আমাদের দেশে মানসিক সমস্যা নিয়ে তেমন একটা কথাবার্তা হয় না। ওসব নিয়ে কথা বলা বারণ, লোকে কী বলবে! তাই আমরা খুব যত্ন করে ব্যাপারগুলো ঘরের চারদেয়ালে লুকিয়ে রাখি। শরীরের অসুখ হলে আমরা ডাক্তার দেখাই, সহানুভূতি পাই। কিন্তু মনের অসুখ? ওটা বিলাসিতা, ওসব নিয়ে কথা বলতে নেই। আমরা ভাবি, চেপে রাখলেই বুঝি সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু দিন বদলেছে। চাইলেও এখন আর লুকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। ভেতরের ক্ষতটা এতটাই গভীর হয়েছে যে তা আর পোশাকি হাসিতে ঢাকা পড়ছে না। সাম্প্রতিক কিছু জরিপের ফলাফল আমাদের চমকে দিয়েছে। আমরা জানলাম, সমস্যাটা এখন আর শুধু ঘরের কোণে আটকে নেই, এটি আমাদের ঝকঝকে আধুনিক অর্থনীতির হৃদপিণ্ডে ঢুকে পড়েছে। সোজা কথায়, যে অফিস আপনাকে রুটি-রুজি দিচ্ছে, সেই অফিসই হয়তো আপনার বড় অসুখের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা শুধু যে এক কঠিন অর্থনৈতিক সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি তা নয়, আমরা এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি।

খাদের ঠিক কতটা কিনারে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, তার পরিসংখ্যানগুলো বেশ ভয়ের। কিছু কিছু জায়গায় মানসিক যন্ত্রণাই এখন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই যেমন ব্যাংকিং খাতের কথাই ধরুন। বাইরে থেকে কী পরিপাটি, ঠান্ডা এসি রুম, ঝকঝকে পরিবেশ। অথচ ভেতরের খবর অন্য। শতকরা প্রায় ৯৩ জন ব্যাংক কর্মী 'বার্নআউট' বা চরম মানসিক ক্লান্তিতে ভুগছেন। ভাবা যায়? প্রায় অর্ধেক কর্মী আছেন ভয়াবহ অবস্থায়। হাসিমুখের আড়ালে তারা এক একজন বিধ্বস্ত মানুষ।

কিংবা আমাদের ডাক্তার-নার্সদের কথা ভাবুন। যারা আমাদের সারিয়ে তুলবেন, সেই মানুষগুলোর নিজেদের অবস্থাই করুণ। বড় বড় হাসপাতালের প্রায় অর্ধেকের বেশি চিকিৎসক ও নার্স চরম দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন। যে সিস্টেমে তারা কাজ করেন, সেটাই তাদের পিষে ফেলছে প্রতিনিয়ত। আর আমাদের তরুণরা? যারা এখনো চাকরিতে ঢুকেইনি, ইঁদুর দৌড়ে নামার আগেই তাদের অর্ধেকই নাকি চরম হতাশা আর উৎকণ্ঠায় ভুগছে।

কেন এই অবস্থা? আমাদের সহ্যক্ষমতা কি কমে গেছে? ব্যাপারটা তা নয়। আসল সমস্যা হলো, আমাদের অনেক প্রতিষ্ঠানের কাঠামোই এমনভাবে তৈরি যে সেখানে সুস্থ থাকা কঠিন। আমরা কিছু সেকেলে ধারণাকে আঁকড়ে ধরে আছি, যা আমাদের ভেতর থেকে শেষ করে দিচ্ছে।

প্রথমত, আমাদের ধারণা হলো অফিসে বেশিক্ষণ থাকা মানেই বেশি কাজ। বস যতক্ষণ আছেন, আপনাকেও থাকতে হবে। কাজ হোক না হোক, চেয়ারে বসে থাকতে হবে। সময়মতো বাসায় ফেরাটাকে এখানে দেখা হয় অপরাধ হিসেবে, যেন আপনি যথেষ্ট অনুগত নন। অহেতুক বেশি সময় অফিসে বসে থাকাকে আমরা বানিয়েছি আনুগত্যের মাপকাঠি।

দ্বিতীয়ত, আমাদের সেই পুরোনো 'বস ইজ অলওয়েজ রাইট' সংস্কৃতি। আমাদের ম্যানেজমেন্ট স্টাইল অনেকটা জমিদারদের মতো। বস যা বলবেন, তাই হবে; এখানে দ্বিমত পোষণের সুযোগ নেই। কর্মীদের মতামতের কোনো দাম নেই। যখন কাজের চাপ আকাশছোঁয়া কিন্তু পরিস্থিতি বদলানোর কোনো ক্ষমতা আপনার হাতে নেই, তখন মানুষ অসুস্থ হবে, এটাই তো স্বাভাবিক।

এই যে আমরা মানুষের মনকে পাত্তা দিচ্ছি না, এর একটা চড়া দাম কিন্তু আমাদের দিতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের একটা রিপোর্টে দেখা গেছে, শুধু গরম আর এই মানসিক অসুস্থতার কারণে বছরে প্রায় ২৫ কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। টাকার অঙ্কে ক্ষতিটা প্রায় ১.৭৮ বিলিয়ন ডলার। শুধু কর্মী অনুপস্থিত থাকছে বলে নয়, বরং অসুস্থ শরীর আর ক্লান্ত মন নিয়ে জোর করে অফিসে বসে থাকছে বলেই এই ক্ষতি। তারা সশরীরে অফিসে আছে, কিন্তু তাদের মনটা কাজ করছে না।

এখন অনেক কোম্পানি 'ওয়েলনেস প্রোগ্রাম' চালু করেছে। বছরে একদিন হয়তো ঘটা করে কোনো কাউন্সেলিং সেশন হলো, কিছু ভালো ভালো কথা হলো। এতে আসলে তেমন লাভ হয় না। ক্যানসার রোগীকে প্যারাসিটামল দিয়ে তো আর সারিয়ে তোলা যায় না। সমস্যার গোড়ায় হাত না দিয়ে ওপর দিয়ে মলম লাগালে রোগ সারে না।

যারা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে আছেন, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর সময় এসেছে। অহেতুক অফিসে বসে থাকাকে উৎসাহ দেবেন না। কে কতক্ষণ চেয়ারে ছিল সেটা বড় কথা নয়, দিনশেষে কে কতটুকু কাজ করলো সেটাই আসল। আর হ্যাঁ, শুধু 'বস' না হয়ে 'লিডার' হতে শিখুন। ম্যানেজারের কাজ শুধু হুকুম দেওয়া নয়, দলের মানুষের পাশে দাঁড়ানো। বসগিরি ফলানো খুব সহজ, নেতা হওয়া কঠিন।

আমাদের কর্মক্ষেত্রের এই রুগ্ন দশা একদিনে তৈরি হয়নি, রাতারাতি ঠিকও হবে না। তবে বদলানোর সাহসটা এখনই দেখাতে হবে। অনেক দেরি হয়ে গেছে, আর দেরি করার মতো বিলাসিতার সুযোগ আমাদের নেই।