কল্পনা করুন তো। মাসের ২৮ তারিখ। আপনি কাগজের স্তূপে ডুবে আছেন, আপনার ফোন অনবরত বেজেই চলেছে, আর আপনার ম্যানেজার ঠিক আপনার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলেন, "টার্গেট পূরণ হয়েছে?"

বাংলাদেশের হাজার হাজার ব্যাংকারের জন্য এটা কোনো কল্পনা নয়। এটা একটা রোজকার দুঃস্বপ্ন। যে সিস্টেমটা তৈরি হয়েছিল কাজের পরিমাপ করার জন্য, সেই KPI এখন একটা অত্যাচারের যন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা এমন একটা কর্মী বাহিনী তৈরি করছে যারা ক্লান্ত, অসুস্থ এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।

সম্প্রতি বাংলাদেশি ব্যাংকারদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষক রানা আল মোশাররাফা এবং তার সহকর্মীদের করা ২০২৪ সালের একটি গবেষণাপত্রে এই সংকটের ভয়াবহ একটা চিত্র উঠে এসেছে। সেই গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাংকারদের মধ্যে ৯৩.৪৫% 'বার্নআউট' বা চরম মানসিক অবসাদে ভুগছেন, ৭৪.৫৬% ভুগছেন উদ্বেগ বা অ্যাংজাইটিতে এবং ৬৭.৫% এর মধ্যে বিষণ্ণতার লক্ষণ দেখা দিয়েছে। ভয়াবহ ব্যাপার, তাই না?

এটা কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। এটা সিস্টেমের সমস্যা। "ডিপোজিট কালেকশন" আর "লোন রিকভারি"র পেছনে এই যে অন্ধের মতো ছোটা, এই একমুখী টার্গেট সিস্টেমটা পুরো ইন্ডাস্ট্রির গ্রাহক এবং এর কর্মীদের সবার জন্যই ব্যার্থতা।

কেপিআই জিনিসটা প্রথমে বেশ যৌক্তিক মনে হয়। আপনি যা ভালো করতে চান, তা পরিমাপ করবেন। কিন্তু কী হয় যখন সেই পরিমাপটাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়? "গুডহার্টের আইন" নামে একটা বিখ্যাত কথা আছে। সহজ কথায়, "যখন কোনো পরিমাপ 'টার্গেটে' পরিণত হয়, তখন সেটা আর ভালো পরিমাপ থাকে না।"

ব্যাপারটা এভাবে ভাবুন। একজন ডাক্তারের আসল লক্ষ্য হলো "রোগীর সুস্বাস্থ্য"। এর একটা পরিমাপ হতে পারে "তিনি মাসে কয়টা প্রেসক্রিপশন লিখলেন"। কিন্তু যদি হঠাৎ করে আপনি সেই ডাক্তারকে বলেন যে, "মাসে ৫০টা প্রেসক্রিপশন লেখাই আপনার প্রধান টার্গেট, এর ওপরই আপনার সব নির্ভর করছে", তখন কী হবে? তিনি তখন এমন রোগীকেই ওষুধ দেবেন যার হয়তো কোনো দরকারই নেই। আসল লক্ষ্য (রোগীর স্বাস্থ্য) তখন বলি হয়ে যায় টার্গেটের (প্রেসক্রিপশন) কাছে।

আমেরিকায় ওয়েলস ফার্গো ব্যাংকের কুখ্যাত কেলেঙ্কারিতে ঠিক এই ঘটনাটিই ঘটেছিল। ব্যাংকের লক্ষ্য ছিল সুস্থ ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি। আর তাদের টার্গেট হয়ে দাঁড়ালো প্রতিটি গ্রাহকের নামে অনেকগুলো করে "নতুন অ্যাকাউন্ট" খোলা। প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়ে কর্মীরা গ্রাহকদের অগোচরে ৩৫ লক্ষ ভুয়া ব্যাংক ও ক্রেডিট কার্ড অ্যাকাউন্ট খুলে ফেললো। তারা কিন্তু খারাপ লোক ছিলেন না। তারা ছিলেন আপনার-আমার মতোই সাধারণ মানুষ, যারা একটা বিষাক্ত সিস্টেমের ফাঁদে আটকা পড়েছিলেন।

