মাহবুব জামান আশরাফী
এক
২৯ জুন ১৭৮৮। বার্মিংহাম, ইংল্যান্ড।
সকাল থেকেই বার্মিংহাম শহরে সাজ সাজ রব। চার্চের ঘণ্টা বাজছে বিরামহীন। ঢং... ঢং... ঢং...।
আজ এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্নের অবসান হতে চলেছে, যা প্রায় তিন বছর ধরে শহরের বুকে চেপে বসেছিল। এই জনপদের মানুষ আজ একই সঙ্গে এক মিশ্র অনুভূতির শিকার চোখেমুখে স্পষ্ট আতঙ্ক আর তীব্র উত্তেজনা। গত তিনটি বছর ধরে এই জনপদ এক অদৃশ্য, শ্বাসরুদ্ধকর ত্রাসের রাজত্বে পরিণত হয়েছিল। প্রতিটি দিন কাটত এক অজানা আশঙ্কায়, প্রতিটি রাত নামত গাঢ় ভয়ের চাদর মুড়ি দিয়ে। শহরের প্রতিটি অলিগলি, প্রতিটি বাড়ি যেন এই ত্রাসের নীরব সাক্ষী।
তবে অবশেষে সেই অন্ধকার কাটতে চলেছে। শহরের বুকে ত্রাস চালানো সেই ভয়ংকর ডাইনিকে ধরা সম্ভব হয়েছে। এই সংবাদে যেমন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে মানুষ, তেমনি ডাইনির ক্ষমতা ও পরিণতি নিয়ে তাদের মনে চলছে নানা জল্পনা। পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল যে স্থানীয় কোনো ব্যবস্থা বা সাধারণ প্রচেষ্টা যথেষ্ট ছিল না। ডাইনি নিধন এবং তার অশুভ প্রভাব সম্পূর্ণরূপে দূর করার জন্য খোদ চীনদেশ থেকে অত্যন্ত প্রাজ্ঞ ও ক্ষমতাধর তান্ত্রিকদের আনতে হয়েছিল। এই তান্ত্রিকরা দীর্ঘ প্রচেষ্টা ও কঠোর সাধনার পর অবশেষে ডাইনিকে কাবু করতে সক্ষম হয়েছেন। আজ সেই ডাইনির বিচার বা তার চূড়ান্ত পরিণতি দেখার জন্য পুরো শহর উদগ্রীব। এই দিনটি হয়তো শহরের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করবে ত্রাসের সমাপ্তি এবং শান্তির প্রত্যাবর্তন।
গত তিন বছরে শহরের অগণিত গবাদি পশু মারা পড়েছে। এর কারণ ছিল এক রহস্যময় অসুস্থতা, যা কোনোভাবেই ধরা দিচ্ছিল না চিকিৎসকদের কাছে। শত শত ফার্ম হাউসের মালিকেরা সর্বস্বান্ত হচ্ছিল এই অচেনা মারণরোগের কবলে পড়ে। তাদের হাজার রকম নিরাপত্তার ব্যবস্থা, উন্নতমানের ওষুধ আর বিশেষজ্ঞ ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শও কোনো কাজে আসছিল না। মৃত পশুগুলোর দেহ প্রায়শই পাওয়া যেত ফার্ম হাউসগুলোর খুব কাছাকাছি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে একেবারে উঠোনেই। দেখে মনে হতো যেন গভীর রাতে কোনো শিকারি এসে গলা টিপে মেরে গেছে তাদের। কিন্তু এই পশুহত্যার সঙ্গে সরাসরি কোনো মানুষের ক্ষতির কথা অবশ্য শোনা যায়নি, যা শহরবাসীর মনে এক মিশ্র স্বস্তির পাশাপাশি গভীর আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল।
তবে, গভীর জঙ্গল থেকে মাঝরাতে ভেসে আসা সেই নারকীয় চিৎকার শহরের মানুষকে স্থির থাকতে দিত না। অনেকেই বিশ্বাস করত, এটা এক ডাইনির চিৎকার। সেই তীক্ষ্ণ, ভীতিপ্রদ শব্দে বনের ঝিঁঝিঁ পোকারাও যেন নিশ্চুপ হয়ে যেত, প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে এক অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা নেমে আসত চারদিকে। সেই চিৎকার যেন শহরবাসীর হাড় হিম করে দিত, মনে করিয়ে দিত এক অমঙ্গলের উপস্থিতির কথা।
মাঝে মাঝেই লোকালয়ে দেখা দিত সেই ডাইনি। তার উপস্থিতি ছিল এক ভয়ানক বিভ্রমের মতো। দূর থেকে দেখলে মনে হতো সে যেন এক অপ্সরী, অপূর্ব সুন্দর মুখশ্রী, যেন কোনো শিল্পীর হাতে নিখুঁতভাবে গড়া। কিন্তু তার চোখের মনিতে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ঙ্কর শূন্যতা। নির্জীব, প্রাণহীন সেই চোখ, যা পৃথিবীর কোনো আবেগ বহন করত না। ডাইনিটি যখন পথচারীদের দিকে তাকিয়ে থাকত, তাদের আত্মা যেন শুকিয়ে যেত ভয়ে। সেই অপার্থিব দৃষ্টির সামনে দাঁড়ানোর সাহস কারও ছিল না। ফলে পারতপক্ষে সন্ধ্যার পর শহরের লোকজন ঘর থেকে বেরই হতো না বলা চলে। শহরটা যেন সন্ধ্যার পর থেকেই এক অঘোষিত কারফিউ-এর অন্ধকারে ডুবে যেত।
আর তাই, সেই ভীতিকর ডাইনিকে আজ পুড়িয়ে মারার দৃশ্য দেখতে গোটা শহর ভেঙে লোক এসেছে। টাউন হলের সামনে যেন জনসমুদ্র। সবার চোখে মুখে আজ স্বস্তির এক গাঢ় রেখা। এই আতঙ্ক আর বিভীষিকার সমাপ্তি দেখতে পেরে তাদের মুখে হাসি ফুটেছে। ডাইনিটাকে দেখাচ্ছে বিধ্বস্ত, যেন দীর্ঘদিনের অভিশাপের ভারে সে ক্লান্ত। তার রুক্ষ চুলগুলো চলে এসেছে মুখের উপরে, হাতদুটো শক্ত করে পেছনে বাঁধা। ঠোঁটের কোণে কেটে গিয়ে কালচে রক্ত জমাট বেঁধে আছে, যা তার শেষ যন্ত্রণার চিহ্ন বহন করছে।
দুপুর ঠিক বারোটা এক মিনিটে, জনসমক্ষে, টাউন হলের সামনে বিশাল এক কাঠের স্তূপে পুড়িয়ে মারা হলো তাকে। আগুনের শিখা যখন আকাশে উঠছিল, তখন জনতা উল্লাসে ফেটে পড়েছিল।
সেই রাতে শহরের পানশালাগুলোতে চলল বিনে পয়সায় পান। প্রতিটি মানুষ যেন তাদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ভয় আর উদ্বেগকে মদের গেলাসে ডুবিয়ে দিতে চাইল। এমনকি পাগলাটে বুড়ো উইলবারের উদ্ভট নাচ আর চিৎকার-চেঁচামেচিও শহরবাসীর মনে বিরক্তি জাগাল না। বরং সবাই যেন তার পাগলামিকে উপভোগ করছিল। ডাইনি মরেছে, এখন আনন্দ করাই যায়! এই মুক্তি যেন এক জাতীয় উৎসবের চেহারা নিয়েছিল।
ডাইনিটার আসল নাম কী ছিল, তা কিন্তু কেউ জানতে পারেনি, আসলে জানতে কেউ চায়ওনি। তাদের কাছে সে ছিল কেবলই এক অশুভ প্রতীক, এক ডাইনি, যার নাম জানার কোনো প্রয়োজন ছিল না।
যে আমলের কথা বলা হচ্ছে, তখন গোটা ইউরোপ জুড়েই চলছিল ডাইনি নিধন নামক এক অসুস্থ খেলার স্বর্ণযুগ। সামান্য সন্দেহ, কুসংস্কার অথবা ব্যক্তিগত বিদ্বেষের শিকার হয়ে হাজার হাজার নারীকে জ্বলন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারা হতো। এরকম বিভ্রান্তকর এক সময়ে, যখন সাধারণ বিচারবুদ্ধি লোপ পেয়েছিল, ঠিক সেই সময়ে বাবা-মায়ের একমাত্র আদরের কন্যা সুশান রাইটকেও জ্বলন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারা হলো। কিন্তু তার সেই শেষ আর্তচিৎকার শোনা যায়নি। হয়তো জনতা উৎসবের কোলাহলে বা পানশালার হুল্লোড়ে তা চাপা পড়ে গিয়েছিল। শুধু তার পুড়ে যাওয়া শরীরের ছাইগুলো মিশে গিয়েছিল বার্মিংহামের পথে প্রান্তরে, বাতাসের সঙ্গে উড়ে গিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল শহরের অলিগলিতে।
সেই ছাইগুলো হয়তো কাউকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। হয়তো প্রতিশোধের আগুন অথবা নিছকই এক আশ্রয়। সেই ছাইয়ের কণাগুলো যেন অতীতের এক করুণ ইতিহাস বহন করে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
দুই
২ জুন ১৮২৩। বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এইচএমএস ফ্যালমাউথ’।
এক দল বণিক ইউরোপ থেকে ভারতবর্ষের পথে রওনা হয়েছেন। তাদের মাঝে একজন সোয়ান হেজ, পেশায় স্বর্ণকার। ভারতবর্ষের অলংকারের সুনাম বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। মোটা অঙ্কের লাভের আশায় অনেক ব্যবসায়ীই পাড়ি জমাচ্ছেন বাণিজ্যিক জাহাজে চড়ে, সোয়ান হেজ তাদের মতোই একজন। দু’চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে সোয়ান চলেছেন অচেনা এক দেশে।
জাহাজের একজন কর্মী রেনা কেপি। সংসারে নিদারুণ নির্যাতিত রেনা তার স্বামীকে খুন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল এক শহর থেকে আরেক শহরে। সুযোগ বুঝে জাহাজে চাকরিটা নিয়েছে সে, পালিয়ে যাচ্ছে কোনো দূর দেশে।
এক শুভদিনে রেনা আর সোয়ান দুজনে দুজনের কাছাকাছি আসে। রেনা খুঁজে পায় হারানো ভালোবাসা, আর সোয়ান চায় দীর্ঘ সমুদ্রভ্রমণের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি। মনে মনে কয়েকবার দ্বিধাদ্বন্দ্ব অনুভব করে নিজের স্ত্রীর জন্যে খারাপ লাগলেও পরে সেগুলো বেমালুম ভুলে যায় সোয়ান।
রেনার জাহাজটির শেষ ঠিকানা ছিল ভারতবর্ষ। সেখানেই থেকে যায় রেনা। রেনার একটি মেয়ে হয়, ভারতেই থেকে যায় সে। আর ব্যবসা শেষে ফিরে যাবার সময় জাহাজেরই কিছু মানুষের হাতে খুন হয় সোয়ান হেজ।
কেউ বলে ওকে স্বর্ণের লোভে খুন করা হয়েছে। আবার কেউ বলে অশরীরী আত্মা ভর করেছিল সোয়ানের উপর। মৃত্যুর আগে সে অদ্ভুত আচরণ শুরু করেছিল। একদিন রাতে জাহাজের কাপ্তানকে আক্রমণ করে বসে। সাত আটজন মিলেও আটকে রাখা যাচ্ছিল না তাকে, শেষে মাথায় গুলি করেন এক সাবেক সেনা কর্মকর্তা।
তিন
২৪ জুলাই, ১৯৮১। শুক্রবার। মাইঝাটি গ্রাম।
জাবেদ সাহেবের স্ত্রীকে কবর দিয়ে আসতে আসতে ভোর হয়ে গেল। হাওর অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই নাজুক। এক-একটা গ্রামে গুটিকয় ঘর, জাবেদ সাহেবদের গ্রামে বাড়ি আছে সর্বসাকুল্যে বিশটা। বছরের প্রায় সাত মাস পানিতে ঘেরা থাকে হাওর অঞ্চলের এই গ্রামগুলো। এক-একটা গ্রাম যেন বিশাল সমুদ্রের বুকে এক একটা দ্বীপ।
পানি-বন্দি এই মানুষগুলোর একমাত্র যাতায়াত ব্যবস্থা হলো নৌকা। এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যেতে এরা সাধারণ দাঁড়া বাওয়া নৌকা ব্যবহার করে আর দূরের পথের জন্যে আছে ইঞ্জিন চালিত নৌকা। সেই ইঞ্জিন চালিত নৌকার অবস্থাও যে খুব বেশি উন্নত তা না। শীতকালে যখন ৪-৫ মাসের জন্যে পানি নেমে যায় এই এলাকার মানুষেরা তখন চাষবাস করে। পানি নেমে যাওয়ায় এক বিশাল ফাঁকা অঞ্চল সৃষ্টি হয়, এক প্রান্তে দাঁড়ালে যার আরেক প্রান্ত দেখা যায় না। এলাকায় তখন যেন প্রাণের সঞ্চার হয়, বর্ষাকালের মাঝিরা হয়ে যায় কৃষক, নৌকার ইঞ্জিনগুলো হয়ে যায় ক্ষেতের পানি সেচের পাম্প।
শ্বশুরবাড়ির দিকের আত্মীয়স্বজনের অনুরোধে স্ত্রীর কবরটা নিজের শ্বশুরালয়েই দেওয়ার জন্য মনস্থির করলেন জাবেদ সাহেব। যেহেতু গ্রাম দেশ, সারা রাত লাশ নিয়ে বসে থাকার মানে নেই। মুরুব্বিদের তাগাদাও চলতে থাকে মৃতকে দ্রুত কবর দেওয়ার জন্য। যত দ্রুত কবর দেওয়া হবে ততই মঙ্গল। এই গরমের রাতে সারা রাত লাশ টেকানো যাবে না, পচে যাওয়ার শঙ্কাটি রয়েই যায়। অগত্যা রাতেই কবর দিতে রওনা হতে হলো।
সব আনুষ্ঠানিকতা সেরে মাইঝাটি ফিরতে ফিরতে এখন রাত প্রায় শেষ হয়ে এলো বলে।
ওদিকে মা-মরা মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে শেষ। সকাল থেকে একটানা আহাজারি করতে করতে এখন গলা স্তিমিত হয়ে আসছে, তবু এক অস্পষ্ট গোঙানি শোনা যায়। মা-মরা মেয়ের সেই কান্নার শব্দ কাঁপন ধরায় বুকে, হাহাকার সৃষ্টি করে।
জাবেদ সাহেব অনেক চেষ্টা করেও মেয়ের কান্না থামাতে পারলেন না। তাঁর বোন রাশেদা বলল, ‘ভাইজান ওরে আমি দেখছি, আপনে যান, একটু বিছানায় শরীরটা লাগান। কাইন্দা কি ফায়দা অখন কন?’
জাবেদ সাহেব গেলেন। কিন্তু ঘুম হলো না। সেদিন দুপুর পর্যন্ত কান্না চলল জাবেদ সাহেবের মেয়ের।
চার
আজ ছয় বছর পর বাড়ি ফিরছে অকিল।
ছয় বছরকে খুব একটা বড় সময় মনে না হলেও বিদেশের মাটিতে ছয় বছর কি তা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়। অকিল দেখতে মোটাসোটা, মাথায় কোঁকড়ানো চুল, চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। চশমার ডাঁটিটা একটু ঢিলে, বার বার নাক দিয়ে পিছলে পড়তে থাকে। অকিল একটু পর পর তা হাতের তালু দিয়ে ঠিক করে। দুই মাস ধরে চশমাটা পাল্টাবে ভাবলেও পাল্টানো হচ্ছে না।
গত তিন ঘণ্টা ধরে নৌকাতে বসে আছে ও। নৌকাটা চালু হওয়ার পর ইঞ্জিনের ভটভট শব্দ কানে ধরছিল খুব। অসহ্য রকম শব্দ। এতক্ষণ ধরে বসে থেকে এখন সেটা অনেকটাই স্বাভাবিক লাগছে, তবে মাথা টনটন করছে। নির্ঘাত মাথা ব্যথা শুরু হবে। বাড়ি পৌঁছাতে আরো ঘণ্টা দুই বাকি। মাথা ব্যথা আজ নিশ্চিত। বাড়ি আসবার আনন্দ সব উবে যাচ্ছে এই ভটভট শব্দ আর মাথার দপদপানিতে। এই জীবনে অকিল খুব কম জিনিসই ভয় পায়। মাথা ব্যথা তার মাঝে একটা। একবার শুরু হলেই হলো, ব্যথার চোটে তখন না যাবে শোয়া না যাবে বসা।
মাথা ব্যথা থেকে মন ঘুরানোর জন্য পাশে বসা গ্রাম সম্পর্কের চাচা কলিমুদ্দীনকে বলল অকিল, ‘চাচা, গ্রামটা তো বোধহয় একদম বদলে গেছে না? চিনব নাকি নৌকো থেকে?’
কলিম চাচা একটু হেসে বললেন, ‘বাজান, মনে হয় না চিনবা, অনেকটুকু ভেঙে পড়েছে নদীতে, ঘর বাড়ি বদলিয়েছে, বুঝোই তো, মেলা দিন পার হইলো তুমি যাওয়ার পরে। কদ্দিন বাদে জানি ফিরলা?’
‘এইতো চাচা, ছয় বছর হবে।’
‘তাইলে বোঝো!’
