দশে মিলি করি ভুল
ছেলেবেলায় মুরুব্বিদের মুখে শুনেছি, দশে মিলি করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ। প্রবাদটির বিরুদ্ধে আমার কোনো নালিশ নেই। নালিশ হলো, ইদানীং অফিসে অফিসে এর একটি সংশোধিত সংস্করণ চালু হয়েছে, যার অর্থ দাঁড়ায়, দশে মিলে কাজ করো, দশে মিলে ভুল করো, তাতে কারও লজ্জা নেই। কারণ দোষটা তখন আর কারও একার থাকে না। দশজনে ভাগ করে নিলে বড় অন্যায়ও দেখতে ছোট লাগে, ঠিক যেমন বড় ভাগের পিঠা দশজনে ভাগ করলে গলায় আটকায় না।
কথাটা তেতো। তাই গোড়াতেই একটি সত্য ঘটনা বলে নিই, তেতো ওষুধ খালি পেটে খেতে নেই।
ফ্লোরিডার সেই ঠান্ডা সন্ধ্যা
১৯৮৬ সালের ২৭শে জানুয়ারি। ফ্লোরিডায় সন্ধ্যা নেমেছে এবং আশ্চর্য রকমের শীত পড়েছে। ফ্লোরিডা জায়গাটি শীতের জন্য বিখ্যাত নয়, সেখানে লোকে যায় রোদ পোহাতে। সেদিন প্রকৃতি রসিকতা করেছিল।
সন্ধ্যায় একটি টেলিফোন বৈঠক বসল। এক প্রান্তে নাসার কর্মকর্তারা, অন্য প্রান্তে মর্টন থায়োকল নামের প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরা, যাঁরা স্পেস শাটলের রকেট বুস্টার বানাতেন। আলোচনার বিষয় একটিই। পরদিন সকালে শাটল চ্যালেঞ্জার আকাশে উঠবে কি না।
প্রকৌশলীদের মধ্যে রজার বয়েসজলি নামে একজন ছিলেন, যিনি হিসাব দেখে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর দুশ্চিন্তার কারণ ছিল একটি রাবারের সিল, নাম ও-রিং। দেখতে সামান্য একটি গোল চাকতি, বাজারে গেলে দোকানি এমন জিনিসের দাম বলতে লজ্জা পাবে। কিন্তু রকেটের গায়ে তার দায়িত্ব বিরাট। বুস্টারের দুই অংশ যেখানে জোড়া লাগে, সেখানে যদি চুল পরিমাণ ফাঁক থাকে, গরম গ্যাস বেরিয়ে আসতে পারে। ও-রিং সেই ফাঁকটি বুজিয়ে রাখে।
মুশকিল হলো, রাবার ঠান্ডায় শক্ত হয়ে যায়। নরম থাকলে সে চাপ পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে আকার বদলে ফাঁক বন্ধ করে দেয়। জমে গেলে সে আর অত তাড়াতাড়ি নড়েচড়ে না। বয়েসজলি বললেন, এত কম তাপমাত্রায় বুস্টার কোনোদিন পরীক্ষা করা হয়নি, কাজেই কাল সকালে ওড়ানো নিরাপদ নয়। কথাটি জটিল ছিল না। তিনি বলেননি যে দুর্ঘটনা ঘটবেই। তিনি বলেছিলেন, এই ঠান্ডায় যন্ত্রটি কেমন আচরণ করবে আমরা জানি না, আর না জানাটাই একটা ঝুঁকি। জ্ঞানী লোকেরা বলেন, অজ্ঞতা স্বীকার করা বিজ্ঞানের প্রথম শর্ত। ব্যবস্থাপনার প্রথম শর্ত অবশ্য অন্য জিনিস, সময়সূচি।
আর সময়সূচি সেদিন অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। সংবাদমাধ্যম প্রস্তুত, অতিথিরা এসে গেছেন, উৎক্ষেপণ আগেও কয়েকবার পিছিয়েছে। আবার পিছোলে লোকে প্রশ্ন করবে। তাই ফোনের অন্য প্রান্ত থেকে প্রকৌশলীদের যে কথাটি বলা হলো, তার সরল বাংলা হলো, প্রকৌশলীর মতো ভাবা বন্ধ করুন, এবার ম্যানেজারের মতো ভাবুন।
শুনতে বাস্তববাদী লাগে, স্বীকার করি। প্রতিষ্ঠান চালাতে গেলে কেবল কারিগরি ঝুঁকি দেখলে চলে না, খরচ দেখতে হয়, প্রতিশ্রুতি দেখতে হয়, সুনাম দেখতে হয়। কিন্তু সব ঝুঁকি একই ওজনের নয়। প্রকল্প এক সপ্তাহ পিছোলে টাকার ক্ষতি হয়। রকেট আকাশে ফাটলে মানুষ মরে। এই দুটি জিনিস একই খাতায় লিখতে নেই।
পরদিন, ২৮শে জানুয়ারি ১৯৮৬, চ্যালেঞ্জার আকাশে উঠল এবং তিয়াত্তর সেকেন্ড পর ধ্বংস হয়ে গেল। সাতজন মানুষ মারা গেলেন। পরে তদন্তে দেখা গেল, আগের রাতে যে আশঙ্কার কথা বলা হয়েছিল, দুর্ঘটনার কারণের সঙ্গে তার সরাসরি সম্পর্ক ছিল।
লক্ষ করুন, সেদিন তথ্যের অভাব ছিল না, বুদ্ধিমান লোকেরও অভাব ছিল না। ঘরের দুই পাশেই দেশের সেরা মাথাগুলো বসে ছিল। তদন্তকারীরা মাস ছয়েক খেটে যে বিপদটি আবিষ্কার করলেন, সেটি দুর্ঘটনার আগের রাতেই একজন প্রকৌশলী স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছিলেন, বিনা পারিশ্রমিকে। সমস্যা ছিল অন্যত্র। সিদ্ধান্তটি ততক্ষণে নেওয়া হয়ে গেছে। শাটল উড়বে। বৈঠকটি সিদ্ধান্ত নিতে বসেনি, সিদ্ধান্তের পক্ষে সইসাবুদ জোগাড় করতে বসেছিল।
এমন ঘরে একজন মানুষ বললেন, না। ঘরটি তাঁর যুক্তির জবাব দিতে পারল না, তাই তাঁকে ভুল প্রমাণ করার বদলে তাঁর ভূমিকা বদলে দিতে চাইল। আপনি প্রকৌশলী নন, আপনি এখন ম্যানেজার। এই একটি বাক্যের ভেতর প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অসুখ লুকানো আছে। ঘর যখন কোনো সিদ্ধান্তের প্রেমে পড়ে যায়, তখন সত্যভাষীকে তার দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় না, বরং অনুরোধ করা হয় দায়িত্বটি সাময়িকভাবে ভুলে যেতে।
দলের সঙ্গে মিলতেই হবে?
