এইচআর এর কাজটা বাইরে থেকে খুব পরিষ্কার মনে হয়। নিয়ম আছে, নীতিমালা আছে, ফাইল আছে, ইমেইল আছে। কে নিয়োগ পাবে, কে বদলি হবে, কার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, কার চাকরি শেষ হবে, কোন কাগজে কার সই লাগবে। সবকিছু যেন খুব গোছানো।

কিন্তু মানুষের জীবন কখনও গোছানো হয় না।

এইচআর বসে থাকে সেই অগোছালো জীবনের মাঝখানে। এক পাশে মানুষের কষ্ট, আরেক পাশে প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা। এক দিকে আইনের বাধ্যবাধকতা, অন্য দিকে ব্যবস্থাপনার চাপ। কোথাও নৈতিক বিচার, কোথাও বাস্তবতার হিসাব। প্রথম দেখায় বিষয়গুলো স্বাভাবিক মনে হয়। যেন এগুলো অফিসের নিয়মিত কাজ। কিন্তু প্রতিটি নিয়মিত কাজের ভেতরেও একজন মানুষ থাকে। তার ভয় থাকে, অপমান থাকে, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকে।

প্রতি বছর আন্তর্জাতিক এইচআর দিবস আসে। এই দিনে প্রতিষ্ঠানগুলো এইচআর-কে ধন্যবাদ জানায়। কেক কাটা হয়। সুন্দর ছবি তোলা হয়। নেতৃত্ব থেকে শুভেচ্ছা বার্তা আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখা হয়, “Our HR team is our strength.” কথাগুলো ভালো। মানুষকে ধন্যবাদ দেওয়া অবশ্যই ভালো।

তবু কোথাও যেন একটু ফাঁক থেকে যায়।

কারণ এই ধন্যবাদের মধ্যে এইচআর কাজের নীরব ক্লান্তির কথা থাকে না। থাকে না সেই রাতের কথা, যখন একটি কঠিন মিটিংয়ের পর বাড়ি ফিরে মানুষটি চুপ করে বসে থাকে। থাকে না সেই অস্বস্তির কথা, যখন কাউকে শৃঙ্খলার কথা বলতে হয়, অথচ তার চোখের পানি দেখে বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে যায়।

এইচআর শুধু নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, বেতন, কমপ্লায়েন্স বা কর্মী সম্পৃক্ততার কাজ নয়। অনেক বছর বিভিন্ন পরিবেশে কাজ করতে করতে, বিশেষ করে ব্যাংকিং, এমপ্লয়ি রিলেশনস, তদন্ত, শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা, অভিযোগ নিষ্পত্তি, এইচআর অপারেশনস ও কমপ্লায়েন্সের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে আমি একটি বিষয় বুঝেছি। এইচআর পেশাজীবীরা অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের শক অ্যাবজরবার।

তারা সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগের উদ্বেগ ধরে রাখে। সিদ্ধান্তের পরের রাগ সামলায়। চাকরির সম্পর্ক শেষ হলে যে কষ্ট তৈরি হয়, তার খুব কাছে থাকে। অভিযোগ ওঠার পর যে ভয়, সন্দেহ আর অস্বস্তি জন্মায়, সেগুলোও তাদের ছুঁয়ে যায়। প্রতিষ্ঠান এগিয়ে যায়। মিটিং শেষ হয়। ফাইল বন্ধ হয়। কিন্তু এইচআর মানুষের মুখগুলো মনে রাখে।

এইচআর-এর অনেক কাজ আসলে আবেগ সামলানোর কাজ। একজন এইচআর পেশাজীবী হয়তো এমন একজন কর্মীর সামনে বসে আছেন, যার হাতে সদ্য টার্মিনেশন লেটার দেওয়া হয়েছে। মানুষটি প্রথমে কিছু বুঝতে পারে না। তারপর ধীরে ধীরে তার মুখ বদলে যায়। সে হয়তো বলে, “স্যার, এখন আমি কী করব?”

এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই।

আবার কখনও এইচআর-কে শুনতে হয় অসদাচরণ, হয়রানি, ভয় দেখানো, প্রতারণা বা অন্যায্য আচরণের অভিযোগ। একদিকে ম্যানেজার বলেন, দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে কর্মী বলেন, আমাকে কেউ শুনছে না। একজন সাক্ষী কথা বলতে ভয় পান। আরেকজন সত্য জানেন, কিন্তু নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবেন। এই সব মুহূর্তে এইচআর-এর কাছ থেকে আশা করা হয়, তিনি শান্ত থাকবেন। নিরপেক্ষ থাকবেন। স্থির থাকবেন। সম্মানজনক থাকবেন।

মানুষটি হয়তো ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠছেন। কিন্তু পেশাজীবীটি চুপচাপ নোট নিচ্ছেন।