উনার সাথে একমত হয়ে মাথা নাড়ল অকিল। এখন শীতকাল। পানি অনেকখানি নেমে গেছে। চাচা জানালেন আর কিছুক্ষণ পর নৌকা যাবে না। প্যাঁক-কাদা মাড়িয়ে হাঁটতে হবে। গ্রামের এই জিনিসটা এখনো বদলায়নি!
কলিমুদ্দিন শুধালেন, ‘বাবা হাঁটতে পারবা তো?’
‘জি চাচা। কি বলেন এইটা? পারব না আবার!’
‘তাইলে জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও, আর বেশি দেরি নাই।’
দুই মাঝি অনেক কসরত করে নৌকা ঘাটে লাগালো। ঘাটটা যে অস্থায়ী সেটা বোঝাই যায়। নামতেই কাদার মাঝে পা ডুবে গেল অকিলের। দুইশো ডলারের নাইকি জুতা, বুকটা খচ করে উঠল অকিলের। একটু সামনে এগিয়ে জুতা খুলে প্যান্টের বেল্ট বাঁধার জায়গায় বেঁধে নিলো সে, এতে হাঁটার গতিও বেশ বাড়ল।
হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল করল ওর বয়সী একটা ছেলে ওর পাশাপাশি হাঁটছে। ভালো করে তাকাতে কেমন চেনা চেনা লাগল। ‘কিরে তুই সাগর না?’
‘শালা, চিনতে পেরেছিস তাহলে!’
‘কি বলিস, পারব না আবার!’
বলে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরল। খুব বেশি বন্ধু অকিলের কোনো কালেই ছিল না। সবার মধ্যে সাগর ছেলেটাই ছিল অন্যরকম। খুব বিশ্বস্ত ছেলে, তাই ঘনিষ্ঠতাও বেশি ছিল। আজ ছয় বছর পর সামনাসামনি দেখা, বুকটা ভরে গেল অকিলের।
পাঁচ
গ্রামের বাড়িতে রাত নয়টা মানে নিশুতি। কিন্তু আজ তেমন মনে হচ্ছে না। ঘর ভর্তি মানুষ। সবার উৎসাহ অকিলকে নিয়ে। এই ঘর ঐ ঘর করে এক এক বাড়ি থেকে এক এক জন আসছে। কেউ আসছে পিঠা, কেউ টাটকা মাছ বা সবজি আবার কেউ আসছে ঘরে পাতানো খাঁটি ঘি নিয়ে।
এতো আতিথেয়তা দেখে মনটা ডুকরে কেঁদে উঠল অকিলের। এমন একটা দেশে ছয়টা বছর কাটাতে হয়েছে, যেখানে বিনে পয়সায় একটা দানাও কেউ কখনো দেয় নি।
দেশের বাইরে যাওয়ার পর এক বাঙালি আত্মীয়ের বাসায় প্রথম উঠে সে। বাড়ির কর্তা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন যে নেহাত অকিলের বাপের কাছে ঋণী তাই জায়গা দিয়েছেন। দুই দিনের মাঝে নিজের ব্যবস্থা করে সরে পড়তে হবে। দু’দিন পরেও যখন কোনো থাকার জায়গার ব্যবস্থা হয়নি, তখন আরো পাঁচদিন থাকার জন্য গুনে গুনে এক সপ্তাহের ভাড়া হিসেবে সত্তর ডলার দিয়ে আসতে হয়েছে তাকে। বাড়ির স্টোররুম হিসেবে ব্যবহার হওয়া একটা ঘরে শুরু হয়েছিল অকিলের প্রবাস জীবন।
পিঠে সাগরের চাপড় খেয়ে সম্বিৎ ফিরল অকিলের। ‘কিরে কি ভাবছিস?’
‘কিছু না রে বন্ধু, ভাবছিলাম এতো মায়া ছেড়ে কেন বাইরে গিয়েছিলাম!’
‘শালা ভীমরতি ধরেছে নাকি, হ্যাঁ? এতো ভালো দেশ এতো উন্নত দেশ আর তুই মায়ার কথা বলিস! কি আছে তোর নিজের দেশে? আমার কথাই ধর। এই যে পুলিশের চাকরি করি, কয় টাকা বেতন পাই? বেতনের টাকায় মাসের কয়দিন যায় শুনবি?’
‘আচ্ছা ভায়া, বাদ দে। ভাল কথা তোর বোন কোথায়?’
‘আজ আসতে পারেনি রে, একটু ঝামেলা আছে। কাল আসবে। জাবেদ দের বাড়িতে ও একটু সাহায্য করছে, ওদের বড় বিপদ।’
‘সে কি? কি হয়েছে? কোনো সমস্যা?’
‘জাবেদ কে তো চিনিস, আরজ চাচার ছেলে।’
‘হু, চিনি। ভালো ফুটবল খেলত। শুনলাম জাবেদের বউটা মারা গেছে। এতো অল্প বয়স মেয়েটার, খারাপ লাগলো খুব।’
‘জাবেদের একটা মেয়ে হয়েছে জানিস বোধহয়, রীতি নাম।’
‘হ্যাঁ, ওকে তো তিন-চার বছরের দেখে গিয়েছিলাম।’
‘হ্যাঁ, আর বলিস না। মা মারা যাবার পরপর এই মেয়ে কে জ্বিনে ধরেছে!’
‘আরে ধুর, ফাজলামি করার জায়গা পাস না! জ্বিনে ধরেছে? শালা ভেবেছিস গ্রামে এসেছি অনেক দিন পর, ভয় পেয়ে যাব! না?’
কথাটা বলতে বলতে একটা অট্টহাসি দিল অকিল। পরক্ষণেই লক্ষ্য করল সাগরের মুখটা কালো হয়ে গেছে। বোঝাই যায়, ব্যাপারটা নিয়ে সে বেশ সিরিয়াস। নিশ্চয়ই কোথাও ঘাপলা আছে। জিন-ভূত এ অকিলের কোনো বিশ্বাস নেই। ও ভীষণ বাস্তববাদী মানুষ।
অকিল বলল, ‘বন্ধু তুই তো আমাকে চিনিস তাই না? আর তুই এটাও জানিস আমি ভীষণ বাস্তববাদী মানুষ। এসব জ্বিন-ভূতে আমি বিশ্বাস করি না। তবে তোরা যেটাকে জ্বিন-ভূত বলে চালিয়ে দিস সেটাকে আমি বলি unexplained phenomenon. এখন তুই বলতে পারিস যাহা unexplained phenomenon তাহাই ভূত। দুটোর শুধু দুই নাম। কিন্তু ব্যাপারটা কিন্তু মোটেই তা না। ধর তুই আকাশে উজ্জ্বল একটা বস্তু ভাসতে দেখলি। ওটা প্লেন না তুই নিশ্চিত, এখন তুই বললি ওয়াও এটা নিশ্চয়ই ফ্লাইং সসার। আমার কথা হল ভাই তুই জানিস না ওটা কি। এখন ওটা প্লেন না হলেই ফ্লাইং সসার হবে কেন? একইভাবে তুই বলতে পারিস না রীতিকে জ্বিনে ধরেছে। ওর আচরণ অস্বাভাবিক মনে হলে বলতে হবে অস্বাভাবিক আচরণ। জ্বিন-ভূত বলে সব কিছুকে লেবেল দেয়া খুবই যুক্তিহীন একটা কাজ।’
‘ভাই তোরা অনেক পড়া লেখা করেছিস অনেক জ্ঞানগরিমা। আমরা তোদের সাথে কথা বলে পারব কেন।’ কথাটা বলে মনে মনে ভীষণ রাগ করল সাগর।
‘আরে ভাই তুই দেখি ব্যাপারটা পার্সোনালি নিলি। শোন তাহলে বলি কি, আমি কাল দেখতে যাব রীতি কে। আচ্ছা বল তো সমস্যাটা কি? কেন তোদের মনে হলো মেয়েটাকে জ্বিনে ধরেছে?’
‘সে তো অনেক বড় গল্প…’
‘আরে শুরু কর, এতদিন পর এলাম আজ! আড্ডা দিয়েই পার করে দিবো সারারাত!’
‘সে কি, এতো ধকল সহ্য করে এতো দূরের পথ পাড়ি দিয়ে এলি। বিশ্রাম নে তো, কাল সকালে অনেক কাজ আছে, বিকালে তোকে নিয়ে যাবো ওখানে। যাবার পথে গল্পটা শোনাব তোকে।’
সাগর চলে গেল, অনেক অনুরোধের পরও রাতে খেয়ে গেল না। সম্ভবত রাগ করেছে, মনে মনে ভাবল অকিল। হয়ত এতো কড়া ভাবে বলা ঠিক হয়নি। গ্রাম গঞ্জের মানুষ অনেক সাদাসিধা, সহজ তাদের জীবন বোধ। unexplained phenomenon জাতীয় তত্ত্বকথা চাইতে ভূতে বিশ্বাস করে ফেলাটাই এদের কাছে সহজ, এটা বোঝা উচিত ছিল অকিলের। কিন্তু কি করবে উলটা পালটা কিছু দেখলে সেটা ধরিয়ে না দেয়া পর্যন্ত অস্বস্তি লাগে তার। নিজের কাছেই খারাপ লাগতে থাকল।
ওদিকে অকিলের মা মালতী দেবী দু’বার খেতে ডেকে গেছেন, এ নিয়ে তৃতীয় বার এলেন। ‘ও বাবা, দুই চাইর দানা মুখে কিছু দে, ও মা সাগরটা গেল কই? বলি, ছোট ঘরে গেল নাকি?’
‘না মা, সাগর বাড়ি চলে গেছে।’
‘হায় ভগবান, চলে গেল মানে টা কি? তুই আসলে কি কি করবে কি কি খাওয়াবে গত দুই তিন মাসে তো সেই গল্প করেই আর রাখে না, এখন চলে গেল? বুঝি না বাপু।’
রাগে মালতী দেবী গজগজ করতে চলে গেলেন। উনি যতটুকু রাগলেন তার থেকে বেশি কষ্ট পেলেন। মালতী দেবীর মনে হচ্ছে অকিল বদলে গেছে। উনার সন্দেহ হচ্ছে উনাকে না জানিয়ে বিয়ে টিয়েও হয়ত করে ফেলেছে। নির্ঘাত ইনিয়ে বিনিয়ে কোনো একদিন বলে বসবে মা বিয়ে করে ফেলেছি। কোনো সাদা চামড়ার মেয়েকেই হয়ত ঘরে তুলতে হবে। এমনই পোড়া কপাল, ছেলেটাও তাহলে বিদেশেই থিতু হবে। ভাবতে ভাবতে অকিলের মা কেঁদেই দিলেন।
ওদিকে অকিলের এতো মানুষের হৈচৈ ভাল লাগল না। কেন যেন মনে হলো সাগর যায় নি। এতো দিন ধরে বসে আছে ওর জন্যে আজ হুট করে চলে যাবে? যেতেও পারে, মানুষের আশা যত বেশি, উত্তেজনা যত বেশি, সে কষ্টও পায় তত বেশি।
বাড়ির বাইরে যেতেই সাগরকে পাওয়া গেল। বাড়ির সামনে একটা গাছে হেলান দিয়ে বিড়ি টানছে। অকিল পাশে যেয়ে দাঁড়াতেই পকেট থেকে আরেকটা বিড়ি বের করে দিল অকিলকে। ‘বিড়ি খাওয়াটা এখনো ছাড়তে পারলি না রে? সিগারেট খেলেই পারিস।’
‘সিগারেট বিড়ি, টমেটো টম্যাটো, একই জিনিস ভায়া।’
‘হু, তা বটে। ঘাটে যাবি নাকি? আগের মত নেই অবশ্য।’
‘যাই চল।’
‘এতো শীত আগে পাইনি রে!’
’এই এটা তোর মানিব্যাগ নাকি রে?’ বলে একটা মানিব্যাগ সাগরের পায়ের কাছ থেকে তুলে দিল অকিল।
‘হু, বিড়ি বের করতে গিয়ে পড়ে গেছে মনে হয়। তুই শীতের দেশ থেকে এসেও শীতের কথা বলছিস?’
‘হু, এখানের শীত আর ঐ শীত এ অনেক তফাত। আচ্ছা গ্রামটা পুরো বদলে গেছে না রে?’
‘হু, তবে, সাদেক চাচার দোকানটা কিন্তু এখনো আছে ঘাটের পাশে।’
‘তাই নাকি, মরে নি ঐ বুড়ো?’
‘নাহ! তোর কাছে কুড়ি টাকা পায়, ওটা না নিয়ে কবরে যাচ্ছে না।’
‘আজ সব পাওনা মিটিয়ে দেব, কি বলিস?’
‘হাহা, ব্যাটা সুদ চায় কিনা দেখ, দেখা যাবে বিশ টাকা দুই হাজার টাকা হয়ে গেছে। ছয় বছরে সুদ কম হবে না।’
সাদেক চাচাকে অবশ্য পাওয়া গেল না, যাকে ঐ দোকানে পাওয়া গেল সে হচ্ছে সাদেক চাচার ছেলে, আবুল। আবুলের বয়স নয়-দশ হবে। ওকে ছোট দেখে গিয়েছিল অকিল। আবুলের দিকে তাকিয়ে চায়ের ফরমাশ করল সাগর।
‘আচ্ছা বন্ধু বল দেখি রীতি মেয়েটার কেসটা কি?’
সজোরে বিড়িতে একটা টান দিয়ে অকিলের হাতে বিড়িটা গুঁজে দিয়ে শুরু করল সাগর। ‘গতবারের বর্ষাকালের কথা, সেটা ছিল বৃহস্পতিবার। কোনো কারণে জাবেদ ভাই তার বউয়ের সাথে ঝগড়া করলেন। সময়টা ধর আনুমানিক মাগরিবের আজানের আধ ঘণ্টা আগে। জাবেদ ভাই বাড়ি এসে দেখলেন রীতির মা শুয়ে আছে, তার মেয়ে ডাকছে মা উঠো উঠো। উনি ভাবলেন বউ হয়ত রাগ দেখাচ্ছে। উনি রাগ ভাঙাতে গিয়ে দেখলেন তার বউয়ের শরীর একদম নিথর। কোনো রেসপন্স নাই। মারা গেছে।’
‘বলিস কি, মাই গড!’
‘এটা তো কিছু না, সমস্যা শুরু হয়েছে এর পর।’
‘মানে?’
‘জাবেদ ভাইয়ের বউকে রাতেই কবর দেওয়া হল, ভাবির বাপের বাড়িতে। জাবেদ ভাইয়ের ফিরতে ফিরতে সকাল, মানে ভোর হয়ে গেল আরকি। কিন্তু উনার মেয়ে তো ছোট। সে তার মায়ের জন্যে হুলুস্থুল কান্নাকাটি শুরু করল। বাচ্চা মেয়ে কি আর বোঝে। কান্না আর থামে না। দুপুরের দিকে জাবেদ সাহেব খুব রাগ করলেন। মেয়েকে একটা চড় মারলেন। মেয়ের কান্না থামলোও সেই চড় খেয়ে। এরপর মেয়ে বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। সেই ঘুম আর ভাঙে না। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত, তারপরেও দিন ভোর হয়ে এলো- মেয়ের ঘুম ভাঙে না। দুপুরে মেয়েকে নিয়ে তারা রওনা হলো সদর হাসপাতালে। নিতে নিতে রাত। মেয়ের ঘুম ভাঙছে না। ডাক্তার বলে কোমায় চলে গেছে। আরেকজন young ডাক্তার সে বলে না এটা কোমা না। সিনিয়র ডাক্তার আর তরুণ ডাক্তার এর মাঝে মনোমালিন্য। গভীর রাতে দেখা গেলো মেয়ে বিছানার চাদর খেয়ে ফেলেছে। গায়ে ভীষণ শক্তি। ৪ জন মিলে আটকে রাখা যায় না। পাশের রোগীর আস্ত কলার কাঁদি খোসা সহ খেয়ে নিল, তেলের কৌটা বোতল সহ কামড়ে খেয়ে ফেলল। কেমন ফ্যাকাশে চেহারা চোখ এ কোন প্রাণ নাই। নির্জীব ভাবে তাকিয়ে থাকে, দেখলে মনে হবে কোনো মৃত মানুষ হাঁটছে-খাচ্ছে। খেয়ে হঠাৎই শরীরটা নিস্তেজ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। টানা আরো ৬ দিন এমন চলল। কোনো রাতে উঠে খেত কখন ও উঠে না। ৬ দিন পর সেই ঘুম ভাঙল। মেয়ে এসব কিছু ঘুম ভেঙে বলতে পারে না। শুধু বলে। মা এর কাছে নিয়ে চল। মা ঢাকায়। মা এর কাছে যাব। মা ভুতের গালে ভুতের গালে। গাল জিনিস টা কি আমরা কেউ বুঝলাম না। সেটা কি মুখের গাল? কি বুঝতে চায়, ভূত খেয়ে ফেলেছে মা কে? না কি আমরা কুল কিনারা পেলাম না।
ডাক্তাররা চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানালেন। বললেন বাড়ি নিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করতে, তারা অপারগ। এখানেই শেষ না ৪ মাস গেল ভালোই। শুধু মা এর কাছে যাবে এটা বলে। আর উদ্ভট কথা বলে। কোনো মানে হয় না সেগুলোর। চার মাস পর আবার একই ঘটনা। কিন্তু এবার আরো মারাত্মক। গত দু মাস ধরে সেই মেয়ে ঘুমাচ্ছে। কখনো ছয় সাত দিন, আবার কখনো এক দুই দিন পর পর গভীর রাতে জেগে উঠে, সামনে যা পায় খেয়ে ফেলতে চায়। হেনো কিছু নাই যে খায় না। একদিন রাতে বেরিয়ে মুরগির খোপ থেকে জীবন্ত মুরগী কাঁচা খেয়ে ফেলেছে তিন চারটা। ভয়ংকর ব্যাপার।’
এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল সাগর। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনল অকিল। নিজেকে খুব বোকা মনে হচ্ছে। নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছে না। এও কি সম্ভব? ২ মাস ধরে একটা মানুষ ঘুমায়?