টিম বিল্ডিং নিয়ে যত বই লেখা হয়েছে, বাংলাদেশের কোনো ব্যাংকের ঋণ নথি অত মোটা হয় না। প্রায় সব বইয়েই একটি পরিচিত উপদেশ আছে। দলের সদস্যদের মধ্যে বোঝাপড়া থাকতে হবে, সবাইকে মানিয়ে চলতে হবে, বিরোধ কমাতে হবে, মূল্যবোধ ও আচরণে মিল থাকা ভালো।
কথাগুলো পুরোপুরি ভুল নয়। কিন্তু ভেতরে একটি ফাঁদ আছে। দলের সদস্যদের একমত হওয়া দরকার এই বিষয়ে যে তাঁরা কী অর্জন করতে চান। কীভাবে অর্জন করবেন, সে বিষয়ে সবার একমত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং পদ্ধতি নিয়ে মতভেদ থাকা মঙ্গল। লক্ষ্য নিয়ে ঐক্য দলকে সামনে নেয়, আর পদ্ধতি নিয়ে অমিল দলকে খাদের কিনারা থেকে ফিরিয়ে আনে।
যে মানুষটি সহজে সবার সঙ্গে মিশে যান না, তিনিই অনেক সময় ঘরের একমাত্র লোক, যিনি বিপদের গন্ধ পান। সবাই যখন হাসছেন, তিনি হাসেন না। সবাই যখন মাথা নাড়ছেন, তিনি ফাইলের পাতা উল্টে বলেন, হিসাবটা কি আরেকবার দেখা যায়? এমন লোককে কেউ পছন্দ করে না। তাঁর প্রশ্নে সভা দীর্ঘ হয়, সিদ্ধান্তের আনন্দে জল পড়ে, সবাই যখন স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে চান তিনি তখন নতুন একটি ঝুঁকির কথা তোলেন। অথচ তিনিই অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের একমাত্র কার্যকর বিপদঘণ্টি।
যে প্রতিষ্ঠান কেবল মানানসই লোক বেছে দল গড়ে, সে আসলে দল গড়ে না, সে একটি বেতনভুক্ত কোরাস গড়ে। কোরাসের সবাই একই সুরে গায়, শুনতে চমৎকার লাগে। অসুবিধা একটাই, বাড়িতে আগুন লাগলেও তারা সুর বদলায় না।
এবার উল্টো দিকের ওকালতি
তবে হ্যাঁ, উল্টো যুক্তিটিও শুনে নেওয়া দরকার, কারণ সেটি মোটেও দুর্বল নয়। বাস্তব জীবনে বেশিরভাগ ব্যবস্থাপক ওই দিকটিই বেশি দেখেন, এবং তাঁরা কল্পনা করছেন না।
ঝগড়ার খরচ আছে। যে দল সারাক্ষণ তর্ক করে, সে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, কাজ ভাগ করতে পারে না, ছোট বিষয়কে বড় করে তোলে। ব্যবস্থাপকের যে সময় গ্রাহক বা ব্যবসার পেছনে যাওয়ার কথা, সেই সময় চলে যায় ঘরের ভেতরের ঠোকাঠুকি সামলাতে। অফিসে এমন মানুষও আছেন, যাঁরা আপত্তি করেন কেবল আপত্তি করার আনন্দে। তাঁদের কাছে নতুন তথ্য নেই, বিকল্প প্রস্তাব নেই, আছে কেবল নিজেকে অপরিহার্য প্রমাণ করার সাধ। তাঁরা মুখ খুললে অন্যরা ঘড়ি দেখেন। কোনো বিষয় নিষ্পত্তি হয়ে গেলেও পরের সভায় তাঁরা আবার সেটি টেনে আনেন, কারণ তাঁদের আপত্তি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নয়, আপত্তি এই যে সিদ্ধান্তটি তাঁদের কথামতো হয়নি।
হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের গবেষক মাইকেল হাউসম্যান ও ডিলান মাইনর কর্মক্ষেত্রে বিষাক্ত আচরণের আর্থিক ক্ষতি নিয়ে কাজ করেছিলেন। তাঁদের বক্তব্যের সারমর্ম হলো, একজন বিষাক্ত কর্মীকে নিয়োগ না দেওয়া অনেক সময় একজন অসাধারণ কর্মী নিয়োগ দেওয়ার চেয়েও লাভজনক। কারণ ভালো কর্মী নিজের কাজটি ভালো করেন, আর বিষাক্ত কর্মী আশপাশের দশজনের কাজ খারাপ করে দেন। তাঁর কারণে দক্ষ লোক চাকরি ছাড়েন, যাঁরা থাকেন তাঁদের মনোবল কমে, সহযোগিতা নষ্ট হয়, অভিযোগ বাড়ে, ব্যবস্থাপনার সময় নষ্ট হয়। কাজেই ভিন্নমতের নাম করে সব ধরনের দুর্বিনীত আচরণ মেনে নেওয়া চলে না।
আরেকটি কথাও সত্য, এবং কথাটি আমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে যায়। ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর ভিন্নমতের মানুষকে সম্মান করা খুব সহজ কাজ। রজার বয়েসজলির আশঙ্কা ফলে গিয়েছিল বলে আজ আমরা তাঁর নাম জানি। সেই একই সময়ে আরও বহু প্রকৌশলী নানা বিষয়ে আপত্তি তুলেছিলেন, যেসব আশঙ্কা ফলেনি। তাঁদের নাম ইতিহাস মনে রাখেনি। ইতিহাস সঠিক সতর্কবার্তাটি যত্ন করে তুলে রাখে, ভুল সতর্কবার্তাগুলো নর্দমায় ফেলে দেয়। কাজেই প্রশ্নটি সহজ নয়। বিষাক্ত মানুষ আর প্রয়োজনীয় ভিন্নমতের মানুষকে আলাদা করব কীভাবে, তাও আবার ঘটনা ঘটার আগে?