এই স্থিরতাকে অনেকে ভুল বোঝে। ভাবে, এইচআর বোধহয় খুব শক্ত মানুষ। অনুভূতি নেই। আসলে ব্যাপারটি উল্টো। ভালো এইচআর হতে হলে অনুভূতি থাকতে হয়। মানুষের ভয় বুঝতে হয়। লজ্জা বুঝতে হয়। চুপ করে থাকা মানুষের নীরবতাও শুনতে হয়। একজন কর্মী কেন কথা বলতে পারছেন না, একজন সাক্ষী কেন চোখ নামিয়ে রাখছেন, একজন ম্যানেজার কেন এত তাড়া দিচ্ছেন, এসবের ভেতরের কথাও বুঝতে হয়।

তবু শুধু বুঝলেই চলে না। প্রক্রিয়াও মানতে হয়। সহানুভূতি থাকতে হয়, কিন্তু সিদ্ধান্তে তাড়াহুড়া করা যায় না। মন নরম হতে পারে, কিন্তু নথি পরিষ্কার হতে হয়। প্রশ্ন সাবধানে করতে হয়। ভাষা মেপে ব্যবহার করতে হয়। বিচার করতে হয় ঠান্ডা মাথায়।

এইচআর-এর নিরপেক্ষতা দরকার। বিশেষ করে অভিযোগ, তদন্ত, শৃঙ্খলা ও সংঘাতের সময়ে। কিন্তু নিরপেক্ষ থাকারও কষ্ট আছে। মানুষটি সান্ত্বনা দিতে চায়, পেশাজীবীটি থেমে যায়। মানুষটি কষ্ট দেখে, প্রক্রিয়া প্রমাণ চায়। মানুষটি ব্যথা বোঝে, কিন্তু তাকে জবাবদিহির কথাও বলতে হয়।

বাইরে থেকে এটি কঠোরতা মনে হতে পারে। ভেতর থেকে দেখলে বোঝা যায়, এটি কঠোরতা নয়। এটি দায়িত্বের এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা।

ব্যাংকিংয়ের মতো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে এই নিঃসঙ্গতা আরও গভীর। একটি শৃঙ্খলামূলক বিষয় শুধু একজন কর্মীর আচরণের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রত্যাশা, প্রতিষ্ঠানের সুনাম, গ্রাহকের আস্থা এবং একজন মানুষের ভবিষ্যৎ কর্মজীবন। একটি অভিযোগ শুধু দুই জন মানুষের দ্বন্দ্ব নয়। এর ভেতরে থাকতে পারে মানসিক নিরাপত্তা, নেতৃত্বের আচরণ, কর্মসংস্কৃতি এবং আইনি ঝুঁকি।

এইচআর-কে এই জটিল মানবিক ঘটনাগুলোকে প্রক্রিয়া, নথি, পরামর্শ ও সিদ্ধান্তের ভাষায় অনুবাদ করতে হয়। মানুষের কান্নাকে ফাইলে লেখা যায় না। তবু ফাইল তৈরি করতে হয়। মানুষের ভয়কে নোটশিটে ধরা যায় না। তবু নোটশিট লিখতে হয়।

এই পেশার সবচেয়ে অদৃশ্য বোঝা হলো গোপনীয়তা। এইচআর অনেক কিছু জানে, যা বলা যায় না। তারা জানে একটি তদন্ত চলছে। জানে একটি পুনর্গঠন আসছে। জানে একজন কর্মী ভয় পাচ্ছেন। জানে কেউ অন্যায়ের অভিযোগ করেছেন। জানে একটি সিদ্ধান্ত কারও জীবনে বড় আঘাত হয়ে আসতে পারে।

কিন্তু তারা চুপ থাকে।

এই চুপ থাকা দায়িত্বের অংশ। গোপনীয়তা মানুষকে রক্ষা করে। কিন্তু একই সঙ্গে এইচআর-কে একা করে দেয়। কঠিন মিটিং শেষ হয়। সবাই উঠে যায়। এইচআর নিজের ডেস্কে ফিরে আসে। তারপর আরেকটি ইমেইল, আরেকটি রিপোর্ট, আরেকটি কল, আরেকটি পরামর্শ। অফিসের চোখে সব স্বাভাবিক। কাজ চলছে।

কিন্তু ভেতরে কিছু জমতে থাকে।

একটি মুখ। একটি বাক্য। একটি দীর্ঘশ্বাস। একটি কাঁপা হাত। একটি প্রশ্ন, যার উত্তর দেওয়া যায়নি।

এই জমে থাকা জিনিসগুলো একদিন ক্লান্তি হয়ে ফিরে আসে। কখনও বিরক্তি হয়ে। কখনও আবেগশূন্যতা হয়ে। কখনও অতিরিক্ত সতর্কতা হয়ে। কখনও রাতে ঘুম না আসা হয়ে। কখনও মানুষের প্রতি নীরব অবিশ্বাস হয়ে। সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, এটি একসময় নৈরাশ্যে পরিণত হতে পারে।

