আমাদের ইস্কুলে একজন হেডমাস্টার ছিলেন। ভীষণ কড়া মেজাজের মানুষ। বছরের শুরুতে তিনি সব ক্লাস টিচারদের ডেকে বলতেন, "দেখুন মাস্টার সাহেবরা, নিয়ম খুব সোজা। আপনার ক্লাসের ছাত্রদের মধ্যে সেরা পাঁচজনকে বেছে নিয়ে তাদের নাম দেবেন ‘ভালো ছাত্র’-এর খাতায়। আর সবচেয়ে দুর্বল পাঁচজনকে বেছে তাদের নাম দেবেন ‘খারাপ ছাত্র’-এর খাতায়। বাকিরা থাকবে মাঝামাঝি।"

আমাদের বাংলার শিক্ষক, মতিন স্যার, একবার মিনমিন করে প্রশ্ন করলেন, "স্যার, যদি কোনো ক্লাসে সবাই খুব ভালো হয়? যদি পাঁচজন খারাপ ছাত্র খুঁজে না পাওয়া যায়?"

হেডমাস্টার সাহেব কড়া চোখে তাকালেন। বললেন, "না পাওয়া গেলে চলবে না। নিয়ম তো নিয়মই। জোর করে হলেও পাঁচজনের নাম দিতে হবে। নাহলে আপনার চাকরি থাকবে না।"

এই অদ্ভুত নিয়মের কথা মনে পড়ল কর্মক্ষেত্রের এক জনপ্রিয় মডেলের কথা ভাবতে গিয়ে, যার নাম ‘বেল কার্ভ’ বা ‘ফোর্সড র্যাংকিং । কয়েক দশক ধরে এই মডেলটিই ছিল পারফরম্যান্স মূল্যায়নের রাজা। ধারণাটা খুব সাধারণ। আপনার সব কর্মীকে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিন এবং আগে থেকে ঠিক করে রাখা কিছু ভাগে তাদের ফেলে দিন। যেমন, কিছু থাকবেন সেরা পারফর্মার, বিশাল একটা অংশ থাকবে মাঝামাঝি, আর কিছু থাকবেন নিচের স্তরে, যাদের হয় ‘উন্নতি’ করতে হবে অথবা চাকরি থেকে বিদায় নিতে হবে। শুনতে বেশ যুক্তিসঙ্গত আর কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সহজ উপায় মনে হয়, তাই না?

কিন্তু সত্যি কথা হলো, এই বেল কার্ভ মডেলটা একটা ভয়াবহ, পুরোনো আর অকেজো জিনিস। এটা প্রতিভা তৈরি করে না, প্রতিভাকে পঙ্গু করে দেয়। এটা পারফরম্যান্স বাড়ায় না, বরং কর্মক্ষেত্রে বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করে। কোনো কোম্পানি যদি এখনো এই মডেল আঁকড়ে ধরে থাকে, তবে তারা শুধু সময়ের থেকে পিছিয়েই নেই, তারা নিজেদের অজান্তেই নিজেদের ক্ষতি করছে।

এই অদ্ভুত মডেলের যত সমস্যা

বেল কার্ভ সিস্টেমের মূল সমস্যা হলো, এটি এমন এক সমাধান যা আদতে কোনো সমস্যার সমাধান করে না। এটি ধরে নেয় যে, যেকোনো বড় দলে মানুষের পারফরম্যান্স সবসময় একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক বিন্যাস মেনে চলবে। কিন্তু মানুষের সম্ভাবনা বা অবদান তো পদার্থবিজ্ঞানের কণা নয় যে তারা নির্দিষ্ট সূত্র মেনে চলবে।