বিষাক্ত আর বেমানান এক নন
দুই ধরনের মানুষকে আমরা প্রায়ই এক পাল্লায় তুলি, কারণ দুজনের উপস্থিতিতেই সভা অস্বস্তিকর হয়। কিন্তু তাঁরা এক নন। বিষাক্ত মানুষ আক্রমণ করেন মানুষকে, বেমানান মানুষ আক্রমণ করেন প্রস্তাবকে। প্রথমজন বলেন, আপনি কোনোদিন কোনো কাজ ঠিকভাবে করতে পারেন না। দ্বিতীয়জন বলেন, এই হিসাবের তৃতীয় অংশটির সঙ্গে আগের তথ্য মিলছে না। প্রথমজন সহকর্মীকে ছোট করেন, দ্বিতীয়জন কাজের ভুলটি দেখান। প্রথমজন দলের আস্থা নষ্ট করেন, দ্বিতীয়জন দলের সিদ্ধান্ত পরীক্ষা করেন। একজন সমস্যা তৈরি করেন, অন্যজন সমস্যাটি আগেভাগে দেখতে পান।
দুজনকে আলাদা করার একটি সহজ কষ্টিপাথর আছে। আপত্তির যথাযথ জবাব দেওয়ার পর মানুষটি কী করেন, সেটি দেখুন। যিনি অভ্যাসবশত অভিযোগ করেন, তাঁকে যত ভালো উত্তরই দিন, তিনি থামবেন না। পরের সভায় আবার একই আপত্তি তুলবেন, কারণ তাঁর উদ্দেশ্য বিষয়টি বোঝা ছিল না, উদ্দেশ্য ছিল আপত্তিটি বাঁচিয়ে রাখা। কিন্তু যিনি সত্যিকার কারণে দ্বিমত করেন, তাঁকে যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা দিলে তিনি বলেন, ঠিক আছে, এখন পরিষ্কার হলো। তারপর তিনি হাতা গুটিয়ে কাজে নেমে পড়েন। এমন মানুষকে প্রথম দিন ঝামেলাবাজ মনে হতে পারে। তৃতীয় দিন মনে হয় না।
ভুল আপত্তিও কখনো কাজে লাগে
গবেষক শার্লান নেমেথ একটি চমৎকার জিনিস দেখিয়েছেন। দলে একজন সত্যিকারের ভিন্নমতের মানুষ থাকলে গোটা দলের চিন্তার মান উন্নত হয়, এমনকি সেই মানুষটির বক্তব্য ভুল হলেও।
প্রথমে শুনতে অদ্ভুত লাগে। একজন লোক ভুল বকলে দলের লাভ হবে কেন? কারণটি মানুষের স্বভাবে। ঘরে সবাই একমত থাকলে মানুষ নিজের মতের সমর্থন খোঁজে। যিনি ঋণ অনুমোদন করতে চান, তিনি অনুমোদনের পক্ষের তথ্যগুলোই দেখেন। যিনি কাউকে নিয়োগ দিতে চান, তিনি প্রার্থীর ভালো দিকগুলোই দেখেন। কিন্তু ঘরে একজন দ্বিমত করলে দৃশ্যটি বদলে যায়। তখন নিজের সিদ্ধান্ত রক্ষা করতে সবাইকে কারণ খুঁজতে হয়। সমর্থক খোঁজা আর কারণ খোঁজা এক জিনিস নয়। সমর্থক খুঁজলে আমরা নিজের বিশ্বাসকে শক্ত করি, কারণ খুঁজলে আমরা নিজের বিশ্বাসকে পরীক্ষা করি। ভিন্নমতের মানুষটি তাই সবসময় সঠিক উত্তর দেন না, কিন্তু তিনি বাকিদের ভালো প্রশ্ন করতে বাধ্য করেন।
এখানে একটি সাবধানবাণী আছে। অনেক সভায় একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, আপনি আজ বিরুদ্ধ পক্ষের হয়ে বলবেন। ইংরেজিতে একে বলে ডেভিলস অ্যাডভোকেট, শয়তানের উকিল। কাগজে পদ্ধতিটি বেশ শোনায়। কিন্তু নেমেথ দেখিয়েছেন, অভিনয় করা বিরোধিতা সত্যিকার বিরোধিতার কাজ করে না। ঘরের সবাই জানে, ভদ্রলোক নিজের বিশ্বাস থেকে বলছেন না, তাঁকে ভূমিকাটি দেওয়া হয়েছে। ফলে কেউ চাপ অনুভব করে না, কেউ নিজের মত নতুন করে যাচাই করে না। মানুষ ঠিকই বুঝতে পারে কোনটি যুক্তি আর কোনটি যুক্তির অভিনয়। নকল আপত্তি আর যাত্রাপালার রাবণ, দুটির ভয় দেখানোর ক্ষমতা সমান।
একটি রেখা, তিনটি রেখা
সলোমন অ্যাশের বিখ্যাত পরীক্ষাটি এত সরল যে বলতে সংকোচ হয়। একটি কার্ডে একটি রেখা দেখানো হলো, অন্য কার্ডে তিনটি। প্রশ্ন, তিনটির মধ্যে কোনটি প্রথমটির সমান? উত্তর এতই স্পষ্ট যে ভুল হওয়ার কথা নয়।