ছয়
পরের দিন আর যাওয়া হলো না অকিলের। কোনো একটা কারণে সাগর কাজে আটকে গেছে। সে আসতে পারল না। অকিলের মনটা বিক্ষিপ্ত ভাবে এই চিন্তা ঐ চিন্তা করছে। কিন্তু কোনো কিছুতেই মন বসছে না। সাগরের বলা ঘটনাটা কিছুতেই মাথা থেকে সরাতে পারছে না। নিশ্চয়ই এর কোনো ব্যাখ্যা আছে। জ্বিন-ভূত নিশ্চয়ই না, ভূত বলতে আমরা যা বুঝি তা থাকতেই পারে না। এদিকে বাড়িতে কোনো কাজ নাই। কি করবে, সময় কাটে না। মাঝে কিছু বই পত্র নিয়ে পড়াশোনা করল। কিন্তু ঐ যে ওর মাথায় একটা জিনিস ঢুকেছে। এখন কিছুতেই কিছু হচ্ছে না।
সেদিন রাতের কথা। গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল অকিলের। ঘরের আশেপাশে কোনো শব্দ হচ্ছে মনে হলো। নিশ্চয়ই কোনো জীবজন্তু হবে। চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করল অকিল। কিন্তু মনে হলো শব্দটা হচ্ছে। একটা নির্দিষ্ট তালে।
একটা আর্ত-চিৎকার, তার পর কিছুক্ষণের বিরতি। মনে মনে সেকেন্ড হিসাব করল অকিল। ২ সেকেন্ড। আবার চিৎকারটা শোনা গেল। হাওর অঞ্চল, এখানে অনেক দূরের শব্দ বাতাস আর পানিতে করে ভেসে আসে মনে মনে ভাবল অকিল, কোথায় না কোথায় হচ্ছে ধুর ঘুমাই। আবার হলো, আবার ২ সেকেন্ড পর আবার, এবার সুর একটু পাল্টেছে। এভাবে চলতেই থাকল। অকিল চোখ বন্ধ করে থাকল, বোঝার চেষ্টা করল এটা কি ওর মনের ভুল নাকি আসলেই হচ্ছে শব্দটা। এক সময় মনে হলো ও কি ওর নিজের মনের ভুল না তো? তো নিজের ভ্রম কাটানোর চেষ্টা করল। ঘুমের ঘোর আছে কিনা বুঝতে চাইল, না সেটা তো হতে পারে না। পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে শব্দটা ঘরের বাইরে থেকে।
এক সময় যখন আর পারল না উঠে পড়ল বিছানা থেকে। অন্ধকার ঘরে এদিক ওকিদ হাতড়ে হারিকেনটা পাওয়া গেল। হারিকেনটা জ্বালিয়ে মনে হলো শব্দটা আরেকটু দ্রুত হচ্ছে। ২ সেকেন্ডের বিরতিটা মনে হয় এখন আধা সেকেন্ড হয়েছে, এক সেকেন্ডও হতে পারে। বোঝা যাচ্ছে না। একটা ডিজিটাল ঘড়ি ওর আছে সেটা এই অন্ধকারে খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।
ঘরের দরজাটা খুলতেই একটা ঠান্ডা বাতাস ওকে ধাক্কা দিল। শরীরের হাড়সহ কেঁপে উঠল। এটাকেই মনে হয় বলে হাড়কাঁপানো শীত। অকিলের ঘরটা জমি থেকে কিছুটা উঁচুতে। নতুন বাড়ি, নামতে গিয়ে খেয়াল করেনি। ধুপ করে পড়ে গেল। হারিকেনটা হাত থেকে পড়ে গেল। অকিলের মাথাটা ঠুকে গেল বাড়ির সামনে রাখা একটা লোহার বালতিতে। ব্যথায় মাথাটা টনটন করে উঠল অকিলের। নিশ্চয় কেউ বাথরুমে যাওয়ার জন্য পানি আর বালতি রেখেছিল ঘরের সামনে। আছাড় খেয়ে হারিকেনটা নিভে গেছে। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার।
কষ্টে-শিষ্টে উঠে বসল অকিল। অনেক মারাত্মক কোনো দুর্ঘটনা হয়ে যেতে পারত অকিলের। মাথা ঠুকে কত মানুষ মারা যায় প্রতি বছর। কত মানুষ যায়? এর নিশ্চয় কোনো স্ট্যাটিস্টিক আছে। দেখতে হবে খোঁজ নিয়ে। মাথাটা ভীষণ ব্যথা করছে। হাত দিয়ে কপালে বুঝতে পারল রক্ত পড়ছে। শরীরের চাদরটা দিয়ে কপালে চেপে ধরল। ফাটেনি নিশ্চয়ই, ফাটলে জ্ঞান থাকার কথা না। চামড়া ফেটে কেটে গেছে হয়ত।
বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা বুঝল মাকে ডাকতেই হবে। শরীরটা বিশেষ ভালো লাগছে না। কেমন যেন বমি আসছে। কিন্তু উঠতে গিয়ে পারল না। মাথা ঘুরাচ্ছে। অনেক রক্ত বের হয়েছে হয়ত ভাবল অকিল। শেষে চিৎকার করে ডাকল, ‘মা মা ও মাআ’। তিন বার ডেকে কি যেন একটা মনে পড়ল অকিলের, কিন্তু কি যে মনে পড়ল কি যেন মাথায় আসি আসি করেও আসল না। কি যেন একটা ও ধরতে পেরেছে, বুঝতে পেরেছে কিন্তু সেটা কি? নাহ, কিছুতেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হচ্ছে না। তবে অকিল যে জিনিসটা খেয়াল করল না তা হলো চিৎকারটা থেমে গেছে... শব্দটা থেমে গেছে এখন আর হচ্ছে না।
পরের দুদিন জ্বরে কষ্ট করল অকিল। তৃতীয় দিন কিছুটা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারল ও। সেদিন সকালেই ঠিক করল আজই যাবে ও দেখে আসবে রীতির সাথে। এই দুই দিন জ্বরের ঘোরে তেমন কিছু করতে পারে নি ও। মাঝে মধ্যে প্যারাসিটামল খেয়ে যখন জ্বর কমেছে তখন রীতির কথা ভেবেছে অকিল। ব্যাপারটা ও কিছুতেই মাথা থেকে বের করতে পারছে না।
সকাল দশটার দিকে সাগর এল। ‘জ্বরে তো মরতে বসেছিলাম ভায়া, তুই তো এসে দেখাও করলি না। কিছু হয়েছে নাকি?’
‘হ্যাঁ রে, শালার এক মন্ত্রী এসেছে, তার ডিমান্ড এর শেষ নাই। চাকরি নিয়েছি পাবলিক এর আর সেবা করি কাদের! তা তোর খবর শুনলাম কাল রাতে তাই আজ চলে এলাম। হয়েছে কি?’
‘ভায়া বাথরুমে যেতে যেয়ে পড়ে কি বিচ্ছিরি অবস্থা বল। বালতি টা কপালে ঠুকে গেল!’
‘কদিন শহুরে জীবন যাপন করে তুই কি যে হয়েছিস। রেস্ট নে নড়া চরা করবি না। সুস্থ হ।’
‘না রে আজ তোর রীতির কাছে নিয়ে যেতে হবে।’
‘বলিস কি রে? তোর পাগলামি গেল না। আগের মতই আছিস। ডিটেকটিভ হওয়ার শখ টা যখন এত আমার মত পুলিশে যোগ দিতি। এখনো সময় আছে কোয়ালিফিকেশন তো ভাল যোগ দিয়ে দে।’
‘আরে ধুর ও সব চাকরামি করতে পারব না। নে ধর উঠা, স্নানটা করেই রওনা দিব। তুই জল খাবার টা খেয়ে নে, মাকে বলে রেখেছি তোর প্রিয় দুধ চিতল বানিয়েছে যা।’
সাত
বিশাল একটা নৌকাতে মাত্র পাঁচ জন মানুষ। ২ জন মাঝি, অকিল, সাগর আর তার বোন সাহেদা। কুয়াশাতে ২ হাত সামনেও কিছু দেখা যায় না। অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে অকিল এর। ও শুধু সাগর আর ওর বোন কে দেখতে পাচ্ছে। নৌকার দুই মাথার দুই মাঝি কে ও দেখা যাচ্ছে না। অদ্ভুত ব্যাপার, মাঝিরা ঠিক পথে যাচ্ছে তো?
মনে মনে যখন এই কথা ভাবছিল সাহেদা বলে উঠল, ‘ভাই চা দিব?’
অকিল বেশ আনমনে ছিল শুনতে পায় নি। সাহেদা তার ভাইকে একটা গুঁতা দিল। এবার সেই গুঁতা এসে পড়ল অকিলের কাঁধে। ‘কি, চা হবে?’
‘হুহু, দে দে।’ জবাব দিল অকিল।
সাহেদা সবাইকে চা দিল। দুজন মাঝিও পেল। চা খাওয়ার বিরতি চলছে তাই নৌকা খুব ধীরে চলছে। ডানে বায়ে একটু দুলছে। মাঝে মাঝে ঢেউ এর বাড়িতে অল্প বিস্তর ছলাত ছলাত শব্দ হচ্ছে। এ ছাড়া পুরোটা পরিবেশ নিস্তব্ধ নীরব। মাঝে মাঝে নীরবতায় কানে তালা লেগে যায়। এখনকার দুনিয়াতে যে পরিমাণ হৈ চৈ কোলাহল তাতে এই অনুভূতি একই সাথে স্বর্গীয় আবার অস্বস্তিকর অচেনা একটা অনুভূতি মনে হলো। কানের পেশে যেন একটা ঝি ঝি শব্দ কান দুটোকে চাপ দিয়ে রেখেছে। যত সময় যায় তত ভালো লাগে কিন্তু অস্বস্তি তত বাড়ে।
নীরবতা ভাঙ্গল সাহেদার মিষ্টি কণ্ঠ। ‘ভাই আপনার কথা অনেক শুনেছি, মাঝে মধ্যে মনে হত আপনি আমাদের পরিবারেই থাকেন।’
‘তাই নাকি? কিরে সব সিক্রেট ফাঁশ করে দিয়েছিস?’
‘আর ধুর কি বলিস, নাহ তেমন কিছু না। আমরা তোর গল্প করি এই আরকি স্মৃতি তো আর কম না।’
‘তা আপু, রীতির গল্পটা শুনেছেন নাকি?’
‘জী ভাই, আপনার বন্ধু ভাবে জ্বিন-ভূতের কারসাজী।’
‘আপনি ভাবেন না? আপনার কি মনে হয়?’
‘ভাই জ্বিন-ভূত কিনা জানি না, তবে এইটুকু বলতে পারি এভাবে এই অজপাড়া গাঁ এ ফেলে রেখে এই সমস্যার সমাধান হবে না। দুনিয়া কত এগিয়েছে কেউ না কেউ ঠিক করে বলতে পারবে কি হয়েছে।’
‘অসাধারণ বলেছেন আপু, বাই দা ওয়ে আপনার চা টা বেশ হয়েছে।’
কথাটা অবশ্য বানিয়ে বলল অকিল। চা টা জঘন্য। কিন্তু প্রশংসায় বেশ লজ্জা পেলেন উনি। ফর্সা গাল দুটো লাল হয়ে গেল। সাগর কারো দিকে তাকাচ্ছে না দূরে কোথাও তাকিয়ে আছে। মানুষ লুকোতে চাইলে এমন করে। চোখের দিকে তাকায় না। চোখ অনেক কিছু বলে দেয়।
তিনজনের কথা বার্তা আরো দুই ঘণ্টা চলল। যখন ওরা পৌঁছুল অকিলের শরীর বেশ ভালো লাগছে। রীতিদের বাড়িতে যেয়ে জাবেদ সাহেবকে পাওয়া গেল না। তবে রীতির দাদাকে পাওয়া গেল। তিনিই নিয়ে গেলেন রীতির রুমে। ভীষণ রোগা একটা মেয়ে বিছানায় পড়ে আছে শরীরে একটা কম্বল দেয়া।
অকিল জিজ্ঞেস করল, ‘হাত পা বেধে রেখেছেন?’
‘হ বাবা, করুম কি!, কিছু করার নাই। গত রাতে এক ছোট বাচ্চার গলা টিপা ধরেছে, আল্লাহ্ সহায় নাইলে বাচ্চাটা রে বাঁচানো যেত না।’
‘আজ কত দিন হল এমন?’
‘বাবা ২ মাস ১৭ দিন।’
‘জাবেদ সাহেব আসবে কখন বলতে পারেন?’
‘তার আসতে বাবা আজ সন্ধ্যা হবে।’
‘ওনার সাথে কিছু জরুরী কথা ছিল।’
‘অবশ্যই কথা হবে, তুমি এ বাড়ির মেহমান আমার নাতনীকে দেখতে আসছ। আজ রাতে তোমরা তিনজন থাইক্কা যাও। যত্ন আত্তির কোনো কমতি হবে না।’
বুড়োর কথায় রাজি হলো অকিল। যেই কথা সেই কাজ। বিদেশ ফেরত কোনো মানুষের বোধহয় অনেক কদর এদেশে। দুই পদের মুরগী, খাসি, পোলাও, চার পদের মাছ দিয়ে খাবার দেয়া হলো। এত খাবার কি মানুষ খেতে পারে? মনে মনে এটা ভেবে আশ্চর্যিত হলো। এভাবে আসা আর থাকাটা ঠিক হচ্ছে কিনা তা ও এখন ভাবাচ্ছে অকিলকে। সে কোনো ডাক্তার না, না কোনো ফকির বা ওঝা। মেয়েটাকে সারানোর কোনো ক্ষমতা ওর নেই। নিজের কিউরিসিটি থেকে এসেছে। গ্রামে মানুষের ঢল পড়ে গেছে অকিলকে দেখতে। বিদেশ ফেরত মানুষের মাঝে কি আলাদা আছে ও বুঝতে পারল না। এত খাবারের কিছুই খেতে পারল না ও। অতি শোকে পাথর আর অতি খাবারে অভুক্ত।
এর মাঝে রীতির হাত পা থেকে সেঁকল খোলা হলো, গরম পানি দিয়ে তার সারা শরীর মোছা হলো, নোংরা জরাজীর্ণ কাপড় খুলে ভাল পাড় পড়িয়ে দেয়া হলো। খাওয়ার পর্ব শেষ করে অকিল এসে মেয়েটার পাশে বসল। মেয়েটার কব্জিতে হাত দিয়ে পাল্স দেখল। পাল্স বেশ ধীর গতির। তার পর মেয়েটার চোখ পরীক্ষা করল। চোখের পাতার উপর দিয়ে বোঝা গেল ভেতরে চোখের মনি নড়ছে। তার মানে মেয়েটা স্বপ্ন দেখছে। ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং মনে হলো অকিলের। কতক্ষণ এমন মনি নড়ে খেয়াল করতে হবে। স্বপ্নের দৈর্ঘ্য কত তা বোঝা দরকার। পুরোটা সময় ই কি স্বপ্ন দেখে নাকি মাঝে মধ্যে এটা খুব জরুরী। যদিও অকিল ডাক্তার না কিন্তু ও পরিষ্কার বুঝল মেয়েটার সমস্যা খুব জটিল। বাংলাদেশের কোনো ডাক্তার কিছু করতে পারবে বলে ওর তেমন কিছু মনে হলো না।
কি করা যায় ভেবে ও ঠিক করল যে করেই হোক অস্ট্রেলিয়াতে ফোন দিতে হবে। ওর পরিচিত এক ডক্টর আছে ওকে বললে বই টই ঘেঁটে কিছু একটা বের করতে পারবে। ঢাকায় গেলে ও হয় তবে ঘুমের উপর অত সুনির্দিষ্ট বই কি পাওয়া যাবে? উহু, তার চেয়ে ভালো বোধহয় ইন্ডিয়া গেলে। কি করবে বুঝতে পারছে না অকিল। পুরো গ্রামে একটা চাপা ভয় দেখা যাচ্ছে। কিছু কিছু মানুষকে দেখা গেল কানাঘুষাও করতে। রীতিকে গ্রাম থেকে বের করে দেয়ার জন্যেও কিছু লোক চেষ্টা চালাচ্ছে মনে হলো।
সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করার পর জাবেদ সাহেব এলেন। উনি বিশেষ খুশি বলে মনে হলো না অকিলের। ব্যাপারটা খুব স্বাভাবিক। এমন না যে অকিল কোনো ডাক্তার। সাংবাদিকতায় পড়া লেখা করে নিশ্চয় একজন আড়াই মাস ধরে কেন ঘুমাচ্ছে আর কেন এমন আচরণ করছে তা বলতে পারবে না। তবে অকিলের নিজের প্রতি এতটুকু বিশ্বাস আছে যে ওর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এই গ্রামে যে কারো থেকে বেশি হবে।
‘ভাই আমি জানি আপনার আমার সাথে কথা বলার কোনো ইচ্ছা বা ধৈর্য কোনো টাই নাই। কিন্তু আমি এতটুকু বলতে পারি আপনি এখন যে সাগরে আছেন তার কূল কিনারা না করতে পারলে ও কিছু টা আশা দিতে পারি। আমার কিছু জিনিস জানা খুব প্রয়োজন, আপনি যদি রাজি থাকেন আমি প্রশ্ন করব।’
‘জী বলেন।’
‘প্রথমেই আপনাকে বলি, আপনি খুব খুব গভীর ভাবে চিন্তা করে আমাকে উত্তর গুলো দিবেন, একদম বুঝে শুনে আপনার অপ্রিয় উত্তর হলেও আপনার সঠিক এবং সুচিন্তিত উত্তর আমার চাই। প্রথম যেদিন রীতির এমন হল সেদিন কি হয়েছিল?’
