদের ভাগ্যে শেষমেশ কী জোটে?

অনেকে মনে করেন, অফিসে যারা মিথ্যা বলে তারা বোধহয় পার পেয়ে যায়। কিন্তু ঘটনাটা আসলে তা নয়। মিথ্যাবাদী ম্যানেজাররা খুব কমই পার পায়। তাদের পতনটা হয়তো একটু দেরিতে হয়, আর এই দেরির কারণেই সবার মনে হয় এরা বুঝি বেঁচে গেল।

পতন হওয়ার আগেই তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা কমতে থাকে। প্রথম কয়েক বছর হয়তো তাদের বেশ চৌকস মনে হয়। কলিগরা ছোটখাটো মিথ্যাগুলো এড়িয়ে যায়। কিন্তু পাঁচ-সাত বছর পর, ওপর মহলের কর্তারা আস্তে আস্তে তাদের হিসাব মেলাতে শুরু করেন। বোর্ডরুমে এক কথা, তো আড়ালে আরেক কথা। এক মিটিংয়ে এক দাবি, তো কাগজে-কলমে আরেক হিসাব। এই হিসাবগুলো কেউ প্রকাশ্যে আনে না ঠিকই, কিন্তু মনে মনে সবাই একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়।

সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয় কর্মীদের কাজের আগ্রহ কমে যাওয়ায়। এমি এডমন্ডসন তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, কর্মীরা যখন বোঝে তাদের ম্যানেজার ভরসা করার মতো লোক নন, তখন তারা আর নিজেদের সেরা আইডিয়াগুলো দেয় না। তারা শুধু টিকে থাকার মতো কাজটুকু করে। এই ম্যানেজাররা বুঝতেই পারে না যে তাদের টিমের এই বাজে অবস্থার জন্য আসলে তাদের নিজেদের খারাপ সুনামটাই দায়ী।

দুর্নাম চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ে। প্রতিটা মিথ্যা আসলে ভবিষ্যতের বিশ্বাসযোগ্যতা থেকে নেওয়া এক একটা ঋণ, আর এর সুদ খুব ভয়ংকর। এক দশক পর দেখা যায়, ভালো কোনো প্রতিষ্ঠানে এই ম্যানেজারের আর প্রমোশন হচ্ছে না। আমি নিজে এমন অনেক মিটিংয়ে ছিলাম যেখানে খুব দক্ষ একজনকে শুধু এই বলে বাদ দেওয়া হয়েছে, "ওর কথার ওপর তো আমরা ভরসা করতে পারি না।" কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগের দরকার পড়ে না, এই একটা কথাই যথেষ্ট।

সহকর্মীরাও খুব দ্রুত এদের একঘরে করে দেয়। একবার যে ঠকেছে, সে আর ভোলে না। সে অন্যদেরও সাবধান করে দেয়। নতুন কোনো চাকরিতে বড় পদ নিয়ে গেলেও এই ম্যানেজাররা দেখে, অফিসের ভেতরে ভেতরে সবাই আগেই জেনে গেছে যে এদের থেকে দূরে থাকতে হবে।

ওপরের দিকে ওঠার রাস্তাও নীরবে বন্ধ হয়ে যায়। বড় বড় প্রতিষ্ঠানে কর্তারা খুব ভালো করেই জানেন কাকে প্রমোশন দেওয়া নিরাপদ আর কাকে নয়। একবার 'অনিরাপদ' তকমা লেগে গেলে সেখান থেকে ফেরা খুব মুশকিল। কারণ নিজেকে প্রমাণ করার জন্য যে সততা দরকার, এই প্রতারকদের সেটাই থাকে না।

আর এতগুলো মিথ্যা গল্প একসাথে মনে রাখার মানসিক চাপও কিন্তু কম নয়। পল একম্যানের মতো গবেষকরা দেখিয়েছেন, দিনের পর দিন মিথ্যা বলতে থাকলে মানুষের মানসিক চাপ বাড়ে, ঘুম নষ্ট হয় আর উদ্বেগ বাড়ে। একজন মিথ্যাবাদী ম্যানেজার আসলে ভেতরে ভেতরে খুব ক্লান্ত একজন মানুষ, আর এই ক্লান্তি শেষ পর্যন্ত তার কাজে ধরা পড়েই।

৪. প্রতিষ্ঠানের যে ক্ষতিটা হয়

একজন মিথ্যাবাদী ম্যানেজার একটা পুরো ডিপার্টমেন্টের বারোটা বাজিয়ে দিতে পারে। আর এমন যদি কয়েকজন থাকে, তবে তারা একটা আস্ত প্রতিষ্ঠানকে ভেতর থেকে ফোঁকড়া করে দেয়।