এবার বেল কার্ভের পেছনের কারিগরি বা টেকনিক্যাল দিকটা একটু তলিয়ে দেখা যাক। এই মডেলটি মূলত পরিসংখ্যানের 'নরমাল ডিস্ট্রিবিউশন' বা স্বাভাবিক বিন্যাসের ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। সোজা কথায়, এটি ধরে নেয় যে ১০০ জন কর্মী থাকলে তাদের মধ্যে ১০ জন হবেন 'অসাধারণ' (Top Performers), ৮০ জন হবেন 'গড়পড়তা' (Average Performers), এবং বাকি ১০ জনকে 'দুর্বল' (Bottom Performers) হতেই হবে। এই শতাংশের হারটি আগে থেকেই নির্দিষ্ট করা থাকে এবং ম্যানেজারকে জোর করে তার কর্মীদের এই ছাঁচে ফেলতে হয়। এর ভেতরের ভুলটা ঠিক এখানেই। পরিসংখ্যানের এই নিয়মটি কেবল বিশাল ও random নমুনার ক্ষেত্রে খাটে। কিন্তু একটি কোম্পানির দল, বিশেষ করে ছোট দল, কোনোভাবেই random নমুনা নয়। কর্মীদের যোগ্যতা দেখে নিয়োগ দেওয়া হয়, তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং তারা একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। তাই এমন একটি দলে সবার পারফরম্যান্স একযোগে খুব ভালো বা খুব খারাপ হতেই পারে, যা বেল কার্ভের নিয়মকে লঙ্ঘন করে। ভাবুন তো, একটি দলে সদস্য সংখ্যা মাত্র ৫ জন। সবাই দুর্দান্ত কাজ করছে। কিন্তু বেল কার্ভের নিয়মে যদি ১০% কর্মীকে 'দুর্বল' হিসেবে চিহ্নিত করতেই হয়, তাহলে ম্যানেজার কী করবেন? তিনি তখন বাধ্য হয়ে এই পাঁচজন ভালো কর্মীর মধ্যে থেকে একজনকে বেছে নিয়ে তাকে 'দুর্বল' তকমা দেবেন, যা তার আসল পারফরম্যান্সের প্রতিফলন নয়, বরং একটি গাণিতিক কোটা পূরণের চেষ্টা মাত্র। ছোট দলের ক্ষেত্রে এই মডেলটি তাই কেবল ত্রুটিপূর্ণই নয়, রীতিমতো হাস্যকর ও অন্যায্য হয়ে ওঠে।

১. সহযোগিতার পরিবেশ নষ্ট করে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি করে

ভাবুন তো, পাঁচজন অত্যন্ত মেধাবী ইঞ্জিনিয়ার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একটি দারুণ প্রজেক্টে কাজ করছেন। হঠাৎ বেল কার্ভের নিয়ম চালু হলো। এখন নিয়ম অনুযায়ী, এই পাঁচজনের মধ্যে মাত্র একজন বা দুজন ‘সেরা পারফর্মার’ হতে পারবেন। এর মানে কী দাঁড়াল? এর মানে হলো, আপনার সহকর্মীকে সাহায্য করার অর্থ নিজের র্যাংকিং ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়া। যে সহকর্মী গতকালও আপনার বন্ধু ছিল, আজ সে-ই আপনার প্রতিযোগী। এই সিস্টেম কর্মীদের মধ্যে সহযোগিতার বদলে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা, তথ্য লুকিয়ে রাখার প্রবণতা আর নোংরা রাজনীতির জন্ম দেয়। যে উদ্ভাবন আর সহযোগিতার জন্য আধুনিক কোম্পানিগুলো হাহাকার করে, এই মডেল ঠিক তার গলায় ছুরি চালায়।

২. ম্যানেজারের ভূমিকা এবং পরিস্থিতিকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দেয় না

বেল কার্ভ মডেলটি একজন কর্মীর পারফরম্যান্সকে তার ব্যক্তিগত আউটপুট হিসেবে দেখে। এখানে ম্যানেজারের ভূমিকা বা দলের পরিস্থিতিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দেওয়া হয় না। ধরুন, একজন প্রতিভাবান কর্মীকে এমন একটি দলে দেওয়া হলো যেখানে বাকিরা সবাই দুর্বল। স্বাভাবিকভাবেই, তুলনামূলক বিচারে তিনি ‘সেরা পারফর্মার’ হয়ে গেলেন। আবার সেই একই কর্মীকে যদি একদল সেরা কর্মীদের সঙ্গে রাখা হয়, তাহলে হয়তো র্যাংকিংয়ের খাতিরে তাকে ‘দুর্বল’দের কাতারে ফেলে দেওয়া হবে। এতে কিন্তু তার কোনো দোষ নেই। এটা আসলে পারফরম্যান্সের পরিমাপ নয়, এটা হলো একটি ত্রুটিপূর্ণ সিস্টেমের ভেতর আপেক্ষিকতার খেলা।

৩. সবচেয়ে বড় অংশটাকেই হতাশ করে ছাড়ে

যেকোনো প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৭০ শতাংশ কর্মী থাকেন যারা ‘মাঝামাঝি’ বা ‘মোটামুটি’ স্তরে পড়েন। এরাই কিন্তু আপনার কোম্পানির মূল চালিকাশক্তি। দিনের পর দিন এরাই নীরবে কাজ করে যান। বেল কার্ভ সিস্টেম তাদের কানে কানে একটাই বার্তা দেয়, "তুমি যতই পরিশ্রম করো না কেন, তুমি গড়পড়তা। তোমার জন্য ওপরে কোনো জায়গা নেই।" এই বার্তাটি তাদের মনোবল ভেঙে দেয়। তারা তখন নীরবে কাজ ছেড়ে দেওয়ার পথ খোঁজে অথবা নিরুৎসাহিত হয়ে কোনোমতে চাকরিটা চালিয়ে যায়।