কিন্তু ঘরের বাকি সবাইকে আগে থেকে ভুল উত্তর দিতে শেখানো ছিল। একের পর এক সবাই একই ভুল উত্তর বললেন। শেষে আসল অংশগ্রহণকারীর পালা। তিনি নিজের চোখে সঠিক উত্তরটি দেখছেন, তবু ঘরের সবাই যখন অন্য কথা বলছে, তখন অনেক সময় তিনি নিজের চোখকেই অবিশ্বাস করলেন এবং ভুল উত্তরটি বললেন।
আমরা ভাবি, সত্য চোখের সামনে থাকলে মানুষ সত্যই বলবে। বাস্তবে মানুষ সত্যের চেয়ে একা হয়ে যাওয়াকে বেশি ভয় পায়। এ বড় পুরোনো ভয়, সভ্যতার চেয়েও পুরোনো, দল থেকে ছিটকে পড়া মানে একসময় শীতের রাতে বাঘের মুখে পড়া ছিল। অফিসে বাঘ নেই, আছে পারফরম্যান্স অ্যাপ্রাইজাল, কিন্তু ভয়ের চেহারা বিশেষ বদলায়নি।
পরীক্ষাটির দ্বিতীয় ফলটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ঘরে যদি মাত্র একজনও দলের ভুল উত্তরের সঙ্গে সুর না মেলান, তাহলে আসল অংশগ্রহণকারীর ওপর চাপ অনেকখানি কমে যায়। মজার কথা, ওই দ্বিতীয় ব্যক্তিকে সঠিক উত্তরটি দিতেও হয় না। কেবল সবার সঙ্গে একই ভুল সুরে না গাইলেই চলে। তখন প্রথমজন বুঝতে পারেন, আমি একা নই।
বেমানান মানুষটির সবচেয়ে বড় মূল্য তাই সবসময় তাঁর মতামত নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় মূল্য তাঁর উপস্থিতি। তিনি ঘরের বাকিদের মুখ খোলার সাহস জোগান।
যে তথ্যটি কেবল একজন জানেন
গবেষক গ্যারল্ড স্ট্যাসার ও উইলিয়াম টাইটাস আরেকটি অস্বস্তিকর জিনিস দেখিয়েছেন। দল সাধারণত আলোচনা করে সেই তথ্য নিয়ে, যা সবাই আগে থেকেই জানে।
ধরুন, পাঁচজনের একটি কমিটি একজন প্রার্থীকে নিয়োগ দেবে। প্রার্থীর কিছু তথ্য পাঁচজনই জানেন, আর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানেন কেবল একজন। সভায় সাধারণত পরিচিত তথ্যটিই ঘুরেফিরে আসে, কারণ পরিচিত কথা বলা সহজ এবং তাতে সঙ্গে সঙ্গে সমর্থন মেলে। একজন বললেন, প্রার্থীর অভিজ্ঞতা ভালো। অন্যজন মাথা নেড়ে বললেন, হ্যাঁ, আমিও তাই দেখলাম। তৃতীয়জন বললেন, শিক্ষাগত যোগ্যতাও ভালো। সবাই আবার মাথা নাড়লেন। সভাটি ততক্ষণে আলোচনা নয়, একটি সমবেত সংগীত।
কিন্তু পঞ্চম সদস্যটি হয়তো জানেন, প্রার্থী আগের প্রতিষ্ঠানে গুরুতর একটি নৈতিক সমস্যায় জড়িয়েছিলেন। তথ্যটি কেবল তাঁর কাছেই আছে। কথাটি বললে সবাইকে থামিয়ে ব্যাখ্যা করতে হবে, প্রশ্নের জবাব দিতে হবে, ঘরে অস্বস্তি তৈরি হবে, কেউ কেউ ভাববেন ভদ্রলোক অকারণে জল ঘোলা করছেন। তাই তিনি চুপ করে থাকেন। অথচ সিদ্ধান্ত বদলে দেওয়ার মতো তথ্যটি ছিল ঠিক তাঁরই কাছে।
মিল দেখে গড়া দলের সমস্যা এখানেই। সদস্যদের অভিজ্ঞতা এক, তথ্যের উৎস এক, চিন্তার ধরন এক, এবং ভুল করার ধরনও এক। তাঁদের সঙ্গে কাজ করা আরামদায়ক, চা খেতে খেতে সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। কিন্তু দলটি জন্ম থেকেই এক চোখ বুজে বসে আছে।
সিভির নিচের একটি শব্দ
এবার একটি ঘরোয়া গল্প বলি, বিদেশি গবেষণা বেশি হয়ে গেছে।
কয়েক বছর আগের কথা। ঢাকার একটি বড় বেসরকারি ব্যাংকে এমপ্লয়ি রিলেশনস বিভাগের একটি পদের জন্য ইন্টারভিউ চলছে। টেবিলের এক পাশে বোর্ড, অন্য পাশে একজন প্রার্থী। তাঁকে চিরপরিচিত প্রশ্নটি করা হলো, আপনার মতে এইচআরের কাজ কী?