‘ওর মা যেদিন মারা গেল সেদিন দুপুরে ওর কান্না না থামাতে পেরে আমি ওকে একটা চড় দেই। ও কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে যায়। তার পর তো আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন।’
‘জী, আচ্ছা গত দেড় মাস আগে যে মেয়েটা আবার এমন ঘুমিয়ে পড়ল সেদিন কি আপনি ওকে মেরেছিলেন?’
‘জী না ভাই, তবে আমি তাকে বকা দিয়েছিলাম। আপনি নিশ্চয় জানেন সে প্রায়ই আবোল তাবোল বকে। যেমন প্রায়ই বলে মা কে এনে দাও, মা ভুতের গালে। অনেক দিন তো হলো বলেন! আর কত সহ্য করা যায়? মানুষের কি কেউ মরে না? তাই বলে এমন করতে হবে?’
‘এমন বকা কি আপনি তাকে প্রায়ই দেন?’
কথাটা শুনে বেশ বিরক্ত হলেন জাবেদ সাহেব। উত্তর দিলেন, ‘জী প্রায়ই দেই।’
উত্তরটা জী না হলে অকিলের জন্য খুব ভালো হতো। কিন্তু অকিলের কিছু করার নেই। দুনিয়ার সব সমীকরণ মেলানো যায় না। মারফির সূত্র বলে একটা কথা আছে—পাউরুটির টুকরো হাত ফসকে পড়ে গেলে মাখন মাখানো দিকটাই মেঝের ধুলোতে পড়বে। কেন এমন হয়? প্রকৃতি কি চায় মানুষ একটু বেশি কষ্ট পাক? দুনিয়ার নিয়ম ই হচ্ছে সব কিছু কঠিন করা। আপনি যদি একটা ব্যাগ থেকে একটা পেন্সিল নিতে চান আর সেই ব্যাগে যদি তিন টা পেন্সিল থাকে তাহলে আপনি যেই পেন্সিল টা চাচ্ছেন সেটাই সবার পরে উঠবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কেন এমন হয়? জীবন অনেকটা জট পাকানো সুতোর মতো, একদিক খুলতে গেলে আরেকদিক প্যাঁচিয়ে যায়। ব্যাপারটা নিয়ে অনেক ভেবেছে অকিল। এখনো কোনো কূল কিনারা করতে পারে নি ও।
অকিল গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিল। পরিবেশটা থমথমে। সে সরাসরি জাবেদ সাহেবের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করল, ‘আপনার কি মনে হয় জাবেদ সাহেব? গ্রামের মানুষ যা বলছে তা-ই কি সত্যি? আপনার মেয়েকে কি আসলেই জীনে ধরেছে?’
জাবেদ সাহেব সাথে সাথে উত্তর দিলেন না। তিনি উদাস দৃষ্টিতে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন। বাইরে অন্ধকার নামছে। তার চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। দীর্ঘ একটা সময় পার করে তিনি ফিসফিস করে বললেন, ‘আমি জানি না ভাই। বিশ্বাস করেন, আমি কিচ্ছু জানি না। আমার আর জানার ইচ্ছাও নাই। আল্লাহ্র মাল আল্লাহ্ যদি এখন তাকে নিয়েও যায়, আমার আর কিছু বলার নাই। বরং বাঁচি, মেয়েটাও বাঁচে।’
কথাটা শোনার পর অকিলের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। একজন বাবা কতটা অসহায় হলে, কতটা যন্ত্রণার শেষ সীমানায় পৌঁছালে নিজের সন্তানের মৃত্যু কামনা করতে পারে! এটা কি নিছক ক্লান্তি, নাকি ভালোবাসারই আরেক রূপ? মেয়েটা কষ্ট পাচ্ছে, সেটা তিনি আর সহ্য করতে পারছেন না। ব্যাপারটা এই পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে, ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে। খুব দুঃখজনক। ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
অকিল প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা করল, নাকি জট খোলার আরেকটা সুতো টান দিল? সে বলল, 'আচ্ছা জাবেদ ভাই, আপনার স্ত্রী সম্পর্কে বলুন। রিশিতা ভাবি। তার সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল? আপনাদের দাম্পত্য জীবন কি সুখী ছিল?’
প্রশ্নটা শুনে জাবেদ সাহেব নড়েচড়ে বসলেন। তার কপালে ভাঁজ পড়ল। তিনি পালটা প্রশ্ন করলেন, ‘কেমন ছিল বলতে? কি বলতে চাইছেন আপনি? স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক যেমন হয় আরকি...’
‘আমি শুনেছি আপনার স্ত্রী যেদিন মারা যায় সেদিন ও আপনারা ঝগড়া করেছিলেন, আমি জানতে চাচ্ছি এরকম কি প্রায় এ হতো?’
‘ছোট খাটো ঝগড়া সব সময় লেগে থাকতো সেটা বলতে পারেন। সেটা তো সব ঘরেই হয়।’
‘আপনি কি বলবেন যেদিন উনি মারা গেল সেদিন সাধারণ থেকে ঝগড়ার মাত্রা বেশি ছিল?’
‘জী না।’
‘আপনি ভেবে বলছেন তো?’
'জী।’
লোকটার কথায় ভরসা পেলো না অকিল। আবার প্রশ্ন করল, ‘আপনার প্রয়াত স্ত্রী এর বাবা বাড়ি কোথায়?’
‘অষ্টগ্রাম।’
‘আচ্ছা জাবেদ সাহেব আপনার বউ কি কোনো অস্বাভাবিক আচরণ করতেন?’
‘জী না, তবে ঘুমের মাঝে মাঝে মধ্যে চিৎকার করত।’
‘সব সময় মন খারাপ বা উদাসীন থাকতো?’
‘উদাসীন এর কথা বলতে পারব না, আমি ঘরে এসে সব সময় দেখতাম সে রান্না করে রেখেছে, টাকা পয়সা এর ভালো হিসাব ছিল, বাসা বাড়ি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকত, আমার বাবা মা এর ভীষণ সেবা করতো, আমার মেয়ের খুব ভালো যত্ন নিতো। সুতরাং উদাসীন ছিল বলে যাবে না। তবে তার মন প্রায় ই খারাপ থাকতো। হটাৎ হটাৎ রেগে যেতো।’
অকিল মনে মনে ঠিক করল উনার বউ এর বাড়ি যাওয়াটা জরুরী এবং কাল ই যাবে বলে ঠিক করল। জাবেদ সাহেব ক্লান্ত তিনি চলে গেলেন।
আট
অকিল ঠিক করল আজকে সারা রাত ও মেয়েটাকে পর্যবেক্ষণে রাখবে। সাথে করে কিছু জিনিস নিয়ে এসেছে অকিল। একটা রেকর্ডার, সাথে বেশ কয়েকটা ব্ল্যাংক টেপ। অকিলকে একা থাকতে দিতে রাজি নয় সাগর। রীতিমত ভয় পাচ্ছে ও। নয় বছরের একটা মেয়ে পুরো গ্রামশুদ্ধ মানুষ তাকে ভয় পাচ্ছে ব্যাপারটা একই সাথে খুব উদ্ভট আর কষ্টের মনে হলো অকিলের।
গ্রামের বাড়িতে রাত ১০টা অনেক রাত, অকিলের সাথে রীতির রুমেই বসে আছে সাগর। রীতির জন্যে আলাদা একটা রুমের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সাধারণত নিয়ম করে রুমে এক-দু জন মানুষ থাকে। চোখ দুটো বড় বড় করে একটা উপন্যাস পড়ছে সাগর। পায়চারি করলে ওর মাথা ভালো কাজ করে, অকিল তাই রুমে পায়চারি করছে। আর একটু পরপর রীতির পালস চেক করছে, মিনিটে কয়বার শ্বাস নিচ্ছে তাও দেখছে।
রাত ১২টা পর্যন্ত তেমন কিছু হলো না। ১২টার পর হঠাৎ দেখা গেল রীতি একটু নড়াচড়া করছে। সাগরও খেয়াল করল ব্যাপারটা। বইটা পাশের চেয়ারের হাতলে রেখে উঠে বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালো ও।
‘বন্ধু জেগে উঠবে নাকি? নাকি ঘুমের মাঝে সব কিছু খাওয়া শুরু করবে? ভয় লাগছে বন্ধু কি করব?’
‘পর্যবেক্ষণ বন্ধু, এই মূহুর্তটির জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।’
‘বন্ধু মানুষজন ডাকব?’
সাগরের কথা শুনল, নাকি পাত্তা দিল না অকিল, বোঝা গেল না। রীতির হাত ধরে ওর পালস দেখছে অকিল। মেয়েটার নড়াচড়া বাড়ছে। একটা গোঙ্গানির শব্দ আসছে ওর গলা দিয়ে। অ অ প্রথমে চিকন তার পর সেটা মোটা হচ্ছে। এভাবে মিনিট তিনেক চলল। একটু পর খেয়াল করল গোঙ্গানোর শব্দ বদলে গেছে মেয়েটার। রীতি পায়জামা এর নিচে হাত ঢুকিয়ে দিল। এবার মুখের ভঙ্গি সম্পূর্ণ পাল্টে গেল রীতির। কোমলমতি ৯ বছরের বাচ্চাটাকে এখন একজন পূর্ণ বয়স্ক যুবতী মনে হচ্ছে। রীতির মুখে আস্তে আস্তে হাসি ফুটে উঠল। চোখ দুটো এখনো বন্ধ আছে। আস্তে আস্তে হাতটা নিচে নেমে যাচ্ছে। পরিস্থিতি দেখে সাগর বা অকিল কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না। দুজনই লজ্জায় পড়ে গেছে। রীতির হাতটা পায়জামার ভেতর চলে গেল এবার মুখের ভাষা আরো পরিবর্তন হলো। হাসিটা এবার কঠোর হচ্ছে। ঠোঁট দুটো ফাকা হয়ে গেছে।
যেভাবে হঠাৎ শুরু হয়েছিল সব কিছু সেভাবেই থেমে গেল সব কিছু। নিস্তব্ধ নীরবতা। গোঙ্গানিটা এখন আর নেই। সাগরকে টান দিয়ে একটু দূরে এল অকিল। কিছুক্ষণের মাঝে দেখল মেয়েটা উঠে বসছে। তার চোখ আধো খোলা আধো বন্ধ। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে মেয়েটা ঘুমাচ্ছে। একটা তন্দ্রার একটা আবেশের মাঝে আছে। সেভাবেই উঠে দাঁড়াল রীতি। উঠে বেশ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো। যে কেউ দেখলে ভাববে যেন একটা মূর্তি। এক দণ্ড নড়লো না। ঘাড়টা ডান দিকে একটু হেলে আছে।
এভাবে প্রায় মিনিট বিশেক কেটে গেল। তারপর ধীরে ধীরে দরজার দিকে আগাল রীতি। সাগরকে ইশারায় কিছু না করতে বলল অকিল। হাঁটতে হাঁটতে যেয়ে দরজার সাথে ধাক্কা খেল রীতি। একটা ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল মেয়েটা। তার পর একটু পিছিয়ে আবার আগাতে গেল, দরজায় রীতি আবার বাড়ি খেল। মেয়েটা এবার আবার পেছাল আবার আগাল ফলাফল একই। এবার হাত দুটো উপরে তুলে ফেলল রীতি। আস্তে আস্তে মাটিতে বসে পড়ল। বসে হঠাৎ হিংস্র পশুর মত দরজা কামড়ে ধরার চেষ্টা করল। পারল না। এর পর নিচু হয়ে গেল। কাঁচা মাটির ঘরের মেঝেতে বড় বড় থাবা দিয়ে শুরু করল মেয়েটা খুবলে মাটি তুলে খাওয়া শুরু করেছে মেয়েটা।
ঘটনাটা দেখে সাগরের পা দুটো কাঁপছে রীতিমত। অকিল সাগরের দিকে তাকিয়ে দেখল সাগর দু হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে আছে। ওর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। অকিলের দিকে চোখাচোখি হতেই সাগরের চোখে পরিষ্কার ভয় লক্ষ করল অকিল। ওর নিজেরও যে খুব একটা সুবিধের ঠেকছে পরিস্থিতি তা নয়। আর বসে থাকা যায় না। পাশেই টেবিলে এক ডজন কলা আর এক ঝুড়ি গুঁড়ের পিঠা। অকিল খুব ধীর গতিতে সেগুলো নিয়ে এল। আসতে আসতে একটা কলা ছুলে মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে দিল। মেয়েটা লক্ষ করল না। অকিল বুঝতে পারল ও ভুল করছে ঘুমে মানুষ দেখে না কিছু। ও একটা কলা ছুলে মেয়েটার হাতে গুঁজে দেয়ার চেষ্টা করল। কলাটা মাটিতে পড়ে গেল কি করবে বুঝতে পরছে না ও। পরে যেখানের মাটি খুবলে তুলছিল মেয়েটা সেখানে পিঠার ঝুড়িটা রেখে দিল।
এতে কাজ হলো, মেয়েটা গোগ্রাসে পিঠাগুলো মুখে ঠেসে ধরছে। মুখ ভর্তি পিঠা গিলতে পারছেনা মেয়েটা তবু যেতে যেতে ঢোকাচ্ছে মুখে। আঙ্গুল দিয়ে মানুষকে ডাকতে ইশারা করল অকিল। সাগর খুব সন্তর্পণে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। অকিলের খালা, দাদা আর বাবাকে নিয়ে এল সাগর। এক ঝুড়ি পিঠা ১০ মিনিটে নিজের চোখে শেষ হয়ে যেতে দেখল অকিল। মেয়েটার বয়স মাত্র নয় বছর এতগুলো পিঠা সামলাতে পারবে কিনা ভাবছে অকিল।
পিঠাগুলো শেষ হওয়ার সাথে সাথে মেয়েটাকে পেছন থেকে ধরে বিছানার দিকে নিয়ে যেতে ইঙ্গিত দিল অকিল। রীতির খালা সেই চেষ্টা করে পারলেন না। মেয়েটা এখন অনেক জোরে জোরে চিৎকার করছে। ‘মমিন, তোরে ছাড়ব না। তোকে ছাড়ব না মমিন্নার বাচ্চা। আমার মা কে ফেরত দে কুত্তার বাচ্চা।’
রীতির খালা পারলেন না। শেষে ওর বাবা ওকে পেছন থেকে ধরে ফেলল ওর দাদা ওর দুই পা ধরে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিল। ওদিকে চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুনে আরো কয়েক জন মহিলা উঠে এলো। ওদিকে অকিল দেখল সাগর দোয়া দরুদ পড়া শুরু করেছে। রীতির দাদাও তাই শুরু করল। রীতির খালা ধরতে যেয়ে ঘুষি খেয়েছে তার ঠোঁট কেটে রক্ত পড়ছে। অনেকক্ষণ ধরে রাখায় আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে আসল। অকিল জগ থেকে পানি নিয়ে রীতির মুখে শুয়ে থাকা অবস্থাতেই ঢেলে দিল। অনেক তৃষ্ণার্ত মানুষের মতো টানা তিন দুই গ্লাস পানি খেয়ে গেল। দিলে হয়তো আরো খেত, কিন্তু অকিল আর দিল না।
নয়
সেদিন রাতের পর সোজা জাবেদ সাহেবের বউ এর বাড়ি হয়ে ঢাকায় চলে এলো অকিল। জাবেদ সাহেবের স্ত্রীর নাম রিশিতা। রিশিতাদের বাড়ি খুঁজে পেতে বেশ কষ্ট হলো। ঐ নামে রিশিতাকে খুব কম মানুষ জানে বলে মনে হলো। নিশ্চয় অন্য কোনো ডাক নাম আছে এটা প্রথমে ভাবলেও পরে রিশিতার ভাই জানালেন ওর নাম রিশিতা বেগম। আর কোনো ডাক নাম নাই। তাহলে মানুষ কেন তাকে ঐ নামে চিনে না বোঝা গেলো না।
ঢাকার পল্টনে একটা হোটেলে উঠেছে অকিল। কিছু জিনিষের লিস্ট করে ফেললো ও ভুলে যাবার আগেই। রিশিতারা এক ভাই এক বোন। ওদের বয়সের পার্থক্য দুই বছর, ভাইটি বড়। রিশিতার ছবিতে তাকে খুব ডিপ্রেসড দেখাচ্ছে। (নোট: ছবিতে অন্তত আমরা হাসি খুশি থাকি, তার মানে এটা বলাই যায় রিশিতার চূড়ান্ত রকম ডিপ্রেশন ছিল)। অকিলের এই যুক্তি তার ভাইও সমর্থন দিল। রিশিতার বাবা মা কেউ বেঁচে নেই, বিয়ের দুই বছরের মাঝে দুজনই মারা যান। রিশিতার বংশে মানসিক সমস্যা বা জিনে ভুতে ধরার কোনো রেকর্ড পাওয়া গেল না। রিশিতার বাবার বংশেও এমন কোনো রেকর্ড পাওয়া যায় নাই।