আর নৈরাশ্য এইচআর-এর জন্য বিপজ্জনক। কারণ এই পেশা দাঁড়িয়ে আছে বিচারবোধ, ধৈর্য, ন্যায্যতা এবং নৈতিক সংবেদনশীলতার ওপর। ক্লান্ত এইচআর ধীরে ধীরে অতিরিক্ত প্রক্রিয়ামুখী হয়ে যেতে পারে। আত্মরক্ষামূলক হয়ে যেতে পারে। মানুষের কষ্ট থেকে দূরে সরে যেতে পারে। এতে কর্মীর উপকার হয় না। ব্যবস্থাপনারও হয় না। প্রতিষ্ঠানও শেষ পর্যন্ত কিছু হারায়।

এইচআর বার্নআউট তাই শুধু বেশি কাজের ক্লান্তি নয়। এটি বারবার মানুষের কষ্ট, রাগ, অভিযোগ, অন্যায্যতার অনুভূতি, অসদাচরণ, পদত্যাগ এবং নৈতিক টানাপোড়েনের কাছে থাকার ক্লান্তি। অনেকেই এই পেশায় আসেন কারণ তারা মানুষ নিয়ে ভাবেন। ন্যায্যতা নিয়ে ভাবেন। উন্নয়ন নিয়ে ভাবেন। ভালো কর্মসংস্কৃতি নিয়ে ভাবেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাদেরই অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে কঠিন, সবচেয়ে বেদনাদায়ক জায়গাগুলোতে দাঁড়াতে হয়।

মানবিকতা তাদের ভালো এইচআর পেশাজীবী বানায়। আবার সেই মানবিকতাই একদিন তাদের ক্লান্ত করে ফেলে।

তাই এইচআর দিবস শুধু কেক আর শুভেচ্ছার মধ্যে আটকে থাকা উচিত নয়। নেতাদের কিছু কঠিন প্রশ্ন করা দরকার। আমরা এইচআর-এর ওপর কতটা আবেগিক বোঝা চাপাচ্ছি? তারা কি অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলার ক্ষমতা পায়? কঠিন কেসের পর তারা কি কারও সঙ্গে কথা বলার জায়গা পায়? আমরা কি ধরে নিই, এইচআর সবার মানসিক নিরাপত্তা দেখবে, কিন্তু তাদের নিজের নিরাপত্তার দরকার নেই?

প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত গুরুতর তদন্ত, টার্মিনেশন, হয়রানির অভিযোগ, প্রতারণা, কর্মক্ষেত্রের ট্রমা ও পুনর্গঠনের পর এইচআর টিমের জন্য ডিব্রিফিংয়ের ব্যবস্থা করা। তাদের পিয়ার কনসালটেশন দরকার। সুপারভিশন দরকার। গোপনে ভাবার, বলার এবং নিজেকে সামলে নেওয়ার জায়গা দরকার। নেতাদের এইচআর-কে শুধু দায়িত্ব দিলে হবে না। প্রকৃত কর্তৃত্বও দিতে হবে।

একটি জটিল শৃঙ্খলামূলক কেসকে কখনও সাধারণ সার্ভিস রিকোয়েস্টের মতো মাপা যায় না। কারণ সেখানে শুধু সময় লাগে না। মানুষের ভেতরের শক্তিও লাগে।

এইচআর পেশাজীবীদেরও নিজেদের রক্ষা করতে হবে। সীমারেখা টানা নিষ্ঠুরতা নয়। বরং সুস্থ থাকার উপায়। আত্মসমীক্ষা, সহকর্মীর সহায়তা, ভালো নথিপত্র, কাউন্সেলিং, বিশ্রাম, পরিবারকে সময় দেওয়া, বিশ্বাস, পড়াশোনা এবং কিছু সময়ের জন্য সংঘাত থেকে দূরে থাকা কোনো বিলাসিতা নয়। এগুলো বিচারবোধ ও মানবিকতা বাঁচিয়ে রাখার উপায়।

এইচআর দিবসে প্রতিষ্ঠানগুলো এইচআর-কে ধন্যবাদ দিক। অবশ্যই দিক। কিন্তু শুধু ধন্যবাদ যথেষ্ট নয়।

এইচআর পেশাজীবীরাও মানুষ। তারা নিরপেক্ষ হয়েও সহানুভূতিশীল হতে পারেন। প্রক্রিয়াগত হয়েও মানবিক হতে পারেন। মুখে স্থির থেকেও ভেতরে আহত হতে পারেন।

তাদের কাজ শুধু ফাইল সরানো নয়। অনেক সময় তারা মানুষের ভেঙে পড়া মুহূর্ত, প্রতিষ্ঠানের কঠিন সিদ্ধান্ত এবং নীতিমালার ঠান্ডা ভাষার মাঝখানে চুপ করে বসে থাকেন।

সত্যিকারের সম্মান তখনই দেওয়া হবে, যখন প্রতিষ্ঠান বুঝবে, যারা সবার হয়ে সংঘাত, পরিবর্তন আর মানুষের জটিলতা বহন করে, তাদেরও কখনও কখনও কারও পাশে বসার দরকার হয়।

শুধু এইচআর হিসেবে নয়।

মানুষ হিসেবে।