প্রার্থী ইচ্ছে করলে অতি মধুর একটি মুখস্থ উত্তর দিতে পারতেন। বলতে পারতেন, এইচআর প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত অংশীদার। বলতে পারতেন, কর্মীরাই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। বোর্ডের সদস্যরা মাথা নাড়তেন, নম্বর দিতেন, সবাই সময়মতো লাঞ্চে যেতেন।
প্রার্থী সে পথে গেলেন না। তিনি বললেন, এইচআর সবার বন্ধু, আবার এইচআরকে সবার শত্রুও হতে হয়।
ঘরটি একটু নীরব হলো। তিনি ব্যাখ্যা করলেন, প্রতিষ্ঠানের সবাই এইচআরকে বন্ধু হিসেবে চায়, কিন্তু কখনো কখনো এইচআরকে না বলতে হয়। অজনপ্রিয় সত্যটি উচ্চারণের দায়িত্বও এইচআরের। নিয়ম ভাঙলে ব্যবস্থা নিতে হয়, তা সে কর্মী ভাঙুন বা ব্যবস্থাপনা ভাঙুক।
কথাটি খুব কঠিন ছিল না। কঠিন ছিল এই যে, এ ধরনের সত্য সাধারণত গদগদ ভাষায় বলা হয়, প্রার্থী সেটি সোজাসুজি বলে ফেলেছিলেন। ইন্টারভিউ শেষে কাগজপত্র ফেরত এল। দেখা গেল, এইচআর প্রধান প্রার্থীর সিভির নিচে নিজের হাতে একটি ইংরেজি শব্দ লিখেছেন, Incompatible. বাংলায় যার অর্থ, বেমানান। প্রার্থীর চাকরি হলো না।
প্রশ্ন হলো, তিনি ভুলটা কী বলেছিলেন? এইচআরকে তো একই সঙ্গে দুটি বিপরীত দায়িত্ব পালন করতে হয়। একই বিভাগ কর্মীকে পরামর্শ দেয়, আবার একই বিভাগ কর্মীর বিরুদ্ধে তদন্ত চালায়। একই বিভাগ কল্যাণ তহবিল দেখে, আবার প্রয়োজনে চাকরিচ্যুতির চিঠিও তৈরি করে। দুপুরবেলা একজন কর্মী ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে আসেন, বিকেলে সেই একই কর্মকর্তাকে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এইচআরকে কর্মীর আস্থা রাখতে হয়, আবার বোর্ডের কাছেও কার্যকর থাকতে হয়। দুটি দায়িত্ব সবসময় একই দিকে হাঁটে না।
যে এইচআর প্রধান সবার বন্ধু হতে চান, তিনি কারও বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারবেন না। আর যে বিভাগ প্রয়োজনের সময় ব্যবস্থা নিতে পারে না, সেটি নিয়ন্ত্রণ বিভাগ নয়। সেটি নীতিমালার বই হাতে বসে থাকা একটি অভ্যর্থনা ডেস্ক, যেখানে হাসিমুখে চা দেওয়া হয় এবং কোনো ফাইল নড়ে না।
প্রার্থী উত্তেজনা সৃষ্টি করতে চাননি, তিনি কেবল কাজটির আসল চেহারাটি বলে ফেলেছিলেন। মুশকিল হলো, ঘরটি সত্য শুনতে প্রস্তুত ছিল না, অন্তত এত সরাসরি ভাষায় নয়। আর তাঁকে বাদ দিলেন কে? ব্যবসা বিভাগের কেউ নন, অর্থ বিভাগের কেউ নন, নিজের সুবিধা রক্ষায় ব্যস্ত কোনো লাইন ম্যানেজারও নন। তাঁকে বাদ দিলেন সেই বিভাগের প্রধান, যে বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে তিনি কথা বলেছিলেন।
প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা সাধারণত এভাবেই শেষ হয়। বাইরে থেকে কেউ এসে ভেঙে দেয় না। নিয়োগের সময় একজন করে স্বাধীন মানুষ বাদ পড়েন, পদোন্নতির সময় একজন করে প্রশ্নকারী পিছিয়ে যান, এবং একদিন সকালে দেখা যায় ঘর ভর্তি কেবল মানানসই মানুষে। কাজেই ওই ইংরেজি শব্দটি শুধু প্রার্থীর বর্ণনা ছিল না। শব্দটি ঘরটিরও বর্ণনা ছিল।
আমাদের ঘরে কথা বলা আরও কঠিন
কর্মীর কণ্ঠস্বর নিয়ে পৃথিবীতে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। কিন্তু তার বড় অংশ হয়েছে এমন সমাজে, যেখানে ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে দ্বিমত করার সামাজিক দাম তুলনামূলকভাবে কম। সেখানে বসের সঙ্গে একদিন তর্ক করে পরদিন আবার স্বাভাবিকভাবে কাজ করা যায়। আমাদের এখানে ব্যাপারটি অত সরল নয়। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে পদমর্যাদার সিঁড়ি বেশ খাড়া, আর কে কত বছর চাকরি করেছেন সেটিও আলাদা এক ধরনের ক্ষমতা তৈরি করে, যার কোনো সাংগঠনিক নকশা নেই অথচ প্রভাব আছে।
