পৃথিবীতে অদ্ভুত সব মানুষ। একেক জনের জগৎ একেক রকম। আমার এক পরিচিত ভদ্রলোক আছেন, ধরা যাক তার নাম আসাদ সাহেব।

তেইশ বছরের অভিজ্ঞতা

আসাদ সাহেব একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করেন। সমস্যা হলো, তিনি যে কাজটা করেন, তার খুব সামান্যই তিনি বোঝেন। কিন্তু তার আত্মবিশ্বাসের কোনো কমতি নেই। কথায় কথায় তিনি তার ‘তেইশ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা’র গল্প শোনান। এই তেইশ বছরে তিনি যে ঠিক কী শিখেছেন, সেটা একটা রহস্য।

তার প্রধান কাজ হলো অন্যেরা কে কী পারে না, তার তালিকা করা। তার মতে, অফিসের করিম সাহেব একটা গাধা। রফিক সাহেবের মাথায় কিচ্ছু নেই। আর নতুন যে ছেলেটা জয়েন করেছে, সে তো দুই দিন পর সব গোল্লায় পাকাবে। শুধু তিনিই তার তেইশ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে একা বসে আছেন।

আশ্চর্য হয়ে ভাবি, আসাদ সাহেবরা কেন এমন করেন?

এর একটা সোজা-সাপ্টা কারণ আছে। কারণটা হলো তারা ‘যোগ্যতা’ জিনিসটা কী, তা-ই বোঝেন না। একজন মানুষ যখন খুব কম জানেন, তিনি তখন ভাবেন, পৃথিবীর সব জ্ঞান তার মগজের ভেতর জমা হয়ে আছে। জানার যে একটা বিশাল সমুদ্র আছে, সেই বোধটাই তার তৈরি হয় না।

যে মানুষটা জীবনে শুধু পুকুর দেখেছে, সে সমুদ্রকে দেখে ভাববে”এতো বড় একটা পুকুর!”

ঠিক তেমনি, একজন অযোগ্য লোক যখন একজন যোগ্য লোককে কাজ করতে দেখেন, তিনি কিছুই বুঝতে পারেন না। তিনি নিজের ওই এক চিলতে জ্ঞান (কিংবা ওই তেইশ বছরের ভুয়া অভিজ্ঞতা) দিয়ে তাকে মাপতে বসেন। স্বাভাবিকভাবেই, হিসাবে গরমিল হয়ে যায়। তিনি তখন সিদ্ধান্ত নেন, ওই লোকটাও একটা আস্ত অযোগ্য।

মানব সম্পদের চোখে একে বলে Dunning-Kruger Effect সহজ কথায় এটি এমন একটি অবস্থা, যেখানে কম দক্ষ লোকেরা নিজেদের দক্ষতাকে অনেক বেশি করে দেখেন। তারা নিজেদের অযোগ্যতা বোঝার মতোও যোগ্য হন না, ফলে তারা অন্যের আসল যোগ্যতাও চিনতে পারেন না।

কাঁচের ঘরের বাসিন্দা

আসাদ সাহেবদের এই আচরণের পেছনে আরেকটি কারণ হলো তীব্র ভয়।

একজন যোগ্য মানুষ যখন সামনে এসে দাঁড়ায়, অযোগ্য মানুষটির বুক কেঁপে ওঠে। তার মনে হয়, এই বুঝি তার সব দুর্বলতা ধরা পড়ে গেলো! তার চেয়ারটা বুঝি নড়ে উঠলো!

এই ভয় থেকে বাঁচার জন্য তারা একটা অদ্ভুত খেলা খেলে। একে বলে ‘আক্রমণ’। অন্য কেউ তাকে ‘অযোগ্য’ বলার আগেই, তিনি চিৎকার করে দশজনকে ‘অযোগ্য’ বলে বসেন। এটা তাদের আত্মরক্ষার একটা ঢাল। “আমি অযোগ্য নই, তোমরা সবাই অযোগ্য” এই বিশ্বাসটা তারা আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চান।

অযোগ্য মানুষেরা নিজেদের চারপাশে একটা কাঁচের ঘর তৈরি করে ফেলেন। সেই ঘরের ভেতরে বসে তারা খুব নিরাপদ বোধ করেন। বাইরে থেকে কেউ তাকালেই তাদের মনে হয়, লোকটা বুঝি তার ভুল ধরতে এসেছে। তিনি তখন আর দেরি করেন না। ঘর থেকেই বাইরের লোকটাকে উদ্দেশ্য করে ঢিল ছুঁড়তে শুরু করেন।