এইটা শুধু আমেরিকার সমস্যা না। ২০২৪ সালের এই পরিসংখ্যানটা বাংলাদেশের জন্য একটা লাল সংকেত। এই সংকট বহুদিনের। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) এর এক গবেষণায় দেখা যায়, ৯৯ শতাংশ ব্যাংকারই কোনো না কোনো মানসিক চাপে আছেন যা তাদের কাজে প্রভাব ফেলছে। সিস্টেমটা আক্ষরিক অর্থেই তার নিজের লোকদের পুড়িয়ে ফেলছে শুধু কিছু স্বল্পমেয়াদী সংখ্যা ছোঁয়ার জন্য।

সংকটটা এতই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে ২০২২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংককে বাধ্য হয়ে হস্তক্ষেপ করতে হলো। তারা একটা সার্কুলার জারি করে ব্যাংকগুলোকে বললো যে, শুধু ডিপোজিট টার্গেট পূরণ করতে না পারার কারণে কোনো কর্মীকে ছাঁটাই করা বা প্রমোশন আটকে রাখা যাবে না। এটা একটা ভালো পদক্ষেপ, কিন্তু এটা হলো কাটা ঘায়ে মলম লাগানোর মতো।

এতে টার্গেট তো বাতিল হয়নি। চাপও কমেনি। যে কোনো ব্যাংকারকে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন। এটা ম্যানেজারদের বাধ্য করেছে টার্গেট পূরণে ব্যর্থ কর্মীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য অন্য কোনো পরোক্ষ রাস্তা খুঁজে বের করতে। ৯৩% বার্নআউট রেটই প্রমাণ করে যে চাপটা এখনো ঠিকই আছে।

এই প্রচণ্ড চাপ কর্মীদের প্রতিদিন একটা নৈতিক দুঃস্বপ্নের মধ্যে ঠেলে দেয়। যখন আপনার চাকরি নির্ভর করে লোন টার্গেট পূরণের ওপর, তখন আপনি "ফোর্স-সেলিং" বা "মিস-সেলিং" করতে বাধ্য হন। আপনি হয়তো এমন একটা মানুষ কে একটা বেশি ফী-ওয়ালা কার্ড ছিয়ে দিচ্ছেন যেটা তাদের কোনো কাজেই আসবে না, অথবা এমন একটা ছোট ব্যবসাকে লোন নিতে বাধ্য করছেন যা শোধ করার ক্ষমতা তার নেই। গ্রাহকের প্রতি আপনার দায়িত্ব আর ব্যাংকের দেওয়া টার্গেটের মধ্যে একটা ভয়ঙ্কর দ্বন্দ্বে আটকে পড়েন আপনি।

এই প্রতারণার সংস্কৃতি কিন্তু শুধু নিচুতলাতেই থেমে থাকে না, এটা একেবারে ওপর পর্যন্ত যায়। যে চাপ একজন কর্মীকে ভুল লোন বিক্রি করতে বাধ্য করে, সেই একই চাপ ব্যাংকের বড় কর্তাদেরকেও আর্থিক হিসাবে "উইন্ডো ড্রেসিং" বা কারচুপি করতে বাধ্য করে। তারাও রেগুলেটরদের কাছে ঝুঁকি আড়াল করে নিজেদের কেপিআই ঠিক রাখেন।

আমাদের পাশের দেশ ভারতে, বিভিন্ন গণমাধ্যমের রিপোর্ট আর ব্যাংক ইউনিয়নগুলোর বিবৃতি অনুযায়ী, এই একই চাপের ফলে এমন সব মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে যা ভাবা যায় না। সেখানকার ব্যাংক ইউনিয়নগুলো অফিসারদের মধ্যে "আত্মহত্যার হিড়িকের" কথা বলেছে। সেই কর্মীরা সুইসাইড নোটে "কাজের চাপ" এবং টার্গেটের জন্য "ওপরওয়ালাদের হয়রানির" কথা লিখে গেছেন। এই গল্পগুলো অন্য কোনো দেশের গল্প নয়। একটা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, ক্লান্ত আর বিষণ্ণ কর্মীবাহিনীকে যখন সহ্যের শেষ সীমার বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়, তখন কী ঘটতে পারে এটা তারই একটা সরাসরি সতর্কবার্তা।

তাহলে কি কোনো উপায় নেই? আমরা কি এই ভাঙা সিস্টেমেই আটকে থাকবো?