অফিসে যদি মানসিক শান্তি না থাকে, তবে ভালো কাজ হওয়া অসম্ভব। কর্মীরা যখন দেখে সত্য বলার দাম নেই, তখন তারা সমস্যা নিয়ে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। ওপর থেকে দেখে মনে হয় অফিস খুব ভালো চলছে। কিন্তু একদিন হঠাৎ কোনো বড় দুর্ঘটনা, কোনো আইনি ঝামেলা বা বড় ক্লায়েন্ট হাতছাড়া হওয়ার পর বোঝা যায়, এতদিন ধরে কত জরুরি কথা ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল।

অফিসে তথ্যের প্রবাহও নষ্ট হয়ে যায়। খারাপ খবর ওপর পর্যন্ত পৌঁছায় খুব ধীরে, আর ভালো খবরগুলোতে রঙ চড়িয়ে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া হয়। বড় কর্তারা এমন সব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেন, যার সাথে বাস্তবের কোনো মিলই নেই। এর ফলে সবচেয়ে দক্ষ কর্মীরা, যাদের অন্য চাকরিতে যাওয়ার সুযোগ আছে, তারা চাকরি ছেড়ে দেয়। আর থেকে যায় শুধু তারা, যাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই বা যারা এই দূষিত পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে পারে। পাঁচ বছরের মধ্যে একটা অফিসের ৬০ শতাংশ ভালো কর্মী চলে গিয়ে সেখানে সাদামাটা কর্মীতে ভরে যেতে পারে।

চুপচাপ কাজ বন্ধ করে দেওয়া (কোয়ায়েট কুইটিং), কর্মী ছাঁটাইয়ের খরচ আর আইনি ঝামেলা বাড়তে থাকে। বাংলাদেশ শ্রম আইনে কর্মীদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে অনেক কথা বলা আছে। একজন গ্যাসলাইটিং করা বা দায় এড়ানো ম্যানেজারের কারণে অফিসের যে আইনি খরচ হতে পারে, তা ওই কর্মীর বেতনের চেয়েও অনেক বেশি। আমি নিজে দেখেছি, অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করার কারণে ১২,৫০,০০০ টাকারও বেশি ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে। সুনামের ক্ষতি তো বাদই দিলাম। দিনের পর দিন এমন চলতে থাকলে একটা প্রতিষ্ঠানের ৫০,০০,০০০ টাকার ওপরেও জরিমানা গুনতে হতে পারে।

সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয় অফিসের সংস্কৃতিতে। ম্যানেজাররা মিথ্যা বললে জুনিয়ররাও সেই একই জিনিস শেখে। তারা দেখে অফিসে কোন কাজে পুরস্কার মেলে আর কোনটায় শাস্তি। একটা প্রতিষ্ঠান হয়তো এরকম অবস্থায় কয়েক বছর বেশ লাভ করতে পারে, কিন্তু কাঠামোগত দিক থেকে তারা আসলে দেউলিয়া হয়ে যায়।

৫. অধিনস্ত কর্মীদের যে চরম মূল্য চোকাতে হয়

এবার একটু মানুষের দিকটা নিয়ে কথা বলা যাক। কোনো আবেগ দিয়ে নয়, একেবারে পরিষ্কার সত্যিটা বলি।

মানসিক চাপটা নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়। মিথ্যাবাদী ম্যানেজারের অধীনে যারা কাজ করে, তারা সারাক্ষণ একটা আতঙ্কে থাকে। কখন কোন কথাটা কীভাবে ঘুরিয়ে দেওয়া হবে, সেই চিন্তায় তাদের কর্টিসল হরমোন বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে হার্ট থেকে শুরু করে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায়।

এরপর আসে একটা চরম হতাশা। যখন কর্মীরা দেখে বারবার সত্যিটা প্রমাণ করার চেষ্টা করেও কোনো লাভ হচ্ছে না, তখন তারা হাল ছেড়ে দেয়। তারা বুঝতে পারে এই অফিসে সততার কোনো দাম নেই। এদিকে তাদের ক্যারিয়ারের বারোটা বাজতে থাকে। যে ম্যানেজার মিথ্যা বলছে, সে-ই আবার তাদের পারফরম্যান্স রিভিউ লিখছে। প্রমোশন আটকে দেওয়া হচ্ছে বা অন্য কাউকে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কর্মীর হয়তো কাজের দক্ষতা বাড়ছে, কিন্তু অফিসের খাতায় তার কোনো দামই থাকছে না।