ছোটবেলায় রিশিতা অনেক বই পড়ত। সাধারণত সব বাংলা উপন্যাস যেমন রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ এগুলা। বেশ কিছু ইংরেজি বইও পাওয়া গেল, ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং লাগল অকিলের কাছে। এই অজ-পাড়া গাঁ যে জেন অস্টিন, শেক্সপিয়ার, শার্লক এর ইংরেজি অরিজিনাল বই পাবে কখনো ভাবেনি অকিল। এমন কি ডাক্তারি বিদ্যার কিছু বইও পেয়েছে অকিল। সব গুলোই আসল বই এবং অনেক পুরানো বই। বেশ অবাক হলো অকিল, ওর ভাই কে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল উনার বাবা ইংরেজি এর শিক্ষক ছিলেন, পূর্ব পুরুষের রেখে যাওয়া বেশ সম্পত্তি থাকায় ওদের আর্থিক অবস্থা ভালোই ছিল।
মেয়েকে উনি পড়ালেখার জন্যে দার্জিলিং পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু ওখানে আর পড়ালেখা করা হয়নি ওর। দুই বছর পর ওর বোন চলে আসে। পাহাড়ি এলাকায় পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছিল মেয়েটা। যদিও ওর ভাই এর মতে ব্যথাটা কোনো গুরুতর কিছু না, শরীরে সামান্য ছাল চামড়া গিয়েছিল। কোনো হাড় ভাঙ্গা বা মাথায় আঘাত তেমন কিছুই না। এর পর দেশে থেকেই অনার্স পাস করে ওর বোন। এর পরপরই জাবেদ সাহেবের সাথে বিয়ে হয়। বিয়েটা ওর বাবা মা এর ইচ্ছাতেই হয়। বোনের মতামত ছিল কিনা জানতে চাইলে রিশিতার ভাই তেমন কিছু বলতে পারল না।
আরো একটা জিনিস জানা গেল তা হলো রিশিতার পড়ালেখার প্রতি ঝোঁক বিশেষ করে গল্প উপন্যাস এমন কি মেডিক্যাল আর বোটানি এর বই এর উপর বেশ আগ্রহ ছিল। রিশিতার বিয়ের পরপর একবার অনেক বড় একটা ঘূর্ণিঝড়ে অনেক বই নাকি নষ্ট হয়ে গেছে। প্রায় তিনশো এর উপর বই ছিল। অকিল যা দেখে এসেছে তাতে বোঝা যায় প্রায় একশো এরমত বই এখনো টিকে আছে। ডাক্তারি বইগুলির মাঝে একটা ইংল্যান্ড আর একটা কলকাতার লাইব্রেরি এর সিল দেওয়া।
বইগুলোর নাম যথাক্রমে:
১. Hallucinations or, the rational history of apparitions, visions, dreams, ecstasy, magnetism, and somnambulism - Brierre de Boismont, Alexandre-Jacques-François
২. Comprehensive Textbook of Psychiatry, II, Volume 2 - Alfred M. Freedman, Harold I. Kaplan, Benjamin J. Sadock
অকিলের একটা বিশাল সমস্যা হলো যেকোনো বই পড়ার আগে ভীষণ নার্ভাস লাগে আর বইগুলো যদি হয় মেডিক্যাল বই তাহলে তো কথাই নাই। অকিল বইগুলো সযত্নে ওর ব্যাগে গুছিয়ে রেখে দিল।
পল্টনে দেশের বাইরে ফোন করা যায় এমন একটা দোকান খুঁজে বের করল অকিল, অস্ট্রেলিয়া এর সেই ডাক্তার কে পাওয়া গেল না আরো দুঃখের বিষয় সেই হাসপাতালের এক নার্স ওর পরিচিত ছিল তাকেও পাওয়া গেল না। দুইজনকেই একসাথে না পাওয়া যাওয়া খুবই রহস্যজনক ঠেকলো অকিলের কাছে। কোথায় গেছে তাদের কবে পাওয়া যাবে তাও বুঝা গেল না। শুধু এটুকু জানা গেল যে ডাক্তার প্যারিসে বেড়াতে গেছে। যা বুঝার বুঝে গেল অকিল। নিশ্চয় ডাক্তার বেটা সেই নার্সকে বিয়ে করে এখন মধুচন্দ্রিমায় ব্যস্ত আছে। ওদের জন্যে অকিলের খুব ভালো লাগলেও ওর সমস্যার সমাধানের কোনো কুল কিনারা পেল না ও।
ওদিকে দেশের নামকরা ডাক্তারদের দেখা পাচ্ছে না ও। তাদের সময়ই নেই। অনেক কষ্টে শিষ্টে ওর সাথে এক বাঙালি থাকত যার বাবা এখানকার এমপি। এমপির ছেলেকে বলে তার বাবাকে দিয়ে এক নামকরা ডাক্তারের কাছে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া গেল।
ডাক্তারের চেম্বারটা ধানমন্ডি আট নম্বরে। ঢাকা শহর চেনে না অকিল। এর আগে মাত্র একবার এসেছে ও ঢাকায় তাও সেটা ছয় বছর আগে তাই ডাক্তারের চেম্বার খুঁজে পেতে খুব কষ্ট হয়ে গেল অকিলের। ডাক্তার সাহেবের মাথায় ঝাঁকড়া চুল, উনি একটা পাঞ্জাবি পড়ে আছেন। উনাকে দেখলে মনে হয় উনার শরীর দিয়ে তেল বেয়ে পড়ছে। চেহারা কেমন জানি অদ্ভুত। চেম্বারে সেই পরিচিত ডেটল বা স্যাভলন কিছু একটা হবে তার গন্ধ।
‘জী বলুন কি সমস্যা।’
‘স্যার, সমস্যা টা আমার না, আমার এক পরিচিতের।’
‘রোগী কোথায় ভেতরে নিয়ে আসুন।’
‘স্যার রোগী তো ঘুমিয়ে আছে, তাই আনা যায় নি, সে গ্রামে থাকে।’
ডাক্তারের মুখটা এবার কাল হয়ে গেল, তার চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে গেল। তিনি একটা কলিংবেল টিপলেন। ভেতর থেকে দৌড়ে একজন পিয়ন ঢুকল ডাক্তার এর চেম্বারে। ‘এই এটার সাথে কেউ এসেছে?’
‘স্যার জী না স্যার।’
এবার অকিলের অবাক হওয়ার পালা, কিন্তু কিছুক্ষণের মাঝে ও ব্যাপারটা বুঝতে পারল। অকিল ডাক্তারকে বলল, ‘সার আপনে আমাকে পাগল ভাবছেন বেপারটা একদম ই নিছক ভুল বুঝাবুঝি। আমি যে রুগী হয়ে এখানে এসেছি সে গত দুই মাস উনিশ দিন ঘুমাচ্ছে। তাই আমি আপনাকে বলছি রুগী ঘুমচ্ছে।’
এবার অবাক হওয়ার পালা ডাক্তারের, তিনি হলেন। ‘দুই মাস উনিশ দিন ধরে ঘুমাচ্ছে? আপনে আমার সাথে ফাজলামো করেন?’
কথাটা শুনে মোটেই অবাক হলো না অকিল। ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসলো অকিল। প্রচণ্ড শীতে কাঁপছে ও। রাত এখন আটটা বাজে। ঢাকার রাজপথে যেন বৃষ্টির মতো কুয়াশা পড়ছে। কাঁপতে কাঁপতে যেয়ে একটা টং এর দোকানে ঢুকল অকিল। ‘চাচা চা তো হবে না?’
‘হ বাবা কেন হবে না অবশ্যই হবে।’
‘চাচা অদা দেন চিনি দিয়েন অল্প করে, এই ধরেন আধা চামচ চিনি।’
কিছুক্ষণের মাঝেই চা এল। অকিল এক কাপ চা ই অনেকক্ষণ ধরে খেল। আজ পথে ঘাটে মানুষ নেই। সম্ভবত প্রচণ্ড শীতের কারণে মানুষ খুব জরুরী কিছু না হলে বের হচ্ছে না। অকিলের মাথায় কিছু ঢুকছে না। কি করা যায় কই যাওয়া যায়। এসব ভাবতে ভাবতে ও চা ওয়ালাকে বলল, ‘চাচা আপনাকে একটা প্রশ্ন করতাম, কিন্তু যে প্রশ্ন টা করতে চাচ্ছি সেটা মানুষ কে করা অভদ্রতা, তাই আপনার কাছে অনুমতি চেয়ে নিচ্ছি। আপনি অনুমতি দিলে আমি জিজ্ঞেস করব।’
চাচা মিয়া কিছুটা অবাক হলেন। জীবনে তাকে কেউ এত সম্মান করে নাই। তার নিজের কাছে খুব ভালো লাগল ব্যাপারটা। একজন মানুষ তাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবে তার জন্য অনুমতি চাইছে। ‘বাবা নির্দ্বিধায় করতে পার।’
‘চাচা আপনে সারা দিনে কত টাকা রোজগার করেন?’
চাচা বেশ অবাক হলেন এটা জিজ্ঞেস করার জন্য অনুমতি নিল? ‘বাবা দিনে প্রায় দুইশ টাকার মত রোজগার হয়। হেয়ানে ধর আশি টাকার মত লাভ হয়। এই আরকি।’
‘চাচা আপনাকে আমি দিনে তিন শত টাকা করে দিব। তিন বেলা খাওয়াব। আপনে আগামী এক সপ্তাহ আমার সাথে থাকবেন। আমারে চা করে খাওয়াবেন। চা এর চা পাতি, চিনি আর যা লাগে সবই আমি দিব কি বলেন?’
এবার চাচা বেশ অবাক হলেন বলে কি? এ তো পুরা চা খোর। উনার রাজি না হওয়া কোনো কারণ দেখলেন না। অকিল চাচাকে নিয়ে রওনা হলেন।
আজ সকাল থেকে প্রথম বইটা নিয়ে বসেছে অকিল। বেশ ইন্টারেস্টিং বই। অনেক কিছুই ও বুঝতে পারছে না। যখন বুঝতে পারছে না মেডিকেল রিলেটেড টার্মিনলজির ডিকশনারি দেখছে। তিন চার রকমের ডিকশনারি নিয়ে বসেছে অকিল। এক একটা পাতা শেষ হতে অনেক সময় লাগছে। ও বুঝতে পারল এভাবে পড়ে গেলে হবে না। একটা বুদ্ধি করল ও। পুরো বইটা না পড়ে ঠিক করল দ্রুত ওয়ার্ডগুলোতে চোখ বুলিয়ে যাবে। কোথাও কোনো ইন্টারেস্টিং কিছু পেলে আগে পিছে পড়ে দেখবে।
অকিল ধারনা করছে রিশিতারও তার মেয়ের মত একই সমস্যা ছিল। আকিলের মতে রোগটা বংশগত। আর তাই হয়তো রিশিতা বইগুলো আনিয়েছিল তার রোগ সম্পর্কে পড়ালেখা করতে। তবে এই বইগুলোতেই যে কিছু পাওয়া যাবে তার কোনো গ্যারান্টি নাই। অকিল নিজে এমন অদ্ভুত রোগের কথা শুনে নাই। এমন কি যে বিখ্যাত ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল অকিল সে পর্যন্ত কিছু জানে না এই সম্পর্কে। রিশিতা এই বিষয়ে যদি কোনো বই যদি কখনো পেয়েও থাকে হয়তো ঘূর্ণিঝড়ে সেই বইগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। আবার হতে পারে এই বইগুলোতে কিছু আছে যা ওকে সাহায্য করবে।
টানা সাত ঘণ্টায় বইটা ঘাটার পর অকিল ভাবল আর শরীরে কুলোচ্ছে না একটু বিশ্রাম খাওয়া দাওয়া দরকার। এদিকে চা ওয়ালা চাচাও হাঁপিয়ে উঠেছেন, গত সাত ঘণ্টায় উনি প্রায় ৪০ কাপ চা আনিয়েছেন। অকিলের ক্ষুধা নাই, থাকার কথা না। এত চা খেলে কারো ক্ষুধা থাকে না। অকিল স্নান করে আসল। এসে কিছুক্ষণ আজকের দিনের পত্রিকা কিছুক্ষণ ঘাটাঘাটি করল।
তার পর পিজি হাসপাতালের লাইব্রেরিতে কতক্ষণ সময় কাটাল। নিউরোলজি আর ঘুম রিলেটেড সমস্যার কিছু বই খুঁজে বের করল। সেই বইগুলো থেকে লেখকদের নাম যোগাযোগ এর ঠিকানা বের করল। যোগাযোগ করে পাবলিশারদের ঠিকানা পাওয়া গেল। দুটো পাবলিশারের ফোন নাম্বার দেয়া আছে। তাদের অকিল ফোন করে রাইটারদের চিঠি পাঠানোর ঠিকানা চেয়ে নিল। এক জনের টা পাওয়া গেল আরেকজনের তা দিতে অস্বীকৃতি জানাল পাবলিশার।
হোটেলে ফিরে এসে অকিল খুব মনোযোগ দিয়ে মোট ৫ টা চিঠি লিখল। একই কথা সব চিঠিতে। পল্টনের এই হোটেলের ঠিকানায় যোগাযোগ করতে বলল। চিঠি টা নিম্নরূপ:
জনাব, প্রথমেই ধন্যবাদ আমার চিঠি পড়ার জন্য সময় বের করার জন্য। আমি জানি আপনি খুব ব্যস্ত মানুষ তাই কাজের কথায় যাচ্ছি সরাসরি। আমি বাংলাদেশের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দা। আমাদের এলাকায় একটি ৯ বছরের মেয়ে গত ২ মাস ১৯ দিন ধরে ঘুমাচ্ছে। সে মাঝে মধ্যে তার বাথরুম ও খাওয়া-দাওয়ার প্রয়োজনে আধো ঘুম আধো জাগা একটা অবস্থায় পৌঁছায় সেই স্টেটে সে সামনে যা পায় খাওয়ার চেষ্টা করে, ঘুমের সময় তার পাল্স কমে যায়, যতক্ষণ ঘুমে থাকে সে স্বপ্ন দেখে, আক্রমণাত্মক ব্যবহার করে, তার যৌন কামনা বেড়ে যায় এবং তা প্রকাশ করে, মেয়েটি মাঝে মধ্যে চিৎকার করে। গত দুই মাস উনিশ দিনের আগে আরো চার মাস আগে সে মোট ছয় দিন এভাবে কাটায় তার পর হঠাৎ এদিন সে সম্পূর্ণ ভাল মানুষের মত আচার আচরণ করে। মজার বিষয় গত ছয় দিনের কোনো ঘটনা তার মনে ছিল না। আপনি বুঝতেই পারছেন আমাদের এখানে ঘুম এর বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই। তাই আমি বাধ্য হয়ে আপনার কাছে চিঠি লিখেছি আশা করছি আপনি আপনার সুচিন্তিত মতামত প্রদান করবেন। আপনি চাইলে আমার কাছে আপনার কনসালটেশন ফি চেয়ে পাঠাতে পারেন। আমি আপনার দ্রুত উত্তরের অপেক্ষায় থাকব। অকিল
দশ
দুটো বই শেষ করতে অকিলের মোট ৯ দিন সময় লেগে গেল। চা ওয়ালা চাচা ২ দিন কাজ করে অকিলের কাছে ক্ষমা চেয়ে ফিরে গেলেন। ৯ দিন পর যখন অকিল বইটা শেষ করে দাঁড়াল তখন ওর মাথা ঘুরছে। অকিলের মনে হচ্ছে ওর ওজন কম পক্ষে ৫ কেজি কমে গেছে। গত দুই দিনে অকিল বাথরুম ব্রেক ছাড়া আর কোনো কারণে উঠে নি। শরীর ভীষণ খারাপ লাগছে ওর। কিছু খাওয়া দরকার। রুমের কলিং বেল টিপে রুম বয়কে ডেকে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতে বলল অকিল। খাবার দেয়ার সময় ওর কোনো চিঠি এসেছে কিনা খোঁজ নেয়ার কথা বলল।
রুম বয়টা চলে যাওয়ার পর অকিল ভাবল স্নানটা করে নিলে কেমন হয় এর মাঝে। অকিল বাথরুমের দরজার সামনে ঠিক তখন ওর মাথাটা ঘুরে উঠল। হঠাৎ দেখল পুরো পৃথিবীটা দুলছে। বাথরুমের দরজার হ্যান্ডল ধরে ব্যালেন্স করতে চাইল পারল না হঠাৎ মনে হলো বাথরুমটা দূরে চলে গেল। তার পর খেয়াল করল ওর চোখ দুটো সাদা লাইটে ভরে গেল। তার পর সব হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেল।
অদিকে হোটেল বয় খাবার নিতে এসে অকিলের রুম ধাক্কাধাক্কি করে ভাবল রুমের চাবি এনে খাবার ভেতরে দিয়ে যাই, নিশ্চয় কোথাও গেছে চলে আসবে। রুমের চাবি খুলে ছেলেটা দেখল অকিল অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে পুরো রুম রক্তের বন্যায় যেন ভেসে গেছে।
জ্ঞান হারানোর ৩ দিন পর জ্ঞান ফিরল অকিলের। জ্ঞান ফেরার পর দেখল সাগর ওর দিকে উপুড় হয়ে তাকিয়ে আছে। ‘কিরে, বেচে আছিস তাহলে!’
পরিচিত কণ্ঠ শুনতে পেয়ে বেশ ভালো লাগল অকিলের। মলিন একটা হাসি দিল ও। কথা বলতে যেয়ে আবিষ্কার করল মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা কথা বলতে গেলে সেটা আরো লাগে। ‘অত সহজে মরে যাব? তোর মেয়ের সমস্যা টা সমাধান করতে হবে না?’