না। ম্যানেজারদের শুধু "আরেকটু ভালো হোন" বললেই এই সমস্যার সমাধান হবে না। আমাদের পুরো সিস্টেমটাকেই সারাতে হবে। সমাধানটা পরিমাপ বন্ধ করা নয়। সমাধান হলো, যা আসলেই গুরুত্বপূর্ণ, তা পরিমাপ করা শুরু করা।

এর সবচেয়ে পরীক্ষিত বিকল্পটির নাম হলো "ব্যালেন্সড স্কোরকার্ড" (Balanced Scorecard)। এটা একটা মাত্র বিষাক্ত টার্গেটের বদলে চারটা সমান গুরুত্বপূর্ণ দিক পরিমাপ করে। এটা অবশ্যই ব্যাংকের লাভ-লোকসানের প্রথাগত আর্থিক হিসাবটা দেখে, কিন্তু সেটার সাথে ভারসাম্য রাখে গ্রাহকদের সন্তুষ্টি আর অভিযোগের পরিমাপ করে, এটা দেখার জন্য যে গ্রাহকদের সাথে ভালো ব্যবহার করা হচ্ছে কি না। এর সাথে এটা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বা অডিটের মতো অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াগুলোও দেখে, এটা নিশ্চিত করতে যে ব্যাংক নিয়ম মেনে চলছে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এতে "শিক্ষা ও প্রবৃদ্ধি" নামে একটা অংশ থাকে, যা কর্মীদের মানসিক অবসাদ, তাদের ট্রেনিং এবং চাকরি ছাড়ার হার পরিমাপ করে দেখে যে ব্যাংকের মানুষগুলো সুস্থ ও ভালো আছে কি না।

এটাই গুডহার্টের আইনের আসল জবাব। এই সিস্টেমে, যে ম্যানেজার গ্রাহককে হয়রানি করে আর কর্মীদের পুড়িয়ে মেরে নিজের ফিনান্সিয়াল টার্গেট পূরণ করেন, তিনি আর "স্টার পারফর্মার" নন। তিনি আসলে চারটা বিষয়ের মধ্যে তিনটাতেই ব্যর্থ। এই ব্যালেন্সড স্কোরকার্ড তার তথসাকথিত "সাফল্য"-কে একটা ফাঁপা, ধ্বংসাত্মক ব্যর্থতা হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টর এখন একটা মোড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এটা চাইলে এই অবসাদ আর ধ্বংসের পথেই চলতে পারে, অথবা একটা সুস্থ, মানবিক এবং শেষ পর্যন্ত লাভজনক একটা ভবিষ্যৎ বেছে নিতে পারে। এর জন্য একটা সত্যিকারের পরিবর্তন দরকার। ব্যাংকের শীর্ষ কর্তাদের প্রকাশ্যে এই "ব্যালেন্সড স্কোরকার্ড" গ্রহণ করা উচিত এবং "উচ্চ পারফরম্যান্স"-এর সংজ্ঞা বদলে তাতে কর্মী ও গ্রাহকের সুস্থতাকে যোগ করতে অতি জরুরি । এইচআর বিভাগকে অবশ্যই কর্মীদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের পদ্ধতি ঢেলে সাজাতে হবে; ডিপোজিটের হিসাবের মতোই সমান গুরুত্ব দিয়ে "মানসিক নিরাপত্তা" এবং "বার্নআউট রেট" পরিমাপ করতে হবে। আর রেগুলেটরদেরও আরেকটু আগাতে হবে। ২০২২ সালের সার্কুলারটি ছিল শুরু। এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত বাধ্যতামূলক করা যে, সব পারফরম্যান্স সিস্টেমে শুধু বিক্রির টার্গেট নয়, ঝুঁকি ও নিয়ম মেনে চলা, কর্মীর মানুষিক স্বাস্থ এই বিষয় গুলোও performance appraisal এ উঠে আশা উচিত । বাংলাদেশি ব্যাংকারদের পিঠের ওপর যে অদৃশ্য টার্গেটের বোঝাটা চেপে আছে, সেটা সত্যি। এই বোঝাটা নামানোর সময় এখন এসেছে।