নিজের ওপর থেকে বিশ্বাস এমনভাবে উঠে যায় যে, চাকরি ছাড়ার পরও সেই ধাক্কা সহজে কাটে না। গ্যাসলাইটিং ম্যানেজারের পাল্লায় পড়া কর্মীরা অনেক বছর পর অন্য জায়গাতেও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গেলে নিজের বিচারবুদ্ধিকে সন্দেহ করে। বেনেট টেপারের গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটা মারাত্মক বিষণ্ণতা আর উদ্বেগের জন্ম দেয়।

সবচেয়ে বড় আঘাতটা লাগে মানুষের নীতিবোধে। একজন সৎ কর্মীকে যখন অফিসের চাপে পড়ে মিথ্যার সাথে আপস করতে হয়, তখন তার মনের ভেতর যে ক্ষত তৈরি হয়, সেটা শুধু মানসিক চাপ নয়। এটা নিজের বিবেকের সাথে প্রতারণা করা। প্রমোশন পেলে বা ডাক্তারের কাছে গেলে এই ক্ষত কিছুটা হয়তো কমে, কিন্তু পুরোপুরি সারে না।

৬. ভুক্তভোগীদের জন্য ম্যাকিয়াভেলির কিছু পরামর্শ

এবার একটু সান্ত্বনার কথা বাদ দিয়ে বাস্তবের কথায় আসি। একজন মিথ্যাবাদী ম্যানেজারের অধীনে কাজ করা মানে হলো কোনো শত্রুর রাজদরবারে আটকে পড়া। এখানে ন্যায়ের কথা বলে লাভ নেই, এখানে ম্যাকিয়াভেলির বুদ্ধি কাজে লাগাতে হবে।

খেয়াল করুন: কাজ করার আগে খুব ভালো করে চারপাশটা দেখুন। একজন প্রকৃতিবিদ যেমন বন্যপ্রাণীদের পর্যবেক্ষণ করে, তেমনি আপনার ম্যানেজারকে পর্যবেক্ষণ করুন। তার মিথ্যা বলার ধরন, সে কাকে তোষামোদ করে, কাকে পছন্দ করে, কী ধরনের গল্প বানায়, সব খেয়াল করুন। আগেই ঝগড়া করতে যাবেন না। ম্যাকিয়াভেলি তার 'ডিসকোর্সেস অন লিভি' বইয়ে বলেছেন, "যে মানুষ সফল হতে চায়, তাকে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হয়।" বুদ্ধিমান কর্মী জানেন কখন কথা বলতে হবে, কখন চুপ থাকতে হবে আর কখন চাল চালতে হবে।

কাগজে-কলমে হিসাব রাখুন: রাগান্বিত না হয়ে, খুব শান্তভাবে সব কাজের হিসাব কাগজে-কলমে রাখুন। মিটিংয়ের পর একটা কনফারমেশন ইমেইল দিন। মুখে কোনো নির্দেশ দিলে সেটার একটা ফলো-আপ নোট পাঠান। কী সিদ্ধান্ত হলো, তা লিখে রাখুন। আমার অভিজ্ঞতা বলে, অফিসের যেকোনো বিবাদে এই লিখিত প্রমাণই সবচেয়ে বেশি কাজে আসে। মিথ্যাবাদী ম্যানেজার মানুষের ভুলে যাওয়ার স্বভাবের সুযোগ নেয়। লিখিত রেকর্ড হলো এর মোক্ষম ওষুধ। এগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার দরকার নেই। শুধু এগুলো থাকলেই ভবিষ্যতে যেকোনো বিবাদে আপনার জেতার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।

ধৈর্য ধরুন: একজন শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সাথে তার মাঠে খেলতে যাবেন না। সে বহু বছর ধরে এই প্রতারণার খেলা খেলে আসছে। সে তার আত্মপক্ষ সমর্থন করা প্র্যাকটিস করে রেখেছে। আপনার সুবিধা হলো সময়। প্রমাণ জমা করতে থাকুন আর অপেক্ষা করুন কবে সে নিজেই নিজের জালে জড়িয়ে পড়ে। আর বিশ্বাস করুন, সেই দিনটা আপনার ধারণার চেয়েও দ্রুত আসে।

আলাদা জোট তৈরি করুন: ওপরের মহলে, অন্য ডিপার্টমেন্টে বা অফিসের বাইরে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলুন। আপনার ম্যানেজারের চেয়ে দুই ধাপ ওপরের কোনো মেন্টর, বা অন্য বিভাগের কোনো সমপর্যায়ের কলিগ যে আপনার কাজ দেখেছে। মিথ্যাবাদী ম্যানেজারের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো আপনার সুনামের রাস্তাটা আটকে রাখা। আপনি নীরবে সেই রাস্তাটা খুলে দিন। জেফরি ফেফার অফিসের ক্ষমতা নিয়ে চমৎকার একটা কথা বলেছেন। যার সুনাম শুধু একটা মানুষের ওপর নির্ভর করে না, সেই আসলে শক্তিশালী।