আমাদের ভাষাতেও সেই ক্ষমতার ছাপ পড়েছে। কনিষ্ঠ কর্মকর্তা দ্বিমত জানাতে গিয়ে শুরু করেন এইভাবে, স্যার, আমি হয়তো ভুল বুঝছি। যুক্তি তখনো শুরু হয়নি, ক্ষমা চাওয়া শুরু হয়ে গেছে। কিংবা বলেন, স্যার, কিছু মনে না করলে একটা কথা বলতাম। যেন সত্য বলার আগে অনুমতি নেওয়ার একটি অলিখিত দরখাস্ত ফর্ম আছে।
একটি দৃশ্য কল্পনা করুন। ঢাকার কোনো বেসরকারি ব্যাংকের ক্রেডিট কমিটির সভা। ঘরে এসি চলছে, টেবিলে চায়ের কাপ, একটি মোটা ঋণ প্রস্তাবের ফাইল এক হাত থেকে অন্য হাতে যাচ্ছে। প্রস্তাবটি এসেছে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সুপারিশে। ঝুঁকি বিভাগের একজন তরুণ কর্মকর্তা ফাইলটি খুঁটিয়ে দেখেছেন এবং তাঁর হাতে কিছু বিপরীত তথ্য আছে। ঋণগ্রহীতা গ্রুপের অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব মিলছে না, জামানতের মূল্যায়ন সন্দেহজনক, নগদ প্রবাহে অসংগতি আছে।
তিনি জানেন কথাগুলো বলা উচিত। তিনি এটাও জানেন, বললে ঘরের সবাই কেবল ঋণের ঝুঁকি নিয়ে ভাববেন না। কেউ কেউ ভাববেন, ছেলেটি কি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করছে? আর যিনি ঋণটির সুপারিশ করেছেন, ভবিষ্যতে তাঁর পদোন্নতি বা বদলির ফাইলে তাঁরই মতামত থাকতে পারে। কাজেই সেদিন সভায় ফাইল নিয়ে আলোচনা হয়, মানুষ নিয়ে আলোচনা হয়, সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়। কেবল ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা হয় না।
তিন বছর পর ঋণটি খেলাপি হয়। তদন্ত কমিটি বসে, প্রতিবেদন তৈরি হয়, দায় নির্ধারণ হয়। আর প্রতিবেদনে যে তথ্যগুলো ওঠে, তার প্রায় সবই ঋণ অনুমোদনের দিন ওই ঘরের ভেতরেই ছিল। কাগজে ছিল, কিংবা একজন মানুষের মাথায় ছিল। পার্থক্য কেবল এটুকু যে বাক্যটি মুখ থেকে বেরোয়নি।
কাগজে সতর্কতা থাকলেই হয় না
বেয়ারিংস ব্যাংক ছিল দুই শত বছরের পুরোনো একটি ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান, যার সঙ্গে রাজপরিবারের হিসাবও ছিল। ১৯৯৫ সালে সেটি ধসে পড়ে, কারণ সিঙ্গাপুরে বসে নিক লিসন নামের এক তরুণ ব্যবসায়ী বিপুল লোকসান লুকিয়ে রেখেছিলেন। একজন মানুষের হাতে একই সঙ্গে লেনদেন করার ক্ষমতা এবং সেই লেনদেনের হিসাব যাচাই ও নিষ্পত্তি করার ক্ষমতা ছিল। সোজা বাংলায়, তিনি কাজটিও করতেন, আবার নিজের কাজের পরীক্ষকও ছিলেন নিজেই। এমন ব্যবস্থায় ফল ভালো হয় না, পরীক্ষার হলে ছাত্রকে খাতা দেখতে দিলে যা হয়।
মজার কথা, ধসের আগেই অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এই ঝুঁকির কথা লেখা হয়েছিল। অর্থাৎ বিপদটি অজানা ছিল না, কাগজে সতর্কতা ছিল। ছিল না কেবল একটি জিনিস, সতর্কতা উপেক্ষা করলে কী হবে তার ব্যবস্থা। সতর্কবার্তা তখন এমন এক চিঠি, যার কোনো প্রাপক নেই।
ওয়েলস ফারগোর ঘটনাতেও একই রোগ। কয়েকজন সাবেক কর্মী পরে জানিয়েছেন, তাঁরা প্রতিষ্ঠানের নৈতিকতা হটলাইনে ফোন করে ভুয়া হিসাব খোলার অভিযোগ করেছিলেন। কিছুদিন পর তাঁদের চাকরি চলে যায়। প্রতিষ্ঠানে কথা বলার চ্যানেল ছিল, হটলাইন ছিল, নীতি ছিল, দেয়ালে নম্বরও ছাপানো ছিল। ছিল না কেবল কথা বলার নিরাপত্তা। অভিযোগের বাক্স ঝোলানো খুব সহজ কাজ, ছুতোর মিস্ত্রি এক ঘণ্টায় করে দেবেন। অভিযোগ করার পর অভিযোগকারীকে রক্ষা করা কঠিন কাজ, তাতে বছরের পর বছর লাগে। তাই কেবল রাস্তা খোলা রাখলেই হয় না, সেই রাস্তায় হাঁটলে মানুষ কোথায় গিয়ে পৌঁছায় সেটিও দেখতে হয়।
এইচআর প্রধান কী করতে পারেন
তত্ত্ব এতক্ষণ যথেষ্ট হয়েছে। এবার কাজের কথা। একজন এইচআর প্রধান আগামী রবিবার ( যেহেতু লেখাটি শনিবার পাবলিশ হচ্ছে ) সকালে অফিসে ঢুকে কী করতে পারেন?