মানব সম্পদের চোখে একে বলে Ego Defense / Projection সহজ কথায় এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক আত্মরক্ষার কৌশল। মানুষ যখন নিজের কোনো দুর্বলতা বা দোষ (যেমন: অযোগ্যতা) মেনে নিতে পারে না, তখন সেই দোষটি সে অবচেতন মনে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয় বা অন্যের মধ্যে দেখতে পায়।

আসাদ সাহেবের ‘আগের অফিস’

আসাদ সাহেবের এই কাঁচের ঘর আমি সেদিন আবার দেখলাম।

অফিসে একটা নতুন সফটওয়্যার এসেছে। কাজ সহজ করার সফটওয়্যার। সবাই এটা নিয়ে খুব উৎসাহী। শুধু আসাদ সাহেব মুখ গম্ভীর করে বসে আছেন।

চায়ে চুমুক দিয়ে তিনি বলা শুরু করলেন, “হুম। ভালো। তবে আমাদের আগের অফিসে…”

এই “আগের অফিস” একটা অদ্ভুত জায়গা। আসাদ সাহেবের বর্ণনায় সেটা একটা স্বর্গরাজ্য। সেখানকার কফি মেশিন সোনা দিয়ে বাঁধানো ছিলো কিনা, তা অবশ্য তিনি বলেননি।

তিনি বলতে থাকলেন, “আমাদের আগের অফিসে যে সিস্টেমটা ছিলো, সেটা ছিলো বিশ্বমানের। এক ক্লিকে সব হয়ে যেতো। আমার তেইশ বছরের অভিজ্ঞতায় আমি ওরকম জিনিস আর দেখিনি। আমি নিজে সেই সিস্টেম বসানোর তদারকি করেছি।”

ম্যানেজার সাহেব খানিকটা বিরক্ত হয়ে বললেন, “আসাদ সাহেব, আপনি কি দয়া করে নতুন সিস্টেমটা একটু দেখবেন?”

আসাদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “দেখছি তো। কিন্তু মন ভরছে না। তেইশ বছর ধরে কাজ করি। ভালো-মন্দ বুঝি। আগের অফিসের মতো আর হবে না।”

সমস্যাটা অন্য জায়গায়। নতুন সফটওয়্যারটা আসাদ সাহেবের কাছে জটিল লাগছে। কারণ তিনি এটা শিখতে চান না। অথবা, শিখতে গিয়ে পারছেন না।

নিজের এই ‘পারছি না’ বা ‘শিখতে ইচ্ছে করছে না’কে ঢাকার জন্য তিনি একটা চমৎকার ঢাল ব্যবহার করছেন। সেই ঢালের নাম “আগের অফিস”।

তিনি আসলে বলতে চান, “আমি এই নতুন জিনিসটা পারছি না।” কিন্তু সেটা না বলে তিনি বলছেন, “এই নতুন জিনিসটা ভালো না। আমার পুরোনোটাই ভালো ছিলো।”

এটা খুব আরামদায়ক একটা অবস্থান। এখানে নিজের অযোগ্যতা নিয়ে লজ্জিত হতে হয় না। উল্টো, পুরোনো অভিজ্ঞতার গাম্ভীর্য নিয়ে বর্তমানকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা যায়।

মানব সম্পদের চোখে একে বলে Rosy Retrospection এবং Status Quo Bias

  • Rosy Retrospection (সোনালী অতীত): এটি এমন একটি মানসিক ঝোঁক, যেখানে মানুষ অতীতকে বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর বা ভালো মনে করে। আসাদ সাহেব তার আগের অফিসের সব ঝামেলা ভুলে গেছেন। তার শুধু মনে আছে সেই পরিচিত পরিবেশের আরাম।
  • Status Quo Bias (পরিবর্তনে অনীহা): মানুষ স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তনকে ভয় পায়। পরিচিত অবস্থাকেই সে ‘ভালো’ বলে মনে করে। নতুন কিছু শেখার যে মানসিক চাপ, সেটা এড়ানোর জন্য আসাদ সাহেব বর্তমান সিস্টেমকে ‘খারাপ’ বলছেন এবং পুরোনো সিস্টেমকে ‘ভালো’ বলে আঁকড়ে ধরে আছেন।