নিজের যোগ্যতাকে প্রকাশ করুন: আপনার কাজ যেন শুধু ম্যানেজারের গণ্ডিতে আটকে না থাকে। অন্য ডিপার্টমেন্টের কাজে সাহায্য করুন। কথা বলার সুযোগ পেলে কাজে লাগান। অফিসের ম্যাগাজিনে লিখুন। মিটিংয়ে প্রেজেন্টেশন দিন। ম্যানেজার চায় আপনার কাজের গল্পটা শুধু সে-ই সবাইকে বলুক। তার কাছ থেকে এই সুযোগটা কেড়ে নিন।

চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্তটা জমিয়ে রাখুন: কখনো কখনো সবচেয়ে ম্যাকিয়াভেলিয়ান কাজ হলো নিজের শর্তে, মাথা উঁচু করে চাকরি ছেড়ে দেওয়া। ততদিনে আপনার সুনাম ছড়াবে, পরিচিতি বাড়বে, আর ওই মিথ্যাবাদী ম্যানেজার তার নিজের বানানো মিথ্যার জালে আটকে থাকবে। চাকরি ছেড়ে দেওয়া মানে হার মানা নয়, এটা হলো জায়গা পরিবর্তন করা। যে কর্মী নিজের সম্মান বাঁচিয়ে চাকরি ছাড়ে, সে আসলে ওই ম্যানেজারকে হারিয়ে দিয়ে যায়।

ম্যাকিয়াভেলির কথা দিয়েই এই পরামর্শ শেষ করি। 'দ্য প্রিন্স' বইয়ের পঁচিশতম অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন, "আমাদের অর্ধেক কাজের নিয়ন্ত্রক হলো ভাগ্য, কিন্তু বাকি অর্ধেক সে আমাদের হাতেই ছেড়ে দেয়।" যে কর্মী প্রস্তুতি নেয়, পর্যবেক্ষণ করে, প্রমাণ রাখে, সম্পর্ক তৈরি করে, অপেক্ষা করে আর সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নেয়, সে আসলে ভাগ্য ফেরার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে রাখে। বুদ্ধি ছাড়া শুধু সততা হলো ঝড়ের রাতের মোমবাতির মতো। আর সততা ছাড়া শুধু বুদ্ধি হলো এমন এক আগুন, যা নিজেকেই পুড়িয়ে মারে। এই দুটোকে খুব সাবধানে মেলাতে হবে, যদি আপনি একজন বাজে ম্যানেজারের হাত থেকে নিজের ক্যারিয়ার আর চরিত্র দুটোই বাঁচাতে চান।

৭. শেষ কথা

যেসব প্রতিষ্ঠান ম্যানেজারদের এই মিথ্যাচার মেনে নেয়, তাদের একদিন না একদিন এর পুরো মাশুল গুনতেই হয়। কখনো সেটা জরিমানার আকারে, কখনো ক্লায়েন্ট চলে যাওয়ার মাধ্যমে, কখনো মামলা খেয়ে, আবার কখনো অফিসের সেরা কর্মীদের হারিয়ে। মাশুল তাদের দিতেই হবে, শুধু কবে দিতে হবে সেটাই দেখার বিষয়।

যারা বোকার মতো আদর্শের কথা না ভেবে বুদ্ধিমত্তার সাথে এই পরিবেশ পার করে আসতে পারে, তারাই দিন শেষে জয়ী হয়। তারা নিজেদের সম্মান বাঁচিয়ে, পরিচিতি বাড়িয়ে আর কর্পোরেট জীবন সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা নিয়ে বের হয়ে আসে। তারা তাদের পরের চাকরিতে এমন একটা বাস্তব জ্ঞান নিয়ে যায়, যা সাধারণ ভালো পরিবেশে কাজ করা কর্মীরা কোনোদিনও পায় না।

কথাটা খুব একটা আনন্দের নয়, কিন্তু এটাই চরম সত্যি। মিথ্যাবাদী ম্যানেজার একদিন তার নিজের বোনা মিথ্যার জালেই আটকে যায়। একজন বুদ্ধিমান অধিনস্ত কর্মী শুধু এটুকু নিশ্চিত করে যে, সেই জালে যেন সে নিজেও আটকা না পড়ে। আর দিন শেষে, এটাই হলো সবচেয়ে বড় ম্যাকিয়াভেলি-দর্শন।