সামনের দশটা বছর খুব অদ্ভুত একটা সময় হতে যাচ্ছে। ভাবছেন সব যেমন আছে তেমনি চলবে? মোটেই না। বরংচ, বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর জন্য অপেক্ষা করছে এক বিরাট ওলট-পালট। এই ওলট-পালটের যুগে কী হতে পারে, তা নিয়ে কিছু কথা ভাবা যাক।
১. মেধাবীদের নিয়ে কাড়াকাড়ি
একটা ‘যুদ্ধ’ লেগে যাবে। তবে গোলাগুলির যুদ্ধ নয়, মেধাবী মানুষ চুরির যুদ্ধ। নতুন, চটপটে ডিজিটাল ব্যাংকগুলো পুরোনো, ঢিমেতালের ব্যাংক থেকে সব ভালো ভালো কর্মী যেমন হিউম্যান রিসোর্স, ডেটা, ক্রেডিট রিস্ক এনালিস্ট, আইটি এক্সপার্টদের ফুসলিয়ে নিয়ে যাবে। শুধু বেশি বেতনের লোভ দেখিয়ে নয়, পুরোনো আমলাতান্ত্রিক পরিবেশ থেকে মুক্তির আনন্দ দেখিয়েও। পুরোনো ব্যাংকগুলো হঠাৎ দেখবে, তাদের সব মাথাওয়ালা লোক হাওয়া।
২. সহজ ঋণ
বিকাশ বা নগদের মতো কোম্পানিগুলো আর শুধু টাকা পাঠানোর কাজে বসে থাকবে না। তারা রাতারাতি ‘ঋণের রাজা’ হয়ে উঠবে। তাদের কাছে থাকা কোটি কোটি মানুষের তথ্যের এনালাইসিস এআই দিয়ে এনালাইসিস করে এক মুহূর্তেই ছোট ছোট ঋণ দিয়ে দেবে। জামানত লাগবে না, কোনো কাগজে সই লাগবে না। পুরোনো ব্যাংকগুলো তাদের খাতা-কলমের হিসেব নিয়ে যা কোনোদিনও পারেনি, এরা তা করে দেখাবে।

৩. ডিজিটাল ঝড়
ব্যাংক খোলার জন্য তো সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। কিন্তু ব্যাংক খোলা তো আর মুদি দোকান দেওয়া নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩০০ কোটি টাকার একটা বিশাল শর্ত আছে। দেখা যাবে, এই নতুন স্বপ্নবাজদের অনেকেই শুরু করার আগেই ঝরে গেছে। যারা অনেক টাকা আর বড় বড় নাম নিয়ে আসবে (যেমন মোবাইল কোম্পানি বা বড় শিল্প গ্রুপ), কেবল তারাই টিকে থাকবে।
বোনাস: তবে ২০ – ২৫ বছর পর খুব সম্ভবত তখনকার দিনের ২০ – ৩০ কোটি টাকা দিয়েই ব্যাংক খোলা যাবে ৷ সেই ব্যাংকের মালিক এক মালিকানা বা ২-৩ জন হবে ৷ সর্বচ্চ ১০-৩০ জন কর্মকর্তা দিয়ে চলবে৷ ব্যাপারটা আরেকটি আর্টিকেল এ শেয়ার করব আছা করছি৷
৪. লাভ লোকসান এর হিসেব
পুরোনো ব্যাংকগুলো প্রথমে খুব চালাকি করবে। তারা তাদের খরচ কমাতে শয়ে শয়ে শাখা বন্ধ করে দেবে। এই সব ইট-পাথরের দালানগুলো রক্ষণাবেক্ষণে যে বিপুল খরচ হতো, তা বেঁচে যাবে। আর হঠাৎ দেখা যাবে, তাদের লাভ বেড়ে গেছে। কিন্তু এই হাসিটা হবে সাময়িক। এটা একটা ‘শেষ বাতি’ জ্বলে ওঠার মতো ব্যাপার। ভেতরের আসল অসুখটা তাতে সারবে না।
৫. ‘জোম্বি’ ব্যাংকের উদয়
কদিন পর ব্যাংকগুলো দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। একদল হবে খুব চটপটে, সময়ের সাথে তাল মেলানো ‘অ্যাজাইল’ ব্যাংক। আর বাকিরা হবে ‘জোম্বি’ ব্যাংক, বেঁচে আছে, কিন্তু ঠিক বেঁচে নেই। পুরোনো টেকনোলজি আঁকড়ে ধরে ধুঁকতে থাকবে। তাদের না থাকবে নতুন কিছু করার ক্ষমতা, না থাকবে পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাওয়ার উপায়।
৬. শাখাগুলোর বিদায়
