ট্রোজান দল: মেধা যখন ছায়া সংস্কৃতি নিয়ে আসে
ব্যাংকিং জগতে একজন নামকরা নেতা যখন এক প্রতিষ্ঠান থেকে আরেক প্রতিষ্ঠানে আসেন, তখন বাজারে একটা ছোটখাটো আনন্দ মিছিল শুরু হয়ে যায়। সবাই বলেন, বড় অর্জন হয়েছে। নাম আছে, পদ আছে, ক্লায়েন্ট নেটওয়ার্ক আছে, আত্মবিশ্বাস আছে। অনেক সময় সেই নেতার সঙ্গে তাঁর পুরোনো প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু কর্মীও নতুন প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। বোর্ড ভাবে, এবার গতি আসবে। ব্যবসা বিভাগ ভাবে, এবার সংখ্যা বাড়বে। রিক্রুটাররা সুন্দর একটা নামও দিয়ে ফেলেন, “লিফট-আউট”। কাগজে-কলমে ব্যাপারটা খুব চমৎকার। মনে হয়, দীর্ঘ পথের একটা শর্টকাট পাওয়া গেল।
আমি যেহেতু বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার মানবসম্পদ বিভাগে কাজ করেছি, তাই এই আকর্ষণটা খুব ভালো করেই বুঝি। একটি দক্ষ দল তৈরি করতে বছর লেগে যায়। সেখানে যদি তৈরি দল পাওয়া যায়, তাহলে বিষয়টা দ্রুত, পরিপাটি এবং ব্যবসায়িকভাবে যুক্তিসঙ্গত মনে হয়। পরীক্ষিত একটি দল একসঙ্গে কাজ করতে জানে। তাদের নিজস্ব ছন্দ আছে। নিজেদের ভেতরে বিশ্বাস আছে। কিছু না বলেও বোঝার ক্ষমতা আছে। কখনো কখনো তাদের সঙ্গে ক্লায়েন্ট সম্পর্কও থাকে। প্রতিযোগিতামূলক ব্যাংকিং বাজারে এগুলো খুব লোভনীয় বিষয়।
কিন্তু HR এবং সাংগঠনিক সংস্কৃতির জায়গা থেকে আসল প্রশ্নটি অন্যখানে। দলটি মেধাবী কি না, সেটি বড় প্রশ্ন নয়। বড় প্রশ্ন হলো, তাদের আনুগত্য কোথায়?
একসঙ্গে আসা একটি দল খুব কম সময়ই আলাদা আলাদা কর্মী হিসেবে আসে। তারা আসে পুরোনো ইতিহাস নিয়ে। পুরোনো অভ্যাস নিয়ে। এবং অনেক সময় একজন মানুষের প্রতি পুরোনো আনুগত্য নিয়ে। বিপদটা সেখান থেকেই শুরু হয়। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অর্গানোগ্রাম আছে, নীতিমালা আছে, কমিটি আছে, রিপোর্টিং লাইন আছে, ঝুঁকি কাঠামো আছে, সংস্কৃতি আছে। কিন্তু নতুন আসা দলেরও আরেকটি অদৃশ্য অপারেটিং সিস্টেম থাকে। সেটি তৈরি হয় আগের সম্পর্ক দিয়ে। তখন একই ব্যাংকের ভেতর দুইটি সিস্টেম চলতে থাকে। একটি লেখা থাকে নীতিমালায়। আরেকটি লেখা থাকে স্মৃতিতে।
শুরুর দিকে বিপদটা চোখে পড়ে না। বরং প্রথম কয়েক সপ্তাহ খুব প্রাণবন্ত লাগে। সিদ্ধান্ত দ্রুত হয়। মিটিং শক্তিশালী মনে হয়। নতুন দলকে খুব একতাবদ্ধ মনে হয়। তারপর আস্তে আস্তে দেখা যায়, আনুষ্ঠানিক ক্ষমতার চেয়ে অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতা শক্তিশালী হয়ে উঠছে। মানুষ বুঝে যায়, আসল প্রবেশাধিকার কার আছে। কার মতামত বেশি গুরুত্ব পায়। সিদ্ধান্ত আসলে কোথায় তৈরি হচ্ছে। অনেক সময় অফিসিয়াল মিটিং শুধু সিদ্ধান্ত ঘোষণার জায়গা হয়ে যায়। সিদ্ধান্ত আগেই হয়ে গেছে, অন্য কোথাও।
একটি ব্যাংকের জন্য এটি শুধু সাংস্কৃতিক অস্বস্তি নয়। এটি সরাসরি গভর্ন্যান্স ঝুঁকি।