৪. এটি পক্ষপাতদুষ্ট এবং বৈষম্যমূলক

যখন একজন ম্যানেজারকে জোর করে কিছু কর্মীকে ‘দুর্বল’ হিসেবে চিহ্নিত করতে বলা হয়, তখন তার ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বা অসচেতন পক্ষপাতিত্ব কাজ করা শুরু করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই সিস্টেমে প্রায়শই সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতাবলম্বী কর্মীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। যারা একটু অন্যরকম, যারা গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসান না, তাদেরকেই ‘দুর্বল’এর তকমা দিয়ে বিদায় করে দেওয়া হয়। এতে কর্মক্ষেত্রে বৈচিত্র্য কমে যায় এবং উদ্ভাবনের পথ বন্ধ হয়ে যায়।

বড় বড় কোম্পানিগুলোও এই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছে

বেল কার্ভ সিস্টেমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো সেই সব কোম্পানি, যারা একসময় এর সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিল, কিন্তু পরে públicamente এটি ত্যাগ করেছে।

মাইক্রোসফট: এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। কয়েক দশক ধরে তারা এই র্যাংকিং সিস্টেম ব্যবহার করেছে। তাদের সাবেক কর্মীরা বলেন, এর ফলে উদ্ভাবন প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, কারণ কেউই ঝুঁকিপূর্ণ প্রজেক্টে কাজ করতে চাইত না। ২০১৩ সালে তারা এই প্রথা বাতিল করে।

অ্যাডোবি: ২০১২ সালে তারা বেল কার্ভ বাদ দিয়ে নিয়মিত ‘চেক-ইন’ বা আলাপ-আলোচনার ব্যবস্থা চালু করে। এর ফলে তাদের কর্মী ঝরে পড়ার হার ৩০% কমে যায়।

জেনারেল ইলেকট্রিক (GE): জ্যাক ওয়েলসের অধীনে যে কোম্পানিটি ছিল এই মডেলের পোস্টার বয়, তারাও শেষ পর্যন্ত এই প্রথা ত্যাগ করেছে।

ডেলয়েট: তাদের এক গবেষণায় দেখা যায় যে, এই পারফরম্যান্স রিভিউ প্রক্রিয়ায় বছরে ২০ লক্ষ ঘণ্টা নষ্ট হচ্ছিল এবং কেউই এটি পছন্দ করছিল না। তারাও এই সিস্টেম বদলে ফেলে।

তাহলে উপায় কী?

বেল কার্ভ যদি বাদ দিতে হয়, তবে তার জায়গায় কী ব্যবহার করা উচিত? উত্তরটা খুব সহজ। বছরে একবার বিচার করার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে নিয়মিত উন্নয়নমূলক আলাপের দিকে ঝুঁকতে হবে।

নিয়মিত আলাপ ও ফিডব্যাক: বছরের শেষে পরীক্ষার মতো মূল্যায়নের বদলে ম্যানেজারের উচিত কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা। তাদের লক্ষ্য, অগ্রগতি এবং চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আলোচনা করা। এতে ফিডব্যাক অনেক বেশি কার্যকর ও সময়োপযোগী হয়।

সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ: কর্মীদের জন্য স্বচ্ছ এবং পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য (যেমন OKR) নির্ধারণ করুন। এতে কর্মীরা বুঝতে পারেন কোম্পানির বড় লক্ষ্যের সঙ্গে তার কাজের সংযোগ কোথায়।

শক্তির ওপর জোর দেওয়া: "তুমি কোথায় ব্যর্থ হয়েছ?" এই প্রশ্ন না করে বলুন, "কোন কাজটা তুমি সবচেয়ে ভালো পারো এবং কীভাবে আমরা তোমাকে আরও বিকশিত হতে সাহায্য করতে পারি?"

সবার মতামত নেওয়া: শুধু ম্যানেজার নয়, সহকর্মী এবং জুনিয়রদের কাছ থেকেও ফিডব্যাক নেওয়ার ব্যবস্থা করুন। এতে একজন কর্মীর অবদান সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়।

শেষ কথা

পৃথিবী বদলে গেছে। আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করি যেখানে সহযোগিতা এবং জ্ঞানই মূল শক্তি। শিল্পযুগের জন্য তৈরি এই বেল কার্ভ মডেলটি আজকের বাস্তবতার সঙ্গে একেবারেই বেমানান। এই বেল কার্ভ নামক ভূতটিকে এবার কর্মক্ষেত্র থেকে বিদায় জানানোর সময় এসেছে। বিশ্বাস করুন, আপনার কোম্পানির কর্মপরিবেশ, কর্মীদের মনোবল আর আপনার ব্যবসার উন্নতি সবাই আপনাকে ধন্যবাদ জানাবে।