আমরা যে রাস্তার মোড়ে মোড়ে ব্যাংকের শাখা দেখি, তার তিন-চার ভাগই হয়তো দশ বছরের মধ্যে হাওয়া হয়ে যাবে। এই যে নতুন প্রজন্ম আসছে, তারা ব্যাংকে যাওয়াটা একটা ঝামেলার কাজ বলে মনে করে। তাদের জন্য এই ইট-পাথরের দালানগুলোর কোনো দরকার নেই। তারা সব কাজ মোবাইলেই সেরে ফেলতে চায়।
৭. নতুন চেহারার শাখা
যে কয়েকটি শাখা টিকে থাকবে, সেগুলোর চেহারাও বদলে যাবে। মানুষ সেখানে আর টাকা জমা দিতে বা তুলতে যাবে না। বড় ব্যবসায়ীরা, যারা কোটি টাকার বাণিজ্য ঋণ চান, বা যারা নতুন বাড়ি বানাবেন, তারা সেখানে গিয়ে ম্যানেজারের সাথে কফি খেতে খেতে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবেন। যে কাজ মেশিন করতে পারে না, শুধু সে কাজই সেখানে হবে।
৮. ‘অদৃশ্য’ ব্যাংক
কিছু ব্যাংক আবার খুব অদ্ভুত একটা কাজ করবে। তারা ঠিক করবে, মানুষের সাথে আর সরাসরি ব্যবসা করবে না। তারা হবে ‘পাইপলাইন’-এর মতো। অন্য ছোট ছোট ফিনটেক কোম্পানিগুলো তাদের লাইসেন্স আর টেকনোলজি ব্যবহার করে ব্যবসা করবে, আর মূল ব্যাংকটি শুধু নেপথ্যে থেকে ভাড়া নেবে। আপনি হয়তো একটা অ্যাপ ব্যবহার করছেন, কিন্তু জানবেনই না যে তার পেছনের আসল ব্যাংকটা কে।
৯. স্বয়ংক্রিয় ফ্রন্টলাইন
ব্যাংকে গেলে যারা হাসিমুখে টাকা গুনে দেন, সেই ‘টেলার’ পদের মানুষেরা আর থাকবেন না বললেই চলে। তাদের ৮০ ভাগ কাজই করবে কথা বলা মেশিন (এআই) বা কিওস্ক। ২৪ ঘন্টাই তারা গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দেবে, লেনদেন করবে। যে মানুষগুলো এই কাজগুলো করতেন, তাদের হয় নতুন কিছু শিখতে হবে, নয়তো অন্য কাজ খুঁজতে হবে। এটা ভাবলে একটু মন খারাপ হতেই পারে।
১০. নিয়মের ‘চাপ’ কমানো
বাংলাদেশ ব্যাংকের এখন অনেক কড়াকড়ি নিয়ম আছে, বিশেষ করে ‘ক্লাউড’ কম্পিউটিং নিয়ে (অর্থাৎ তথ্য দেশের বাইরে রাখা যাবে না)। কিন্তু একসময় তারা দেখবে, এই কড়াকড়ির ফলে পুরোনো ব্যাংকগুলো আধুনিক হতে পারছে না, নতুনদের সাথে প্রতিযোগিতায় মারাই যাচ্ছে। তখন দেশের ভালোর জন্যই, বাধ্য হয়েই, তারা এই নিয়মগুলো একটু শিথিল করবে।
১১ . টিকে থাকার ‘যুদ্ধ ’
বড়, পুরোনো ব্যাংক এই ঝড়ে হাঁপিয়ে উঠবে। তারা নতুন টেকনোলজির পেছনে কোটি কোটি টাকা ঢালতে গিয়ে দেখবে, তাদের আর চলছে না। ব্যাঙ্ক গুলো তখন মার্জার এ যাবে। তবে তাতে শেষ রক্ষা হবে না। যারা ভাবছে এপ , এআই, অটোমেশন, অ্যাজিলিটির দরকার নেই তারা ফার্স্ট মুভার এডভান্ট্যাজ এ পিছিয়ে পড়বে৷ যারা এগুলোতে বিনিয়োগ করবো না তাদের উচিত এখনি ব্যবসা বন্ধ করে দেয়া। পরে আম ও ছালা দুটোই যাবে ৷
১২ . ‘সুপার-অ্যাপ’-এর রাজত্ব
আর সবচাইতে অদ্ভুত ভবিষ্যদ্বাণীটি হলো, দশ বছর পর হয়তো দেখা যাবে সবচাইতে বড় ‘ব্যাংক’ আসলে কোনো ব্যাংকই নয়। সেটা হয়তো একটা ‘সুপার-অ্যাপ’, যার মালিক কোনো এক মোবাইল ফোন কোম্পানি। সেই অ্যাপে আপনি গান শুনবেন, খাবার অর্ডার করবেন, আবার সেই অ্যাপেই আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকবে। ব্যাংকিং তখন আর আলাদা কিছু থাকবে না, এটা হবে জীবনের আর দশটা কাজের মতো একটা কাজ মাত্র। অদ্ভুত, তাই না? তবে এই বেপারটা ঘটতে ১ ০ বছরের বেশি লাগবে।