কর্মী সম্পর্ক, শৃঙ্খলাজনিত বিষয়, কমপ্লায়েন্স এবং HR অপারেশনে কাজ করতে গিয়ে একটি বিষয় আমি খুব পরিষ্কারভাবে শিখেছি। সংস্কৃতি কোনো নরম বিষয় নয়। সংস্কৃতিই ঠিক করে মানুষ কথা বলবে, নাকি চুপ থাকবে। সংস্কৃতিই ঠিক করে একজন ম্যানেজার প্রক্রিয়া অনুসরণ করবেন, নাকি পাশ কাটিয়ে যাবেন। সংস্কৃতিই ঠিক করে Risk, Compliance, Internal Audit এবং HR-কে সহযোগী ভাবা হবে, নাকি বাধা ভাবা হবে। সংস্কৃতিই ঠিক করে মানুষ প্রতিষ্ঠানকে ন্যায্য মনে করবে কি না।
যখন কোনো শক্তিশালী নতুন দলকে সুরক্ষিত মনে হয়, তখন পুরোনো কর্মীরা সাধারণত খুব চিৎকার করে প্রতিবাদ করেন না। তারা চুপচাপ সরে যান। আইডিয়া দেওয়া বন্ধ করেন। মালিকানাবোধ হারান। তারা মনে করতে শুরু করেন, মেধার চেয়ে কাছাকাছি থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। কেউ CV আপডেট করেন। কেউ অফিসে থাকেন, কিন্তু মনের দিক থেকে পদত্যাগ করে ফেলেন। প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি সবচেয়ে ব্যয়বহুল ক্ষতির একটি। কারণ এই ক্ষতি ব্যালান্স শিটে সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় না।
আরেকটি ঝুঁকি আছে, যা বোর্ড অনেক সময় কম গুরুত্ব দিয়ে দেখে। সেটি হলো concentration risk। যে দল একসঙ্গে আসে, তারা একসঙ্গেই চলে যেতেও পারে। যে আনুগত্য তাদের আসার সময় উৎপাদনশীল করে তোলে, সেই একই আনুগত্য প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে দিতে পারে। নেতা আবার চলে গেলে, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হলে, অথবা কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান ডাক দিলে, ব্যাংক শুধু কয়েকজন মানুষ হারায় না। হারায় একটি অদৃশ্য ইকোসিস্টেম। ক্লায়েন্ট সম্পর্ক, প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান এবং অপারেশনাল ধারাবাহিকতা সবকিছুই তখন প্রভাবিত হতে পারে।
আরও সূক্ষ্ম বিপদ দেখা দেয় যখন সংস্কৃতি আচরণের জায়গায় হাত দেয়। ব্যাংকিং একটি নিয়ন্ত্রিত শিল্প। এখানে প্রতিটি শর্টকাটের একদিন না একদিন মূল্য দিতে হয়। নতুন দল যদি দ্রুত নিজেদের মূল্য প্রমাণ করার চাপে থাকে, আর যদি স্কোরকার্ড শুধু বৃদ্ধি, ভলিউম, ডিপোজিট বা পোর্টফোলিও সাইজ দেখে, তাহলে সংস্কৃতি ধীরে ধীরে পারফরম্যান্স থেকে চাপের দিকে সরে যায়। Relationship Manager অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন। Middle Manager প্রয়োজনের চেয়ে বেশি চাপ দিতে পারেন। Compliance-এর প্রশ্নকে বিলম্ব হিসেবে দেখা হতে পারে। ডকুমেন্টেশন পরে করার বিষয় হয়ে যেতে পারে। এভাবেই একটি সাংস্কৃতিক সমস্যা নিয়ন্ত্রণ সমস্যায় পরিণত হয়।
এই কারণেই HR এ ধরনের নিয়োগকে সাধারণ recruitment হিসেবে দেখতে পারে না। এটি বরং প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ছোট একটি merger-এর মতো। আর যে কোনো merger-এর মতো, এখানে শুধু appointment letter দিলেই হয় না। integration লাগে।
প্রথম কাজ হলো কর্তৃত্বের স্বচ্ছতা। প্রথম ৩০ দিনের মধ্যেই ব্যাংককে স্পষ্ট করে দিতে হবে, কর্তৃত্ব আসবে বোর্ড অনুমোদিত পদ, নীতিমালা, কমিটি এবং রিপোর্টিং লাইন থেকে। পুরোনো সম্পর্ক থেকে নয়। ব্যক্তিগত আনুগত্য থেকে নয়। কে কার সঙ্গে এসেছে, সেখান থেকেও নয়। কাউকে খুশি রাখতে গিয়ে title change, reporting line shift বা informally power adjustment ভেসে যেতে দেওয়া যাবে না।