কথাটা শুনে সাগরের মুখটা কাল হয়ে গেল। সাগর ওর কাঁধের এদিকে ওদিকে তাকাল। ‘বলছিস কি তুই, মানে …’
আমতা আমতা করল সাগর। অকিল ওর হাতটা সাগরের হাতে রেখে বলল, ‘বন্ধু ব্যাপার না, আমার হাতের স্যালাইন টা খুলে দিতে বলবি?’
‘স্যালাইন খুলবি? মানে….’ সাগরের শক টা এখনো কাটে নি।
অদিকে জ্ঞান ফিরেছে শুনে দু জন নার্স দৌড়ে এসেছে। অকিলের চোখে লাইট দিয়ে পরীক্ষা করল। একটু পর ডাক্তার এলেন। ‘কি ভাই ব্যাপার টা কি বলেন তো? অজ্ঞান হওয়ার আগে কয় দিন না খেয়ে ছিলেন?’
ইয়ং ডাক্তারের কথা শুনে একটু হাসল অকিল। মেয়েটা দেখতে বেশ সুন্দর। মাথার চুল ছেলেদের মত কাটা। বড় চুলে ঝামেলা হয় হয়তো তাই এভাবে কাটা। কিন্তু বেশ লাগছে, খারাপ লাগছে না। দেখেতে মাঝারি গড়নের শ্যামলা। মেয়েটার কথার মাঝে একটু দুষ্টুমি ভাব আছে। হেসে হেসে কথা বলছে। হাসিটা বেশ। কাল রঙের একটা শাড়ি তার উপর সাদা এপ্রন বেশ ভালোই লাগছে।
‘ম্যডাম, কবে যেতে পাড়ব বলেন তো?’
‘ওমা সে কি, পুলিশ ভাই, আপনার বন্ধুর বোধয় আমাকে একদম পছন্দ হয় নি তাই না? যেই আমি এসে কথা বল্লাম অমনি বলে কবে যেতে পারবে। এই আমি কি দেখতে এত পচা নাকি?’
মেয়েটা কথা ও বলে এত সুন্দর করে, মনে মনে ভাবল অকিল। মাথার ব্যথাটা এখন বেমালুম চলে গেছে, কিন্তু বুকের বাম দিকে একটা ব্যথা অনুভব করল অকিল। সাথে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস। তার কিছুক্ষণ পর অকিল ভাবল মানুষের হার্ট তো আসলে বাম দিকে থাকে না, হার্ট টা আসলে মাঝা মাঝে একটা অবস্থানে থাকে, দুই ফুসফুসের মাঝে। তাহলে বুকের বাম দিকে কেন মানুষ বলে? আবার বাম দিকেই কেন ব্যথাটা লাগল? নাহ মেয়েটাকে আসলে অসম্ভব মনে ধরেছে।
অকিলকে আরো দুই দিন হাসপাতালে থাকতে হলো। শেষ দিন সেই ডাক্তার মেয়েটাকে কোথাও খুঁজে পেল না অকিল। অন্তত শেষ দেখাটা হোক আশা করেছিল সেটাও হলো না। তাই অকিলের মন ভীষণ খারাপ, মন খারাপ করে গ্রামের বাড়ি রওনা দিল। মন খারাপের আরেকটা কারণ হোটেলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ওর নামে কোনো চিঠির উত্তর আসে নি। ১৪ দিনে যখন কোনো উত্তর আসে নি আর আসবে না বলেই মনে হচ্ছে অকিলের। আর্জেন্ট চিঠি পাঠিয়েছিল যেতে সর্বোচ্চ তিন দিন লেগেছে এর বেশি নয় আসতে না হয় ১০ দিন লাগল তাও তো হয় না।
গ্রামের বাড়ি পৌছুতে প্রায় সারাদিনই লেগে গেল রাত ৮ টা নাগাদ পৌঁছুল অকিল।
এগারো
পরদিন ভোর বেলায় সাগর আর অকিল রওনা দিল রীতিদের গ্রামে। আজকে কুয়াশা নেই বললেই চলে। পানি অস্বাভাবিক রকম শান্ত। যেন নড়ছেই না। নৌকাটা তাই দোলও খাচ্ছে না।
‘বন্ধু তুই জানলি কি করে বললি না তো?’
হাসপাতালে এই নিয়ে কথা হওয়ার পর আর কথা হয় নি অকিলের সাথে সাগরের। লজ্জায় হয়তো কথাটা আর তুলে নি সাগর।
‘বন্ধু, তুই যখন জিজ্ঞেস করছিস তাই বলি, তবে জেনে রাখ আমি তোকে কোনো খারাপ চোখে দেখছি তা না। রীতি যে তোর মেয়ে সেটা বুঝেছি বেশ কয়েকটা কারণে। প্রথমে আমি বুঝেছি ওটা জাবেদ সাহেবের মেয়ে না। এখন প্রশ্ন হল কি করে বুঝলাম। এক, এদের চেহারায় মিল নেই। এখন কথা হল চেহারায় মিল না থাকতেই পারে এটা কোনো বড় ব্যাপার না। তাহলে আসি দুই নম্বর পয়েন্ট এ। আমি যখন রীতির পাল্স দেখলেম তখন খেয়াল করলাম রীতির বাম হাতের কানি আঙ্গুল টা একটু বাঁকা। আমি যখন ওর হাত টা বিছানায় রেখে দিলাম পাল্স দেখে তখন খেয়াল করলাম জিনিস টা। সমতল স্থানে রাখলে জিনিস টা খেয়াল হয়। বাঁকা টা খুবই সামান্য তেমন কারো চোখে পড়ে না। আর তোকে তো আমি অনেক দিন চিনি তোর বাম হাতের কানি আঙ্গুল টা যে অমন আমি জানি।’
‘কিন্তু এতেই তো প্রমাণ হয়না আমি ওর বাবা।’
‘না না, তা তো হয় ই না, আমি আরো খেয়াল করলাম জাবেদ সাহেবের এই সমস্যা নেই। আমি তখন নিশ্চিত হলাম এটা উনার মেয়ে না। এখন তুই বলতে পারিস রিশিতার তো থাকতে পারে। আমি নিশ্চিত জানি রিশিতার এই সমস্যা নাই। ওদের বাড়ি যখন যাই আমি ওদের ফ্যামিলি ছবি দেখেছি ওর ভাই কে জিজ্ঞেস করেছি। এখন তুই বলবি ঠিক আছে বাচ্চা টা জাবেদ সাহেবের না কিন্তু তোর কিভাবে বুঝলাম। তাই তো?’
‘হু।’ বেশ চিন্তিত দেখাল সাগর কে।
‘সেদিন রাতে তোর মানিব্যাগ টা পড়ে গিয়েছিল বিড়ি বের করতে যেয়ে মনে আছে?’
‘যাহ শালা এখানেই ধরা খেয়ে গেলাম।’
‘মানিব্যাগ এর ঐ ছবিটা তো রীতির ছোটবেলার তাই না?’
‘হু।’
‘রীতির ছোট বেলার একটা ছবি ওর মা এর বাড়ি যেয়ে ওদের পারিবারিক এ্যালবাম এ দেখি তার পরও সব কিছু মিলে নি। আমি তখনো ভাবি নি রীতি তোর মেয়ে কিন্তু এটা ভেবেছি জাবেদ সাহেবের মেয়ে না। বিশ্বাস করবি না যখন অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাচ্ছিলাম তখন বিদ্যুৎ খেলে গেল যেন মাথায় অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে গেল। আর যখন জ্ঞান ফিরল মনে হল আমি সব জানি। এরকম হয় ব্যাপারটার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে। আচ্ছা ছবিটা কি রিশতাই দিয়েছিল?’
‘হু, অনেক চেয়ে টেয়ে আমি ঐ ছবিটা আদায় করেছিলাম রিশিতার কাছ থেকে, ওকে আমি খুব ভালবাসতাম জানিস? বাবা মা এর কথা রাখতে যেয়ে ও জাবেদ কে বিয়ে করে। রিশিতা আমার চেয়ে বয়সে ৪-৫ বছরের বড় হবে। তাই ওর বাবা মা বিয়েটাতে রাজি হয় নি।’
‘তোদের ব্যাপার টা জানত তারা?’
‘হু।’
‘রীতি এর ব্যাপার টা জানত?’
‘নাহ।’
রীতিদের বাড়ি পৌছুতে প্রায় দুপুর হয়ে গেল। গ্রামে পাড়া দিতেই এক বৃদ্ধ চাচা দৌড়ে এলেন। ‘বাবা জ্বীনের আছর ছাড়ছে, জ্বীনের আছর ছাড়ছে। তোমারে খুজতেসে, যাও যাও জলদি যাও।’
ব্যাপারটা বেশ অবাক লাগল অকিলের। অকিলকে চেনার কথা না মেয়েটার। ঘুমের মাঝে ওকে দেখা বা নাম জানার কারণ নাই কোনো। এবং যদ্দুর ও বুঝতে পারছে ঘুমিয়ে থাকার সময় করা কিছু মেয়েটার মনে থাকে না।
রীতিদের বাসার সামনে অনেক ভিড়। অকিল আর সাগর সেই ঘরে ঢুকল। রীতি বসে আছে। সে একটা নতুন একটা জামা পড়েছে। সেটা সবাই দেখাচ্ছে। অকিলকে দেখে মেয়েটা চুপ হয়ে গেল। ‘মা, তুমি আমাকে খুঁজেছ?’
আশে পাশের মানুষের দিকে তাকাল মেয়েটা, যেন বলতে চাইছে না কথা এতগুলো মানুষের সামনে। বুঝতে পারল ব্যাপারটা অকিল। ‘মা চল আমরা ঘাট থেকে একটু ঘুরে আসি, অনেক দিন বাড়ি থেকে বের হও না। ভাল লাগবে।’
রীতির হাত ধরে গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে হাঁটছে ও আর অকিল। আজ বেশ রোদ একটু হাঁটতেই ঘেমে উঠল অকিল। ও চাইছে মেয়েটা কথা বলতে, শুরু করুক কিছু নিজে থেকে বলতে চাইছে না। অনেক দূর হাঁটার পর মেয়েটা এদিক ওদিক তাকাল। যেন বোঝার চেষ্টা করল কেউ শুনছে কিনা ওদের। যখন নিশ্চিত হলো তখন অকিলের দিকে তাকিয়ে ওকে কাছে আসতে বলল রীতি। অকিল হাঁটু ভাজ করে নিচু হলো। রীতি ফিস ফিস করে অকিলকে বলল, ‘আমার মা কে এনে দিবেন?’
অকিলের বুকে মোচড় দিয়ে উঠল। এতটুকু মেয়ে এত ধকলের পর শুধু মাকে চাইছে। তার আর কোনো চাওয়া নেই। চোখ দুটো টলমল করে উঠল অকিলের। ‘মা, তোমার মা তো অনেক দূরের দেশে চলে গেছে। আমরা চাইলেও যোগাযোগ করতে পারব না। কিভাবে আনি বল?’
‘মা ঢাকায়, ভুতের গালে। ঐ যে মোমিন টা আছে না? ও ভাল না। মোমিন টা মা কে নিয়ে গেছে।’
‘ভূতের গালে কি মা?’
‘ভুতের গালে, আরে আপনি বুঝেন না বুঝি। আপনি তো ঢাকা থেকে আসলেন একটু আগে।’
অকিল বেশ অবাক হলো। ‘তুমি জান? বাবা বলেছে বুঝি?’
‘না আমি জানি কেউ বলে নি, বাবা তো আপনার কাছে ছিল।’
এবার বেশ ধাক্কা খেল অকিল। সাগরের কেমন লেগেছিল এটা বলার পর ও এখন বুঝতে পারছে। মনে মনে ভাবল অকিল। ‘বলে কি! সাগর যে ওর বাবা এটা জানে মেয়ে টা? নাকি ওর জাবেদ সাহেব ঢাকায় গিয়েছিল?’
‘মা তোমার বাবা তো এখানেই ছিল, তোমাকে দেখা শোনা করল।’
কথাটা শুনে মেয়েটা তাচ্ছিল্যের সূরে বলল, ‘আপনার চিঠি গুলো আসবে না। ওদের অত টাইম নেই।’
অকিলের মাথাটা ঘুরে উঠল এবার, মাই গড। মেয়েটা এসব কি করে জানে? কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছে না ও। ‘আপনি চাইলে আমাকে আমার মা কে এনে দিতে পারেন। আমার আর কারো কাছে সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।’
কি করবে কিছু বুঝতে পারল না অকিল। ওর নিজেরই এখন এই দিনে দুপুরে ভয় ভয় লাগতে শুরু করল। মেয়েটা কি ভাবে এগুলা জানল। অকিল মেয়েটাকে নিয়ে দ্রুত গ্রামে চলে গেল। পরে সাগর আর ওর বাবাকে জিজ্ঞেস করল কেউ মেয়েটাকে ঢাকায় যাওয়ার কথা বলেছে কিনা, জানা গেল ও যে ঢাকায় গেছে মেয়েটাকে বলা হয় নি, চিঠির কথা শুধু সাগর জানত, সাগর ওর সাথেই এসেছে সুতরাং বললে অকিল জানত। এবং জাবেদ সাহেব ঢাকায় গিয়েছিলেন কিনা এটাও জিজ্ঞেস করতে ভুলল না অকিল। কিন্তু তিনি যান নি। মেয়েটাকে কি কখনো সাগর বলেছিল যে সাগর ওর বাবা? এমন প্রশ্ন করে সেটারও উত্তর পাওয়া গেল নেগেটিভ। অকিলের মাথা ঘুরছে। কি ভাবে জানে মেয়েটা।
বারো
অকিল ঠিক করল একটা মারাত্মক কাজ করতে হবে। আগে যেতে হবে মিঠামইন সদরে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার পথ। অকিল বলল মেয়েটাকে নিয়েই চলুন খুব দ্রুত যা করার করতে হবে। ওরা রওনা দিল মিঠামইনের দিকে ওর সাথে আছে জাবেদ সাহেব, সাগর, রীতি, রীতির বাবা আরো গ্রামের কিছু মুরুব্বি।
সকাল ৯টা বাজে। মিঠামইন সদরের দোকান-পাটগুলো খুলতে শুরু করেছে। সাগর ঢাকার রমনা থানায় একটা ফোন দিয়ে কিছু ইনস্ট্রাকশন দিল। আর অকিল ফোন দিল ওর বন্ধু বাবা এমপি সাহেব কে। এমপি সাহেব মাই ডিয়ার মানুষ। ছেলের বন্ধু হওয়ায় আবারো কদর করলেন এবং জানালেন কোনো সমস্যা না কাজটা হয়ে যাবে। তবে উনার কথায় অকিল খুব একটা ভরসা পেল না। কত মানুষ কে এরা এমন কত কথা দেয় কত গুলো কথা রাখে সেটাই একটা বড় বিষয়।
‘বাবা কাজ টা কি ঠিক হবে?’ জিজ্ঞেস করল রীতির দাদা।
‘চাচা কখনো কখনো অপ্রীতিকর কাজ টা করতে হয়। অপ্রীতিকর কাজ টা না করলে যখন নয় তখন তা আর দেরি করি লাভ নেই।’
মিঠামইন গোরস্থানটা হাওরের পাশেই। গ্রামের কিছু মুরুব্বি আর জাবেদ সাহেব মিলে রিশিতার কবরটা বের করা হলো। সামনে রিশিতা এর নাম ফলকটি লাগানো। অকিল বেশ কয়েকবার জিজ্ঞেস করল আপনারা নিশ্চিত তো এটাই? নাম ফলক ও তাদের স্মৃতি তাই বলে। কবরস্থানের খাতায় তো তাই লেখা দক্ষিণ পশ্চিম দিকে শেষ আইল থেকে ৩ নাম্বার আইলের ৯ নাম্বার কবর রিশিতার। সব ই মিলে যায়। জাবেদ সাহেব অনুমতি দিলেন।
কবর খোঁড়া শুরু হলো। সবার মাঝে চাপা গুঞ্জন। সাগর তার পুলিশ ড্রেস পরা। সে মোটামুটি অফিসিয়াল ভাবেই অনুমতি ম্যানেজ করেছে। যদিও অনুমতি পাওয়াটা বেশ কষ্টসাধ্য কিন্তু সে ম্যানেজ করেছে।
কবরটা খোঁড়া হচ্ছে। আস্তে আস্তে সাবলগুলো মাটির গভীরে যাচ্ছে। এক সময় সাদা কাফনের কাপড়ের এক কোনা বেরিয়ে আসতে দেখা গেল। আশেপাশে জড় হওয়া মানুষের মাঝে একটা গুঞ্জন দেখা গেল। আরো খোঁড়া হলো এবার পুরো কাপড়টা বেরিয়ে এল কিন্তু কোনো লাশ পাওয়া গেল না। এমন কি যদি ধরেও নেয়া হয় শরীরে পচে গেছে কীট পতঙ্গ খেয়ে নিয়েছে কিন্তু হাড় গোড় তো সেই কাপড়ের ভেতর থাকবে? কিচ্ছু নেই।
সবার মাঝে একটা চাপা উত্তেজনা লক্ষ করল অকিল। সাগরকে ও বলল, ‘এখানকার লোক জন কে এদিকে নিয়ে আয় আমার কথা আছে।’
‘স্যার স্যার, কি কান্ড বলেন দেখি এত বছর কাজ করি এই কবরস্থানে এমন জীবনেও শুনি নি।’
‘শুনেন নি নাকি লাশ বেঁচে দিয়েছেন?’