টিম প্লেয়ার ও কালচার ফিট শব্দ দুটি নতুন করে ভাবুন। অ্যাপ্রাইজাল ফর্ম আর ইন্টারভিউ স্কোরকার্ডে শব্দ দুটি প্রায় বাধ্যতামূলক। শুনতে ভালো, অর্থ অস্পষ্ট। একজন কর্মী নিয়ম মানেন, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন, সহকর্মীদের সম্মান করেন। তিনি নিশ্চয়ই দলের জন্য উপকারী। কিন্তু তিনি যদি একটি ভুল সিদ্ধান্তে প্রশ্ন তোলেন, তাহলে কি তিনি টিম প্লেয়ার নন? আর কালচার ফিট বলতে আমরা কী বোঝাচ্ছি, তিনি প্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধ মানেন, নাকি তাঁর সঙ্গে বসে মূল্যায়নকারীর আরাম লাগে? মাপকাঠি পরিষ্কার না হলে এসব শব্দ যোগ্যতা মাপে না, মূল্যায়নকারীর ব্যক্তিগত স্বস্তি মাপে। যাঁর সঙ্গে গল্প জমে, তিনি বেশি নম্বর পান। যিনি কঠিন প্রশ্ন করেন, তিনি কম পান। এবং ব্যক্তিগত আরামের হিসাবটি তখন প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী নথিতে ঢুকে পড়ে।
পদোন্নতির তালিকার পাশে আপত্তির তালিকা রাখুন। গত তিন বছরের পদোন্নতিপ্রাপ্তদের নাম নিন। পাশে রাখুন তাঁদের নাম, যাঁরা কোনো সভা, অফিস নোট বা আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে দ্বিমত বা ঝুঁকির কথা লিখেছেন। এবার দুটি তালিকা মিলিয়ে দেখুন, একই নাম দুই জায়গায় আছে কি না। যদি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশ্ন তুলেছেন এমন একজনও পদোন্নতি না পেয়ে থাকেন, তাহলে সমস্যাটি সম্ভবত মূল্যবোধের নয়, আরও যান্ত্রিক কিছু। প্রতিষ্ঠানের বাছাই ব্যবস্থা নীরবে একটি নির্দিষ্ট ধরনের মানুষকে ছেঁকে বাদ দিচ্ছে। যাঁরা চুপ থাকেন তাঁরা ওপরে উঠছেন, যাঁরা ঝুঁকি দেখান তাঁরা পেছনে পড়ে থাকছেন। যন্ত্রটি ভুল করছে না। যন্ত্রটি ঠিক সেই কাজটিই করছে, যেভাবে তাকে বানানো হয়েছে।
সভায় কনিষ্ঠ কর্মকর্তাকে আগে বলতে দিন। আমাদের সভায় জ্যেষ্ঠরা আগে বলেন, তারপর কনিষ্ঠদের বলা হয়, এবার তোমরা বলো। কিন্তু তখন কনিষ্ঠদের কাছে আর মতামত থাকে না, থাকে কেবল সাহসের পরীক্ষা। নিয়মটি উল্টে দিন। সবচেয়ে কনিষ্ঠ কর্মকর্তা আগে তাঁর পর্যবেক্ষণ বলবেন, তারপর পর্যায়ক্রমে ওপরের দিকে। কোনো জ্যেষ্ঠ মতামত টেবিলে ওঠার আগেই কনিষ্ঠদের বক্তব্য নিয়ে নিতে হবে। কারণ ক্ষমতাবান একজন মত দিয়ে ফেললে ঘরের আলোচনা আর তথ্যের ওপর থাকে না, তাঁর অবস্থানের চারপাশে প্রদক্ষিণ করতে থাকে।
আপত্তি কার্যবিবরণীতে লিখুন। কার্যবিবরণীতে কেবল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত লিখবেন না। কার আপত্তি ছিল, সেটিও লিখুন, আর পাশে লিখুন আপত্তিটির নিষ্পত্তি কীভাবে হলো। যথাযথ জবাব দেওয়া হলে সেটিও নথিভুক্ত থাকবে। নাকচ করা হলে দেখা যাবে কে নাকচ করলেন এবং কোন যুক্তিতে। নাম থাকলে সিদ্ধান্তের একজন মালিক থাকে। নাম না থাকলে সিদ্ধান্তটি অনাথ হয়ে যায়, আর অনাথ সিদ্ধান্তের দায় কেউ নেয় না।
অভিযোগ ব্যবস্থাকে লাইন ম্যানেজমেন্টের বাইরে রাখুন। কোনো কর্মীর অভিযোগ যদি ঘুরেফিরে সেই ব্যবস্থাপকের টেবিলেই পৌঁছায়, যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাহলে সেটি চ্যানেল নয়, সাজানো দরজা। অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব এমন একটি স্বাধীন ইউনিটের হাতে থাকতে হবে, যার ফলাফল সংশ্লিষ্ট লাইন ম্যানেজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। বোর্ডে রিপোর্ট করার ধরনও বদলাতে হবে। কতটি অভিযোগ এসেছে, এই সংখ্যাটি বিশেষ কিছু বলে না। দেখতে হবে কত শতাংশ অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলো, কতটির পর সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলো, আর অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে পরে কোনো প্রতিশোধ হলো কি না। যে প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর একটি অভিযোগও প্রমাণিত হয় না, সে প্রতিষ্ঠান হয়তো নিষ্কলঙ্ক নয়। হয়তো তার অভিযোগ চ্যানেলটি এমনভাবে সাজানো, যেখানে সত্য অভিযোগও শেষ পর্যন্ত মিথ্যা হয়ে বেরিয়ে আসে।
