করিমের কাজের কোনো ঠিক নেই। আজ এই কাজ তো কাল অন্য কাজ। । বস যখন যেটা বলেন, করিম সেটাই করে। বস প্রায়ই করিমের কাঁধে হাত রেখে বলেন, “আমরা তো এখানে একটা পরিবারের মতো, তাই না? পরিবারের জন্য একটু-আধটু বেশি খাটতেই হয়।” কথাটা শুনতে ভালোই লাগে। মনে হয়, কী দারুণ একটা জায়গা! সবাই কত আপন।

এই ‘পরিবার’ আর ‘ভাসমান কাজ’ – এই দুটো বিষয় যখন একসাথে কোনো অফিসে জড়ো হয়, তখন এর চেয়ে বিপজ্জনক আর কিছু হতে পারে না। মানবসম্পদ বিভাগের চোখে দেখলে, এটা কোনো দারুণ ব্যাপার নয়, বরং একটা পাতা ফাঁদ। এই ফাঁদে আটকা পড়লে কর্মীর জীবন থেকে শান্তি বিদায় নেয়, ন্যায্য অধিকার বলে কিছু থাকে না এবং একসময় দম বন্ধ হয়ে আসে।

চলুন, এই অদ্ভুত বিষাক্ত ব্যাপারটি একটু সহজ করে বোঝার চেষ্টা করি।

‘পরিবার’ নামক মরীচিকা

অফিস আর পরিবার – দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। চাকরির সম্পর্কটা হলো চুক্তিভিত্তিক। আপনি আপনার সময় এবং মেধা দেবেন, তার বিনিময়ে মাস শেষে কিছু টাকা পাবেন। এখানে সবকিছুই শর্তসাপেক্ষ। আপনার পারফরম্যান্স খারাপ হলে চাকরি থাকবে না।

কিন্তু পরিবারে কি তাই হয়? আপনি পরীক্ষায় ফেল করলে বা বাড়ির কোনো কাজে ভুল করলে আপনার বাবা-মা কি আপনাকে পরিবার থেকে বের করে দেন? দেন না। কারণ পরিবারের ভিত্তি হলো শর্তহীন ভালোবাসা। যে বস আপনাকে আজ ‘পরিবারের সদস্য’ বলছেন, কোম্পানির সামান্য লোকসান হলে কালই তিনি আপনাকে ছাঁটাই করতে দুবার ভাববেন না। তখন এই ‘পরিবার’ কথাটা একটা নিষ্ঠুর রসিকতার মতো শোনায়।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের একটি কাল্পনিক চিত্র:

ধরুন, কোনো এক ব্যাংকের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার তার কর্মীদের প্রায়ই বলেন, “আমরা সবাই একটা ফ্যামিলি।” মাসের শেষে যখন কাজের প্রচণ্ড চাপ, তখন তিনি তরুণ অফিসার রহিমকে কোনো ওভারটাইম ছাড়াই টানা দুই সপ্তাহ রাত করে কাজ করতে বলেন। তিনি এটাকে অফিসের কাজ হিসেবে না দেখিয়ে বলেন, “ফ্যামিলির এই বিপদের দিনে একটু পাশে দাঁড়াতে হবে না?” রহিম ‘না’ বলতে পারে না। যদি সে যদি না বলে, তাহলে তার গায়ে ‘টিম প্লেয়ার নয়’ অথবা ‘অকৃতজ্ঞ’ তকমা লেগে যাবে। এই যে আবেগের নামে শোষণ, এটাই হলো ‘ওয়ার্ক ফ্যামিলি’ কালচারের সবচেয়ে বড় বিপদ।

যখন কাজের কোনো নির্দিষ্টতা থাকে না

এই ‘পরিবার’ তত্ত্ব আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে যখন এর সাথে যোগ হয় ‘নির্দিষ্ট কাজ না থাকা’ বা ‘ফ্লুইড রোল’। অর্থাৎ, আপনার কাজ কী, আপনার দায়িত্ব কতটুকু, তার কোনো পরিষ্কার বর্ণনা নেই। এটাকে খুব আধুনিক একটা ব্যাপার বলে চালানো হয়। কিন্তু সত্যিটা হলো, এটা কর্মীদের জন্য একটা মানসিক অত্যাচার।

আপনি যখন জানেনই না যে আপনার কাছ থেকে ঠিক কী আশা করা হচ্ছে, তখন সারাক্ষণ একটা চাপ কাজ করে। নিজের যোগ্যতার ওপর থেকেই বিশ্বাস উঠে যেতে থাকে। মনে হয়, আমি কি কিছুই পারছি না? এই ধরনের দ্বিধা আর বিভ্রান্তি থেকে জন্মায় হতাশা এবং একসময় মানুষ কাজে আগ্রহই হারিয়ে ফেলে।

আরেকটি ব্যাংকের উদাহরণ:

সেই একই ব্যাংকের শাখায়, ফাতেমা নামের একজন কর্মী কাজ করেন। তার কোনো নির্দিষ্ট দায়িত্ব নেই। আজ তিনি নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার কাজ করছেন, তো কাল তাকে কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই একটি জটিল আন্তর্জাতিক লেনদেনের সমস্যা সমাধান করতে বলা হলো। স্বাভাবিকভাবেই কাজে ভুল হলো। কিন্তু এর দায় কে নেবে? ফাতেমা এবং তার সহকর্মীরা সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকেন, এই বুঝি কোনো ভুলের জন্য তাদের ওপর দোষ চাপানো হলো। এর ফলে যা হয়, কিছু কাজ একাধিকবার করা হয়, আর কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ কেউই করে না। কারণ সবাই ভাবে, এটা হয়তো অন্য কারো দায়িত্ব।

যখন দুটো বিপদ একসাথে মেশে

যখন এই আবেগীয় ‘পরিবার’ আর বিশৃঙ্খল ‘ভাসমান কাজ’ একসাথে হয়, তখন একটা বিষাক্ত চক্র তৈরি হয়। এখানে মেধার কোনো দাম থাকে না, থাকে শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্ক আর তোষামোদ।

  • শোষণ একটা নিয়মে পরিণত হয়: ‘পরিবার’ বলে আপনার ওপর অন্যায় আবদার চাপিয়ে দেওয়া হয়, আর কাজের সীমানা নির্দিষ্ট না থাকায় আপনি বলতেও পারেন না যে, “এটা আমার কাজ নয়।”
  • মেধার বদলে স্বজনপ্রীতি: যখন কোনো ভালো প্রজেক্ট আসে, তখন সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি সুযোগ পায় না। সুযোগ পায় বসের সবচেয়ে কাছের বা অনুগত লোকটি। ম্যানেজারের নিজের ভাগ্নে হয়তো কম যোগ্যতা নিয়েও বড় দায়িত্ব পেয়ে যায়, আর ফাতেমার মতো যোগ্য কর্মীরা হতাশ হন।
  • পারফরম্যান্স মূল্যায়ন একটা তামাশা হয়ে দাঁড়ায়: যার কাজের কোনো নির্দিষ্টতা নেই, তার পারফরম্যান্স মূল্যায়ন হবে কিসের ভিত্তিতে? তখন মূল্যায়ন হয় ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ওপর। যে যত বেশি অনুগত, তার মূল্যায়ন তত ভালো।

সমাধান কী? পরিবার নয়, একটি দক্ষ দল তৈরি করুন

তাহলে উপায় কী? উপায় হলো এই ‘পরিবার’ নামক ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা। অফিসকে ভাবতে হবে একটা পেশাদার ক্রীড়া দলের মতো, যেমনটা একটা ভালো ক্রিকেট দল।

একটা ভালো দলে সবাই সবার দায়িত্ব সম্পর্কে জানে। একে অপরকে সাহায্য করে, কিন্তু দিন শেষে পারফরম্যান্সই শেষ কথা। যে ভালো খেলে না, সে দল থেকে বাদ পড়ে। এখানে আবেগের চেয়ে পেশাদারিত্ব বড়।

এমন একটি সংস্কৃতি গড়তে তিনটি জিনিস প্রয়োজন:

১. কাজের সুস্পষ্ট ধারণা: প্রত্যেক কর্মীর দায়িত্ব কী, তা পরিষ্কারভাবে বলা থাকতে হবে। সময়ের সাথে দায়িত্ব বদলাতে পারে, কিন্তু সেই বদলটাও সবাইকে জানাতে হবে। দায়িত্ব বদলের সাথে সাথে তার কাছ থেকে কি আশা করা হচ্ছে কি হচ্ছে না তাও সূনির্দিষ্ট হতে হবে৷

২. শতভাগ জবাবদিহিতা: ভালো কাজের জন্য যেমন পুরস্কার থাকবে, খারাপ কাজের জন্যও তেমনি জবাবদিহি করতে হবে। লক্ষ্যগুলো হতে হবে স্পষ্ট এবং পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে নিয়মিত আলোচনা বা ফিডব্যাক দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

৩. মানসিক নিরাপত্তা: দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো মানসিক নিরাপত্তা। কর্মীরা যেন নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারে, ভুল স্বীকার করতে পারে এবং নতুন ধারণা নিয়ে আলোচনা করতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কাউকে তার ভুলের জন্য অপমান করা যাবে না।

শেষ কথা

‘আমরা একটি পরিবার’ এই কথাটি শুনতে মধুর হলেও এর পেছনের বাস্তবতা প্রায়ই হয় ভয়ঙ্কর, বিশেষ করে যখন এর সাথে যুক্ত হয় কাজের অনিশ্চয়তা। এটি আসলে অপরিপক্ক নেতৃত্বের লক্ষণ, যারা নিয়ম-কানুন দিয়ে প্রতিষ্ঠান চালাতে পারে না, তাই আবেগকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।

একটি কর্মক্ষেত্রকে সুন্দর হওয়ার জন্য ‘পরিবার’ হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং একটি পেশাদার, সম্মানজনক এবং জবাবদিহিমূলক পরিবেশ তৈরি করতে পারলেই কর্মীরা সেখানে কাজ করে শান্তি পাবে এবং প্রতিষ্ঠানও এগিয়ে যাবে। দিনশেষে মানুষ মাস শেষে বেতনের সাথে একটু মানসিক শান্তিও খোঁজে। যে অফিসে সেটাই নেই, সে অফিস থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়।