‘আসতাগফিরুল্লাহ স্যার। আমার আল্লাহ্ এর ভয় আছে আমর নিজেকে ও একদিন মরতে হবে। এই কবরস্থানে আমার দাফন হবে। এটাই আমার বাড়ি এটাই আমার ঘড়। আমি এই কাজ আজ করলে আমার সাথেও হবে।’
কথাগুলো বলে লোকটা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। ‘যেদিন রাতে কবর দেয়া হল সেদিন আপনি ছিলেন এখানে?’ জিজ্ঞেস করল সাগর।
‘স্যার আমি ঈদের দিনেও এখানেই থাকি আমার ঘরবাড়ি নাই পরিবার নাই।’
‘কোনো কিছু হয়েছিল কবর টায়? বলতে পারেন কিছু?’
‘স্যার তখন তেমন কিছু মনে হয় নাই কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ব্যাপার টা গুরুতর। উনাকে কবর টা দেয়া হয় ভোর চার টার দিকে। আমি যখন সকালে এলাম কবর টা ঠিক ঠাক দেয়া হয়েছে কিনা দেখলাম মাটি ঠিক মত চাপা দেয়া হয় নাই। এবড়ো থেবড়ো হয়ে আছে। উঁচা নিচা। আমি আবার যারা কবর এ কাজ করেছিল তাদের ডেকে এনে বকে ঠিক করিয়েছি।’
‘যারা কাজ করেছিল আছে কেউ?’
‘জী জী।’
দুজন লোককে ধরে নিয়ে আসা হলো। তাদের কথা মত জানা গেল তারা প্রথম বারই ঠিক মতই দিয়েছিল। এতে তাদের কোনো সন্দেহ নেই। তবে সেদিন রাতে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছিল, সেজন্যে হয়তো এটা হতে পারে। এদিকে কবরটা আবার হাওরের পাশে এদিকে প্রায়ই জমি ধ্বসে পড়ে। বেশ কিছু কবরসহ মাটি ভেঙ্গে নিয়ে গেছে স্রোতে। অকিল মনে মনে ভাবল। ব্যাপাটা ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে। লাশটাকে পাওয়া যায় নি। পাওয়া গেলে সব সমস্যার একটা উত্তর আসত। এখন আবার জানা যাচ্ছে কেউ হয়তো কবর দেয়ার পর তা খুঁড়েছে অথবা ন্যাচারাল কারণেও ডিস্টার্ব হতে পারে।
কাজগুলো করতে করতে দুপুর হয়ে গেল। রীতি কিছু খাবে না। কোনো একটি কিছু হচ্ছে সে বুঝতে পেরেছে। অকিল তার সাথে কথা বলতে গেল। ‘তুমি সব কিছু বুঝ তাই তোমাকে সত্যি কথা টাই বলছি। তোমার মা কে কবরে পাওয়া যায় নি।’
অকিলের কথা শুনে রীতি একটা হাসি দিল। ‘আপনাকে তো বলেছি মা ঢাকায়। মমিনের কাছে। বিশ্বাস হলো?’
‘মমিন কোথায় থাকে তুমি আমাকে বলবে?’
‘ঢাকায় থাকে, ভুতের গালে।’
‘ভুতের গাল কি কোনো যায়গার নাম?’
‘হু।’
‘তুমি যায়গাটা চেন?’
‘বাহ, আমি ছোটো মানুষ না? ছোট মানুষরা কি এগুলো চিনে?’
‘মমিন কে দেখলে তুমি চিনবে?’
কথাটার কোনো উত্তর দিল না রীতি, কেন দিল না বুঝতে পারছে না ও। রহস্য করছে কেন মেয়েটা? ‘মমিন কি কোনো খারাপ লোক?’
এবার মাথা নেড়ে উত্তর দিল রীতি, ‘না।’
‘আমরা তাহলে বিকেলেই ঢাকা রওনা দেই কি বল? মা কে খুঁজে বের করতে হবে তো না?’
মেয়েটার মুখে একটা হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু কি যেন আরো বলতে চায় মেয়েটার চোখ দেখে তাই মনে হচ্ছে। ‘আরো কিছু বলবে।’
‘মমিনের বাড়ি টা অনেক বড়, অনেক।’
‘বাড়ি টা তুমি দেখেছ?’
‘হু।’
‘দেখতে কেমন আমাকে বলবে?’
‘সাদা বাড়ি, অনেক বড় অনেক।’
‘পাশ দিয়ে বড় নাকি লম্বা?’
‘পাশ দিয়ে।’
‘কয় তালা বাড়ি মা বলতে পার?’
‘মনে করতে পারছি না।’
‘আশে পাশে কি আছে বলতে পার?’
‘একটা পুকুর আছে, একটা দোলনা আছে, মা দোলনায় বসে আমার কথা ভাবে।’
‘আর কিছু বলতে পারবে?’
‘না, আমার অসুস্থ লাগছে আপনি যান। আমার খুব ক্লান্ত লাগছে।’
ঢাকায় আরেকটা ফোন দিল সাগর। বিকাল চার টার দিকে ওরা ঢাকায় রওনা দিল।
তেরো
ঢাকায় এসেছে ওরা প্রায় ১ দিন। অকিল দিনে রাতে একটা সাদা বাড়ি খুঁজছে। রমনা থানায় যেয়ে ওসির সাথে কথা বলেছে। সব ঘটনা খুলে বলতে ওসি বলল, ‘আমি আমার জীবনে এত অদ্ভুত ঘটনা শুনি নি। নিশ্চয় এই মেয়ের সাথে কোনো ভাল জীন আছে। জীন টা মেয়েটাকে সাহায্য করছে।’ কথাটা বলে একটা অট্টহাসি দিলেন ওসি। পরে অবশ্য সাথে সাথে থামিয়ে দিলেন। তবে আসার পথে তিনি কথা দিলেন তার সাধ্য মত চেষ্টা করবেন। ওদিকে চা ওয়ালা সাদেককেও খুঁজে পাওয়া গেল না তার আগের জায়গায়। সাদেককে দরকার ছিল অকিলের। আবার ঢাকায় আসলে দেখা করে যাবে আর কিছু টাকা দিবে ওর মেয়েটার পড়ালেখার জন্যে কথা দিয়েছিল অকিল।
সেদিন সন্ধ্যার কথা হঠাৎ হোটেলের দরজা নক করছে কেউ। সারাদিন পরিশ্রমের পর স্নান করার জন্যে শুধু রেডি হচ্ছিল অকিল দরজা খুলে দেখল পুলিশের একজন কনস্টেবল দাঁড়িয়ে আছে। ‘স্যার, স্যার আপনাকে এখুনি থানায় যেতে বলেছে।’
‘স্নান টাই যে করি নাই মশাই, একটু বসুন? আমি স্নান টা করে আসি?’
‘স্যার দ্রুত করবেন দয়া করে আমাদের জরুরী একটা কাজ আছে। বুঝেন ই তো দেশের পরিস্থিতি ভাল না।’
দেশের রাজনৈতিক অবস্থা আসলেই ভাল না। অকিল দেরি করবে না কথা দিল। থানায় পৌছুতে পৌছুতে প্রায় রাত সাড়ে সাতটা বেজে গেল। ‘অকিল সাহেব আসুন আসুন, সাগর সাহেব বসেন। গুড নিউজ আপনার ঐ বাড়িটা পেয়েছি মনে হয়।’
‘বলেন কি!’ উত্তেজিত হয়ে উঠল সাগর।
‘জী, সেটা এক মজার ঘটনা জানেন। আমি বিকালে হাতিরপুল গিয়েছিলাম আমার বাড়ির জন্যে কিছু স্যানিটারি জিনিস কিনব বলে। আমার বাসা আবার সোবহানবাগ বুঝলেন। আপনি তো ঢাকা অত ভাল চিনেন না যাক গিয়ে। তো হল কি। আমি যাওয়ার পথে দেখলাম সেন্ট্রাল রোডো অনেক জ্যাম। তো কি করার ড্রাইভার কে বল্লাম কি করা যায় বল তো, সে বল্ল স্যর ভূতের গলি দিয়ে মেরে দিব নাকি? রাস্তাটা খারাপ কিন্তু চলে যাওয়া যাবে ঠেলিয়ে ধাক্কিয়ে। আমি রাজি হলাম হঠাৎ মাথায় খেলে গেল ভূতের গলি। আপনি ভূতের গালে ব্যাপার টা বুঝলেন না তো? ওটা ভূতের গলি, ভূতের গলি। আমাদের ঢাকায় একটা যায়গা আছে এই নামে। মেয়েটা ছোট মানুষ হয়তো বুঝেছে ভূতের গাল।’
‘মাই গড’ বলে ফিসফিস করল অকিল। ‘আর সেই বাড়ি টা পাওয়া গেল ওটা?’
‘আরে হ্যাঁ সেই পুকুর, ভূতের গলির পুকুর কে না চিনে। অপয়া একটা পুকুর। প্রতি বছর দুই তিনটা বাচ্চা নিয়ে যায় ঐ পুকুর। ওখানে গিয়ে দেখি দিব্বি দাড়িয়ে আছে সেই এক তলা সাদা বিশাল রাজকীয় বাড়ি। সে কি এলাহি কান্ড। এর বিদেশি ব্যবসায়ীর বাড়ি ঐ বাড়ি জানেন? বাড়ি তো নয় যেন রাজ প্রাসাদ। রিশিতার কথা জিজ্ঞেস করতে বল্ল আপনাকে নিয়ে যেতে। না হলে এই নিয়ে কোনো কথা বলবে না। আমি বাড়ি সার্চ করতে চাইলাম বলে সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে আসতে। এখন বুঝতেই পারছেন। এসব কারণে ওয়ারেন্ট নেয়া ঝামেলা। তাও বিদেশি মানুষ কোন আমলা, কোন মন্ত্রীর সাথে খাতির আমি পরে একটা এমবারাসিং অবস্থায়….’
‘আমরা বুঝতে পেরেছি ওসি সাহেব। আপনি অনেক উপকার করেছেন আরেকটু্ উপকার করেন। আমরা জাবেদ সাহেব আর উনার মেয়ে টাকে রেখে এসেছি হোটেলে। এখন আমরা এদিক দিয়ে যাই আপনি যদি ওদের একটু নিয়ে আসতেন কাউকে দিয়ে সেই বাড়িতে। আমার মনে হচ্ছে মেয়েটাকে আমাদের লাগবে।’
ওসি সাহেব রাজি হলেন। কালাম নামে একজন কে ডেকে কি করতে হবে বলে দিলেন আমরা রওনা দিলাম সেই রাজকীয় বাড়িতে।
চৌদ্দ
এ বাড়ি তো শুধু বাড়ি না। যেন এক রাজপ্রাসাদ। বাড়ির গেটের ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল বিশাল বড় দুটো সিংহের মূর্তি। দুই পাশে যেন তারা স্বাগত জানাচ্ছে। ‘সিংহ দিয়ে স্বাগত? বাপ রে’ বলে উঠল সাগর।
মেইন বাড়িটার আশেপাশে সুন্দর বাগান করা হয়েছে। হাসনাহেনার গন্ধে পুরো বাড়িটা মম করছে। বাড়ির ভেতরেও রাজকীয়তার ছাপ পাওয়া গেল। দেয়াল মেঝে সব মার্বেল দিয়ে খোদাই করা। ড্রয়িংরুমে অনেকগুলো ছবি দেখা গেল। অকিল মনোযোগ দিয়ে সেই ছবিগুলো দেখছিল এমন সময় ঠুক ঠুক একটা শব্দ প্রতিধ্বনি হতে শোনা গেল। বেশ কিছুক্ষণ পর দেখা গেল নাইট গাউন পড়া একজন বৃদ্ধ এসে দাঁড়িয়েছেন তার হাতে একটা লাঠি। লোকটা একটা গলা কাশি দিয়ে, ‘মি. অকিল’ কথা বলতে যেয়ে গলাটা ভেঙে আসল বৃদ্ধের। দৌড়ে তার জন্যে পানি নিয়ে এল একজন লোক। আস্তে আস্তে ধরে বসিয়ে দিল একটা সোফায়।
‘হাউ ডু ইউ ডু’ বলে সবার দিকে তাকাল যেন সবাইকেই কথাটা বলল অকিল। অকিল সরাসরি পয়েন্টে চলে এল। ‘আমরা রিশিতার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম। আপনি তো তার নানা হন তাই না?’
একটা বিশাল হাসি দিল বৃদ্ধ। ঘটনার কিছুই বুঝতে পারছে না সাগর। হচ্ছে টা কি। অকিল এসব কি বলছে রিশিতার নানা? রিশিতা বেচে আছে? মানে কি? হতাশ চোখে অকিলের দিকে তাকাল সাগর।
‘ইউ আর রাইট মাই বয়, ইউ আর। তা রিশিতা এখানে আছে তোমাকে কে বল্ল। তোমরা তো তাকে কবর দিয়ে চলে এসেছিলে।’
‘আপনি কি ডিনাই করছেন রিশিতা এখানে নেই?’
‘কি হচ্ছে আমাকে কেউ কিছু বুঝিয়ে বলবেন?’ রীতিমত চিৎকার করে উঠল সাগর।
বৃদ্ধ অকিলের দিকে তাকাল। যেন অকিলকে বলছে তুমিই বুঝিয়ে দাও। একটু হাসলেন বৃদ্ধ। অকিল বলল, ‘ইনি রিশিতার নানা। বুঝতেই পারছ রীতি আমাদের মত সাধারণ কোনো মানুষ না। রীতির একটা অসুখ আছে। মেডিক্যাল ভাষায় অসুখটার নাম “ক্লেইন লেভিন সিন্ড্রোম” পৃথিবীতে হাতে গোনা মাত্র কয়েক জনের কয়েক জন বলতে ৫-৬ জনের ও কম মানুষের এই রোগ আছে। আর এর মাঝে ৩ জনই এই বাড়িতে এখন অবস্থান করছে। সুতরাং বুঝতেই পারছ কত রেয়ার রোগ এটা। রীতির সিমটমের সাথে অলমোস্ট সব গুলো সিমটোম ই এই রোগের সাথে মিলে যায়। টানা দীর্ঘ সময় ঘুমানো, অস্বাভাবিক ক্ষুধা, যৌন চাহিদা, অস্বাভাবিক ভাবে রেগে যাওয়া মন ভাল হয়ে যাওয়া, ডিপ্রেশন সব ই মিলে যায়। এই রোগের সিমটম সব গুলো।’
‘তার মানে এখানে জীন ভূতের কিছু নেই? তাহলে এই যে রীতি, রীতি যে এসব বলছে, এই বাড়ির বর্ণনা, তোমার আমার ঢাকায় যাওয়ার কথা আমি যে ওর আসল বাবা, ওর মা যে কবরে নেই এগুলো? এগুলো ও কিভাবে জানে? এখন তুমি নিশ্চয় বলবে না এগুলো রোগের কারসাজি?’ চিৎকার করে কথাগুলো বলল সাগর।
অকিল আবার শুরু করল। ‘রীতির সাথে এই রোগের অন্য পেশেন্ট দের একটা গুরুত্বপূর্ণ তফাত আছে। আমি আগে বলে নেই রোগটা সম্পর্কে আমরা এখনো তেমন কিছুই জানি না। বুঝতেই তো পারছ মাত্র কিছু মানুষের আছে। এটা নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা হয় নি। অনেক কিছুই অজানা। তবে আমার যেটা মনে হয় রীতির ব্রেন অস্বাভাবাবিক বেশি গতিতে কাজ করে। এই জন্যে ও ক্লান্ত হয়ে যায়, আমাদের সাধারণ মানুষ থেকে অনেক বেশি ডেটা এরা প্রসেস করতে পারে। অনেক দ্রুত অনেক বড় ডিসিশন নিতে পারে। তাই ওর প্রেডিকশন ক্ষমতা বেশি। আর এর ফলে ক্লান্ত হলে আমাদের ব্রেন যা করে তা হল তার হোস্ট কে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। এমন কি আমি খেয়াল করছি। রীতি যখন ঘুমায় তখন ও স্বপ্ন দেখে। আমার ধারনা ও তোর মা এর সাথে কমিউনিকেট করতে চায়। ট্যলিপ্যাথি বলি আমরা এটাকে বিজ্ঞান এর ভাষায়। তবে ওর ট্যালিকিনিসিস আছে কিনা আমি এখনো নিশ্চিত নই। সেদিন রাতে যখন আমি একটা আর্ত-চিৎকার শুনে বাইরে এলাম এটা আমার মনে হয় রীতি করে নি। আমার মনে হয় চিৎকার টা করছিল রীতির মা। আমার মনে হয় সে এখনো ঘুমে আছে। আপনারা যেটাকে মৃত্যু ভেবেছিলেন সেটা আসলে মৃত্যু নয়। অস্বাভাবিক ভাবে হার্ট রেট কমে যায় এই রোগী গুলো ঘুমিয়ে পড়লে। অন্তত রীতি এবং তার মা এর ক্ষেত্রে তাই হয়। মনে রাখতে হবে এক একটা রোগ এক এক ভাবে এক এক জনকে প্রভাবিত করে। তবে প্রতিটি রোগ এর কিছু কমন ধর্ম থাকে। সেই কম ধর্ম গুলোই হচ্ছে দীর্ঘ সময় ঘুম, অস্বাভাবিক ক্ষুধা, যৌন চাহিদা, অস্বাভাবিক ভাবে রেগে যাওয়া মন ভাল হয়ে যাওয়া, ডিপ্রেশন। আর এই পরিবার এর ক্ষেত্রে এই সমস্যা গুলো বাদেও আলাদা কিছু লক্ষণ দেখা যায় আর সেগুলোই আমরা রীতির ব্যাপারে দেখছি।’
‘কিন্তু, কিন্তু, না না আমার এগুলো বিশ্বাস হচ্ছে না।’ চিৎকার করছে সাগর।
‘মি. সাগর, পৃথিবী খুবই আজব আর অজানা একটা যায়গা। কতটুকু জানি আমরা পৃথিবী কে? মধ্য যুগে আমরা যাদের ডাইনী বলে পুরিয়ে ফেলতাম এখনকার যুগে এসে দেখা যাচ্ছে তারা ছিল গবেষক, ডাক্তার। বিভিন্ন রোগ বালাই নিয়ে তারা কাজ করত। এত আগে প্রযুক্তি ছিল না, ল্যাব ছিল না। রোগ বালাই এক্সিডেন্টালই ছড়িয়ে পড়ত আর আমরা সাধারণ জনতা ছিলাম অজ্ঞ কুসংস্কার আচ্ছন্ন আমরা একটা কাজই পারতাম। যা কিছু পছন্দ হতনা ধ্বংস করে ফেলতাম। মানব জাতির ইতিহাসটাই এমন। আমরা যা সহ্য করতে পারি না তা ধ্বংস করে ফলি।’
এদিকে একটা গাড়ি থামার আওয়াজ পাওয়া গেল বাইরে থেকে। রীতি আর জাবেদ সাহেব এসেছেন। সাথে এসেছেন তার দাদা। রীতি রুমে ঢুকতেই বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন। আস্তে আস্তে রীতির দিকে এগিয়ে গেলেন। রীতির কাছে যেতেই বৃদ্ধের লাঠিটা হাত থেকে পরে গেল। হাতটা কাঁপছে ওনার। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল বৃদ্ধ। কাঁপা কাঁপা দুটো হাত দিয়ে মেয়েটার গাল দুটো ধরে কি যেন দেখলেন। কিছুক্ষণ পর যেন লোকটার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল। জড়িয়ে ধরলেন মেয়েটাকে। মেয়েটাকে ধরে এনে কোলের উপর নিয়ে বসলেন বৃদ্ধ। সোফার উপর বসে থাকা বৃদ্ধ আর রীতি যেন কত দিনের পরিচিত।
‘হা হা হাআআ’ হাসতে হাসতে কাশতে শুরু করলেন বৃদ্ধ।
অকিল বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার স্পাই টা কি সাদেক সাহেব অরফে চা ওয়ালা?’