দ্বিতীয় কাজ হলো onboarding। মজার বিষয় হলো, সিনিয়র মানুষরা অনেক সময় সবচেয়ে দুর্বল onboarding পান। কারণ প্রতিষ্ঠান ধরে নেয়, তারা সব জানেন। এটি ভুল ধারণা। অভিজ্ঞতা থাকলেই সাংস্কৃতিক একীভবন হয়ে যায় না। প্রথম ৯০ দিন খুব গুরুত্বপূর্ণ। নতুন নেতাদের ব্যাংকের risk culture, customer standard, compliance expectation, escalation channel এবং decision-making discipline বুঝতে হবে। একই সঙ্গে তাদের existing team, branch, control function এবং long-serving employee-দের সঙ্গে structured exposure দিতে হবে। না হলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই তাদের সঙ্গেই মিশবে, যাদের তারা আগে থেকেই চেনে।
তৃতীয় কাজ হলো বর্তমান কর্মীদের জন্য ন্যায্যতা নিশ্চিত করা। প্রতিষ্ঠানকে দৃশ্যমানভাবে merit, transparency এবং opportunity রক্ষা করতে হবে। পুরোনো কর্মীরা যেন মনে না করেন, তাদের ভবিষ্যৎ নীরবে অন্য কারও নামে বরাদ্দ হয়ে গেছে। Promotion, reward, project leadership এবং succession decision ব্যাখ্যা করার মতো হতে হবে। শুধু আইনগতভাবে নয়, মনস্তাত্ত্বিকভাবেও। মানুষ সব নীতিমালা পড়ে না। কিন্তু তারা প্রতিটি signal পড়ে।
চতুর্থ কাজ হলো performance design। ব্যাংক যদি শুধু সংখ্যা পুরস্কৃত করে, মানুষ সংখ্যা তাড়া করবে। ব্যাংক যদি সংখ্যা, শৃঙ্খলা, গ্রাহক ফলাফল, collaboration এবং control quality একসঙ্গে পুরস্কৃত করে, মানুষ ভিন্নভাবে আচরণ করবে। ব্যাংকিংয়ে target অর্জন করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, target কীভাবে অর্জন করা হলো সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভালো scorecard শুধু জিজ্ঞেস করবে না, “কত ব্যবসা আনলেন?” সেটি আরও জিজ্ঞেস করবে, “এই ব্যবসা আনতে সংস্কৃতি, গ্রাহক এবং control environment-এর কী মূল্য দিতে হলো?”
শেষ বিষয়টি সবচেয়ে সংবেদনশীল। যিনি দল নিয়ে এসেছেন, সেই নেতাকে সর্বোচ্চ মানদণ্ডে ধরে রাখতে হবে। তিনি যেন একটি camp-এর রক্ষক না হয়ে যান। তাঁকে হতে হবে institution-first আচরণের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিনিধি। কথায় নয়, কাজে বার্তাটি পরিষ্কার হতে হবে। পুরোনো আনুগত্যকে সম্মান করা যায়। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব সবকিছুর আগে।
মেধা অবশ্যই স্বাগত। অভিজ্ঞতা মূল্যবান। বাইরের network একটি ব্যাংককে শক্তিশালী করতে পারে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানই তৈরি দলকে তৈরি faction হয়ে উঠতে দিতে পারে না।
একটি ব্যাংক বাইরে থেকে মানুষ নিতে পারে। দক্ষতা আনতে পারে। এমনকি নতুন শক্তিও আনতে পারে। কিন্তু নিজের সংস্কৃতি কখনো outsource করতে পারে না।
নীতিটি সহজ। পালন করা কঠিন।
প্রতিষ্ঠান আগে। নেতা পরে। দল তারও পরে।