এক্সিট ইন্টারভিউ ৯০ দিন পরে নিন। চাকরির শেষ দিনে কেউ পুরো সত্য বলেন না। সেদিন তাঁর মাথায় থাকে ছাড়পত্র, পাওনা, অভিজ্ঞতার সনদ আর ভবিষ্যৎ রেফারেন্স। ঝামেলা বাড়ানোর মতো বোকামি তিনি করবেন না। তাই শেষ দিনের এক্সিট ইন্টারভিউ প্রায়ই একটি ভদ্রতাসূচক আনুষ্ঠানিকতা। ৯০ দিন পরে আবার যোগাযোগ করুন, এবং সাক্ষাৎকার নিন এমন একজনকে দিয়ে, যিনি ওই কর্মীর আগের বিভাগের কেউ নন। তারপর একটিমাত্র প্রশ্ন করুন, আপনি কোন কথাটি বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন, আর কবে থেকে বন্ধ করেছিলেন? উত্তরটি মন দিয়ে শুনুন। কেউ বলবেন, একটি নির্দিষ্ট সভার পর থেকে। কেউ বলবেন, একটি পদোন্নতি না হওয়ার পর থেকে। কেউ বলবেন, একজন সহকর্মী সত্য বলে শাস্তি পাওয়ার পর থেকে। এগুলো নিছক কর্মী মতামত নয়, এগুলো ঝুঁকির তথ্য, এবং এগুলোর যাওয়া উচিত বোর্ডের সেই কমিটির কাছে যাঁরা নিরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিবেদন দেখেন। আর্থিক নিরীক্ষা হিসাবের খাতা থেকে বিপদ খুঁজে বের করে, এক্সিট ইন্টারভিউ মানুষের নীরবতা থেকে বিপদ খুঁজে বের করে। দুটিই একই পরিবারের তথ্য, কেবল একটির গায়ে টাকার গন্ধ আছে বলে আমরা তাকে বেশি খাতির করি।
নিয়োগে একটি প্রশ্ন যোগ করুন। প্রার্থীকে জিজ্ঞেস করুন, শেষ কবে আপনার মতামত নাকচ হয়েছিল, আর তার পরের সপ্তাহে আপনি কী করেছিলেন? উত্তরটি খুব মন দিয়ে শুনুন। যিনি বলেন, সিদ্ধান্ত নাকচ হওয়ার পরও তিনি আড়ালে নিজের পদ্ধতিতেই কাজ করেছেন, তিনি বিপজ্জনক, কারণ তিনি ভিন্নমত আর অবাধ্যতার তফাত বোঝেন না। যিনি বলেন, তিনি অভিমান করে চুপ হয়ে গিয়েছিলেন, তিনিও কাজের নন, কারণ সিদ্ধান্ত পক্ষে না গেলে তিনি দল থেকে মানসিকভাবে সরে যান। কিন্তু যিনি বলেন, আমি আমার আপত্তি লিখিতভাবে জানিয়েছিলাম, সিদ্ধান্ত আমার পক্ষে হয়নি, তারপরও আমি সিদ্ধান্তটি মেনে নিয়ে পুরো শক্তি দিয়ে বাস্তবায়ন করেছি, তাঁকে গুরুত্ব দিয়ে দেখুন। আপনি এমন মানুষ খুঁজছেন না যিনি সবসময় বিরোধিতা করবেন। আপনি খুঁজছেন এমন একজনকে, যাঁর ভেতরে দ্বিমত আর আনুগত্য পাশাপাশি বাস করতে পারে। তিনি সিদ্ধান্তের আগে প্রশ্ন করবেন, সিদ্ধান্তের পরে দায়িত্ব পালন করবেন, এবং প্রয়োজনে নিজের আপত্তির নথিটিও যত্ন করে তুলে রাখবেন। এই গুণ থাকলে একজন বেমানান মানুষকে সহ্য করা যায়। বরং তাঁকে কাছে রাখা দরকার, কারণ শান্তির সময় তাঁকে অপ্রয়োজনীয় মনে হয় এবং দুর্যোগের সময় তিনিই একমাত্র প্রয়োজনীয় লোক।
শেষ কথা
সিভির নিচে কোনো মন্তব্য লেখার আগে মন্তব্যটি দুবার পড়ুন। প্রথমবার পড়ুন প্রার্থীর বর্ণনা হিসেবে, দ্বিতীয়বার পড়ুন নিজের এবং নিজের প্রতিষ্ঠানের বর্ণনা হিসেবে। কারণ বেমানান শব্দটি কখনো প্রার্থীর সমস্যা বোঝায়, আবার কখনো বোঝায় যে ঘরটি সত্য সহ্য করতে পারে না।
মিল আর সামর্থ্য এক জিনিস নয়। মিল হলো, দলের সদস্যরা একে অন্যের সঙ্গে কতটা স্বস্তি বোধ করেন। সামর্থ্য হলো, দলটি কতখানি অস্বস্তিকর সত্য হজম করতে পারে। অনেক সময় একটি অন্যটির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়, এবং আমরা প্রায় সবসময় স্বস্তিকেই বেছে নিই, কারণ স্বস্তির দাম আজ মেটাতে হয় না।
যে প্রতিষ্ঠান বারবার স্বস্তি বেছে নেয়, সে একদিন কোনো কঠিন সকালে আবিষ্কার করে, যে মানুষটির স্বভাব তার পছন্দ হয়নি, সেই মানুষটিই ছিল তার বিপদঘণ্টি। তাঁকে সরিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আসলে নিজের সতর্কসংকেতের তারটিই কেটে দিয়েছিল।
তারপর আগুন লাগল। ঘরের সবাই তখন একমত ছিলেন। কেবল আগুনটি তাঁদের সঙ্গে একমত ছিল না।