কথাটা বলে বৃদ্ধের পাশে রাজকীয় সোফার পাশে মাথা নিচু করে দাঁড়ানো লোকটার দিকে ইঙ্গিত করতেই লোকটা জিহ্বা বের করে দাঁতে কামড়ে ধরল।
বৃদ্ধ এবার হাসলেন। ‘জী, আপনার আই কিউ অসম্ভব ভাল মি. অকিল। বলতেই হয়। ওকেই স্পাই হিসেবে ওই গ্রামে আমি গত ৮ বছর আগে পাঠাই। আমি জানতাম আমার নাতনীর সামনে অনেক কঠিন সময় আসবে। আপনি হয়তো জানেন এই রোগ গুলো ছোট বেলায় একবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠে যেমন এখন রীতির বেলায় হচ্ছে। রোগটা চলে যায় কিছু বছর থেকে। আবার বয়স বাড়লে এক সময় এই রোগটা ফিরে আসে। আবার চলে যায় অবশ্য। একটা মানুষের জীবন নষ্ট করে দেয় জানেন এই রোগগুলো? আমার বাবা মা কে ও পুরিয়ে মারে কলকাতার লোক জন। আমরা কোলকাতায় থাকতাম। ডাইনী উপাধি দিয়ে পুরিয়ে মারে ওরা। আমাকে বাচাতে যেয়ে আমার বাবা মা আর পালাতে পারে নি। আমার বাবা এর ও এই রোগ ছিল। আবার বাবা এর মা এর এই রোগ ছিল। তার, তার বাবা এর ও ছিল। তিনি ইউরোপ থেকে এই ভারতবর্ষে এসে পাড়ি জমিয়েছিলেন ব্যবসা করতে। পরে চলে যান আর কোনো খোজ পাওয়া যায়নি তার। যদিও তিনি কথা দিয়ে গিয়েছিলেন কিছু পয়সা পাতি কামিয়ে আবার ফিরে আসবেন তার ভালবাসার মানুষের কাছে। যাক গিয়ে সেই কথা। রিশিতা কে দেখতে চাইলে সাদেক আপনাদের ওর ঘড়ে নিয়ে যাবে। রিশিতাকে কবর দেয়ার পর সাদেক ই বুদ্ধি করে কব খুড়ে দেখে বেচে আছে কিনা। লোকটার বুদ্ধি আছে বলতে হবে। ওর পরিবার আমাদের পরিবারের অনেক পুরানো ভৃত্য। যুগ যুগ ধরে এদের পরিবার আমাদের সাহায্য করে যাচ্ছে। ও কোনো টাকা পয়সা ও নেয় না জানেন? শুধু জীবন টা বাচাতে হবে কয়টা টাকা অনেক কষ্টে গুজে দেই। এই যুগে এমন মানুষ পাওয়া খুব রেয়ার।’
‘আপনার ছেলে কেন এই অর্থ সম্পদ ছেড়ে ঐ অজ-পাড়া গায়ে চলে গিয়েছিল? আপনি অনেক কনজারভেটিভ বলে?’
‘তা বলতে পারেন, বোঝেন ই তো আমাদের এই রোগ যাদের হয় তাদের খুব সাবধানে চলতে হয়। আমি চাইতাম সে বাইরে টাইরে কম যাবে, খুব বুঝে শুনে বন্ধু বান্ধব করবে। কিন্তু একবার সে সেই কি এক গ্রাম অষ্টগ্রাম সেখানে যেয়ে এক গ্রামের যুবতির প্রেমে পড়ল। তার পর যা হয় আরকি আমার সাথে বনি বনা হল না। আমিও রাগ দেখালাম আরো ম্যচিউর হওয়া দরকার ছিল। ছেলেটার সাথে সম্পর্ক গেল। কিন্তু আমি সব সময় খোজ রেখেছি ছেলেটার। আমার আরেক নাতি যে আছে সে আমার খুব ভক্ত। ওর সাথে আমি আস্তে আস্তে ভাল সম্পর্ক করে তুলি।’
‘একটা জিনিস রিশিতার প্রথম সিম্পটম টা দার্জিলিং এর এক্সিডেন্ট এর পড়ই দেখা দেয় না?’
‘হু, কোনো রকম ইনফেকশন এই রোগের রোগীদের জন্য খুব সমস্যা বুঝলেন। এই জন্যে আরো প্রটেকটিভ থাকতাম। আমাদের অটো ইমিউন সমস্যা আছে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুব নাজুক। মি. অকিল আপনি স্মার্ট মানুষ আপনি সব নিজেই বুঝবেন। অত তারাহুরা কি। যান সাগর কে নিয়ে রিশিতার কাছে যান। মেয়েটা এই ছোকরা কে খুব ভালবাসে। সরি মি. জাবেদ।’ কথাগুলো বলতে বলতে জাবেদের কাছে এসে ওর কাঁধে এসে একটা হাত রাখল বুড়ো।
জাবেদ শুধু মাথা নিচু করে থাকল। একটু পর বেরিয়ে গেল। রিশিতা ওর বউ হয়তো ছিল কিন্তু এর পর আর থাকা যায় না। যে মানুষটা ওকে কোন দিন ভালই বাসতে পারি নি অভিনয় করে গেছে তার জন্যে আর কি। এমনকি মেয়েটাও ওর না। চলে গেলেন জাবেদ সাহেব বাবাটাকেও নিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে রীতির দুই গাল দুটো চুমু দিয়ে বলে গেলেন, ‘ভাল থেক মা’।
বুড়ো অকিল আর সাগরের দিকে তাকালেন। এই প্রথম বুড়ো অকিলের দিকে চোখে চোখ রেখে তাকালেন। তাকিয়ে একটা রহস্যময় হাসি দিলেন। এই অন্ধকারেও বুড়োর নীল চোখগুলো পরিষ্কার বোঝা গেল, জ্বলজ্বল করছে চোখ দুটো। চোখগুলো যেন অকিলের নাড়ি নক্ষত্র সব জেনে নিল। কেমন একটা অস্বাভাবিক লাগল অকিলের কাছে। পেটের ভেতর গুলিয়ে উঠল। বুড়ো সাদেকের দিকে তাকাল, সাদেককে ইশারায় নিয়ে যেত বলল রিশিতার কাছে।
রিশিতার কাছে ওদেরকে নিয়ে যাচ্ছেন সাদেক সাহেব। ‘স্যার আমি তো চা ভাল বানাই না আপনি তাহলে আমাকে ঐ ভাবে আপনার হোটেলে নিয়ে গেলেন কেন?’
‘সাদেক মিয়া আপনার চা খেয়ে আমি ভাবছিলাম, এত বাজে চা আমি আমার বাপের জন্মেও খাই নাই। রহস্য টা কি? আপনি বললেন দিনে ২০০ টাকা রোজগার করেন তার মানে ২ টাকা করে কাপে প্রায় ৪০০ কাপ চা বেচেন। অসম্ভব। আপনার তো না খেয়ে মরার কথা এই বাজে চা বানিয়ে কেউ ২০০ টাকা রোজগার করতে পারে না। তবে অবশ্য এটা ঠিক আমি আপনার স্যার এর এই গ্র্যান্ড প্লান আর টিকটিকি গিরি এর ব্যাপারে কিছু জানতাম না। আমি মানুষটা কিউরিয়াস, যা কিছু তে অসংগতি দেখি তা ঘাটিয়ে দেখি। তাই আপনার রহস্য টা কি বুঝতে আমি আপনাকে নিয়ে গিয়েছিলাম।’
সাদেক মিয়া হাসলেন, ‘তা সার তখন আপনি আমাকে নিয়ে কি ভাবেছিলেন?’
‘আমি ভেবেছিলাম আপনি নতুন ব্যবসায় নেমেছেন। আমাকে গুল পট্টি মেরেছেন চা বিক্রির এমাউন্ট এর ব্যাপারে, এটা ভেবেছিলাম।’
কথা বলতে বলতে রিশিতার রুমে পৌঁছে গেল অকিল। ভেতরে যেতে বলে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকল সাদেক মিয়া।
রীতি দৌড়ে মায়ের রুমে ঢুকল। মাকে দেখে রীতির তেমন কোনো আবেগ দেখা গেল না। আস্তে আস্তে মায়ের কাছে গিয়ে মায়ের কাঁধের পাশে বিছানায় যেয়ে বসল রীতি। মায়ের মাথায় একটা হাত রেখে। যেন কি দেখল। হয়তো বলল মা আমি তোমার কাছে চলে এসেছি আর কোনো ভয় নেই। রিশিতা একটা বিছানায় শুয়ে আছে। নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে ও। কি সুন্দর দেখতে রিশিতা যেন সৃষ্টিকর্তা নিজের হাতে বানিয়েছেন, পরম যত্নে, অসীম মমতায়। রিশিতার উপর চাঁদের আলো অল্প এসে পড়ছে।
“A sleeping beauty.” কথাটা ফিসফিস করে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল অকিলের।
পরিশিষ্ট
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, জন-অরণ্যের এক সজীব ক্যানভাস। সেখানে জীবনের নানা রং, নানা সুর। ট্রেন আসার শেষ মুহূর্তের অপেক্ষায় মানুষের ভিড়। হুইসেল বাজছে একটানা, যেন দূর থেকে ভেসে আসা কোনো দীর্ঘশ্বাস। ধোঁয়া আর ধুলোয় একাকার প্ল্যাটফর্মের বাতাস, তাতে মিশে আছে বহু গল্পের গন্ধ। এই কোলাহলের মাঝে অকিল আর সাগর দাঁড়িয়ে আছে, তাদের গন্তব্য গ্রামের বাড়ি।
সাগর, যার বুক জুড়ে গভীর ক্ষত, আর পাশে বন্ধু অকিল। ট্রেনের চাকা এখনো থামেনি, কিন্তু সাগরের ভেতরের ঝড়টা যেন থামার নামই নিচ্ছে না।
অকিল বন্ধুত্বের চিরন্তন অধিকার নিয়ে সাগরের কাঁধে হাত রাখল। হাতের উষ্ণতা বন্ধুর যন্ত্রণাকে পুরোপুরি না মুছলেও খানিকটা সান্ত্বনা দিল। অকিল বলল, ‘দোস্ত, তোরা সত্যি খুব ভালো জুটি হতিস। রিশিতার পাগলামি আর তোর শান্ত স্বভাব একদম পারফেক্ট। তোর উচিত ছিল ফাইট করা। কেন ছেড়ে দিলি সব?’
অকিলের কথায় সাগরের বাঁধভাঙা কান্না আর থামল না। বুকের ভেতর চাপা অভিমান, প্রেম আর পরাজয়ের কষ্ট হু হু করে বেরিয়ে এলো। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। স্টেশনের হাজারো মানুষের কোলাহল, ট্রেনের ইঞ্জিনের গর্জন সবকিছুকে ছাপিয়ে সেই কান্নার শব্দ অকিলের বুকে বাজল গভীর কষ্টের সুরে। বন্ধুর এই নীরব আর্তনাদ যেন অকিলের নিজের হৃদয়েও রক্তক্ষরণ ঘটালো।
অকিল যেন সাগরের কান্নাটা শুনলও না, বা শুনতে চাইল না। হয়তো বন্ধুর কষ্ট ভোলাতেই সে এক অদ্ভুত কল্পনার জাল বুনতে শুরু করল। তার নিজের মনেই বলে চলল সেই অসম্ভব, অথচ সুন্দর এক স্বপ্নের গল্প।
‘জানিস সাগর, তোরা যদি একসঙ্গে থাকতে, তবে কী হতো? গভীর রাতে, বাইরে ঝুম বৃষ্টি নামত। টিনের চালে বৃষ্টির উন্মাদনা। তোরা দুজন হারিকেন জ্বালিয়ে পাশাপাশি বসে উপন্যাস পড়তি। সেই মায়াবী আলোয় তোদের সন্তান তোদের পাশে শান্তিতে ঘুমাত। মাঝে মধ্যে তোর আর রিশিতার চোখ যেত বাচ্চার নিষ্পাপ মুখের দিকে, তারপর আবার মনোযোগ দিত বইয়ের পাতায়। রিশিতা স্বভাবতই দ্রুত পড়ত, আর তোর জন্য সে অপেক্ষা করত। দেখতিস, রিশিতা অভিমানের সুরে বলত
"আপনি একটু দ্রুত পড়তে পারেন না? ধুর, কি একটা ক্লাইম্যাক্স চলছে আর এখন আপনার জন্যে আমি অপেক্ষা করি। কেন বাবা বলি আপনি নিজে নিজে পড়তে পারেন না?"
রিশিতা মুখ বানাত রাগে। আর জানিস তো, রিশিতাকে রাগলে কী অপূর্ব সুন্দর লাগে। তুই ইচ্ছে করেই তখন আরেকটু সময় নিয়ে পড়তি, কেবল ওর সেই রাগ মেশানো সৌন্দর্যটা উপভোগ করার জন্য...
অকিল কল্পনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে দেখল, সাগর তখনও কাঁদছে। তবে সেই কান্নার শব্দে এখন একটু যেন শান্ত বিষাদের সুর। ট্রেন ততক্ষণে প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়িয়েছে। হুইসেলের তীক্ষ্ণ শব্দে স্বপ্নের ঘোর কাটে। অকিল বন্ধুর পিঠ চাপড়ে বলল, 'চল দোস্ত, ওঠ। নতুন করে সব শুরু করতে হবে।'
কথাগুলো বলতে বলতে অকিলের গলাও ধরে এল। সে আকাশের দিকে তাকাল। ট্রেনটা আসছে। ঝিক ঝিক শব্দে ধোঁয়া উড়িয়ে আসছে দানবীয় ইঞ্জিনটা। জীবনটা ট্রেনের মতোই। কেউ ওঠে, কেউ নামে। কিন্তু কিছু স্মৃতি, কিছু দীর্ঘশ্বাস চিরকাল প্ল্যাটফর্মে রয়ে যায়।
(সমাপ্ত)
To know more about Kleine-Levin Syndrome (Also known as Sleeping Beauty) click here or click here or here.
What are the symptoms of Kleine-Levin syndrome?
Symptoms usually begin in early adolescence and recur usually more than once per year. The average duration of KLS is 14 years. Symptoms include:
- Extreme sleepiness and inability to stay awake.
- Increased appetite (hyperphagia).
- Increased sex drive (hypersexuality).
- Hallucinations.
- Irritability or behavioural changes.
- Anxiousness or depression.
- Confusion or amnesia.
An episode occurs when you experience these symptoms for at least two days. KLS episodes can last for a few days, average around 10 days, or could last for a couple of weeks. One study suggests that people diagnosed with KLS have an average of 20 episodes during their lifetime.
Most people have trouble remembering what happens during an episode. They can wake up during an episode to eat or use the restroom but have limited physical function due to excessive sleepiness.
After you experience an episode, you’ll go back to your normal patterns of behaviour and not have any symptoms of the condition except for possibly mild cases of memory loss.
What triggers a Kleine-Levin syndrome episode?
Certain events trigger symptoms of KLS, including:
- Flu-like illness or infection.
- Drug and alcohol use.
- Head trauma.
- Physical exertion.
- Stress.
What causes Kleine-Levin syndrome?
The cause of Kleine-Levin syndrome is unknown. Some studies suggest that an illness or injury causes damage to the part of your brain that regulates sleep (hypothalamus).
Most cases of KLS occur after having an illness similar to the flu or an infection. Research speculates that KLS could cause an autoimmune response where your body confuses healthy tissue with an invading organism, which causes symptoms. Other research suggests that KLS could be genetic, related to mutations in genes LMOD3 and TRANK1.