গত সপ্তাহে পুরনো এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো।

বন্ধুর নাম বলব না। বললে সে লজ্জা পাবে। মানুষ লজ্জা পেলে কষ্ট পায়। আমি কাউকে কষ্ট দিতে ভালোবাসি না, অন্তত ইচ্ছা করে তো নয়ই। বন্ধুটির নাম না হয় রাখলাম "করিম"। এটা তার আসল নাম নয়। কিন্তু নামে কী আসে যায়? শেক্সপিয়ার বলেছিলেন, গোলাপকে যে নামেই ডাকো, তার গন্ধ একই থাকে। করিমকে যে নামেই ডাকি না কেন, তার চোখের ক্লান্তি একই থাকবে ।

করিম কাজ করে দেশের একটা বড় ফাইনান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানে। কতটা বড়? এতটাই বড় যে, রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে তাদের সাইনবোর্ড দেখে মাথা উঁচু করতে হয়। বিশাল কাচের দরজা, ঝকঝকে লবি, গেটে দাঁড়ানো দারোয়ানের ইউনিফর্ম পর্যন্ত ইস্ত্রি করা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, ভেতরে যারা কাজ করে তারা নিশ্চয়ই সুখী মানুষ। কিন্তু করিম ভেতরে কাজ করে। করিম জানে আসল গল্পটা কী।

আমরা বসেছিলাম একটা ছোট চায়ের দোকানে। দোকানটা পুরনো। বেঞ্চগুলো একটু নড়বড়ে। চায়ের কাপে হালকা দাগ। কিন্তু চা ভালো। এই শহরে দামি রেস্তোরাঁয় অনেক কিছু পাওয়া যায়, কিন্তু ভালো চা পাওয়া কঠিন। ভালো চা পেতে হলে এরকম পুরনো, একটু ভাঙাচোরা দোকানেই আসতে হয়। মানুষের বেলাতেও হয়তো এই কথা সত্যি। ভালো মানুষ পেতে হলে একটু ভেতরে তাকাতে হয়। চকচকে বাইরের দিকে তাকালে চলে না।

করিম চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, "ইয়ার, অফিসের কথা আর বলতে ইচ্ছে করে না।" আমি বললাম, "তাহলে বলিস না।" সে বলল, "কিন্তু না বললেও তো ভালো লাগছে না।" এই হলো মানুষের সমস্যা। কষ্টের কথা বলতেও চায় না, না বলেও থাকতে পারে না। আমি চুপ করে রইলাম। চুপ থাকাটাই কখনো কখনো সবচেয়ে বড় সাহায্য।

করিম বলল। অনেকক্ষণ ধরে বলল। আমি শুনলাম। মাঝে মাঝে মাথা নাড়লাম। একবার "হুম" বললাম। একবার "তাই নাকি" বললাম। এর বেশি কিছু বলার ছিল না। সে যা বলল তার সারমর্ম হলো এরকম। তার প্রতিষ্ঠানে কিছু একটা হয়েছে। একটা অভিযোগ। একটা তদন্ত। একটা শাস্তি। এই তিনটা জিনিস পরপর ঘটেছে, কিন্তু এর মাঝখানে যা থাকার কথা ছিল তা ছিল না। ন্যায্যতা ছিল না। সুবিচার ছিল না। একটু মানবিক আচরণ ছিল না।

যাই হোক। করিমের কথা থেকে একটু বেরিয়ে আসি। বেরিয়ে আসতে হবে, কারণ আজকে আমি একটু অন্য কথা বলতে চাই। বলতে চাই সেই প্রশ্নটার কথা, যেটা করিমের মুখের দিকে তাকিয়ে আমার মাথায় এসেছিল। প্রশ্নটা হলো, কোনো প্রতিষ্ঠান যখন কাউকে শাস্তি দেয়, তখন সেটা কতটুকু আইনসম্মত? আদালত সেই শাস্তির দিকে কীভাবে তাকান? কোন মাপকাঠিতে বিচার করেন? আমি জানি, এই প্রশ্ন শুনলে অনেকে ভাবছেন আহা, আইনের কচকচানি শুরু হলো। কিন্তু একটু ধৈর্য ধরুন। এই বিষয়টা আসলে শুধু আইনের না, এটা মানবিক মর্যাদার কথা। এটা করিমের মতো লক্ষ লক্ষ মানুষের কথা, যারা প্রতিদিন অফিসে যায়, কাজ করে, এবং আশা করে যে অন্তত তাদের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করা হবে।

আদালত প্রথমেই যেটা দেখেন, সেটা হলো নিয়মকানুনের বিষয়। প্রসিডিউরাল কমপ্লায়েন্স। নামটা ইংরেজি, কিন্তু ব্যাপারটা সহজ। মানে হলো, শাস্তি দেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠান কি নিয়ম মেনেছে? আশ্চর্যের বিষয় হলো, অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেদের বানানো নিয়মই মানে না।

প্রথম যে ধাপটা আদালত দেখেন সেটা হলো অভিযোগের নোটিশ, যাকে চার্জশিট বলে। করিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। ঠিক আছে, থাকতেই পারে। কিন্তু সেই অভিযোগটা কি তাকে লিখে জানানো হয়েছে? সুনির্দিষ্টভাবে? "তুমি অমুক তারিখে অমুক কাজ করেছ" এভাবে? নাকি শুধু মৌখিকভাবে বলা হয়েছে, "তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে" এইটুকু? এই পার্থক্যটা আকাশ-পাতাল। কারণ লিখিত চার্জশিট না পেলে করিম জানবে কীভাবে সে কোন বিষয়ে জবাব দেবে? অন্ধকারে তীর ছোঁড়া আর আত্মপক্ষ সমর্থন এক জিনিস নয়।

চার্জশিট পেলেই হবে না। করিমকে সময় দিতে হবে। পর্যাপ্ত সময়। সে যাতে ভালো করে ভেবেচিন্তে লিখিত জবাব দিতে পারে। তাড়াহুড়া করে "কাল সকালের মধ্যে জবাব দাও" বললে চলবে না। এটা শাস্তি দেওয়ার তাড়া, সুবিচারের আগ্রহ নয়। এরপর আসে তদন্ত কমিটির প্রশ্ন। তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে, এটা নিয়ম। কিন্তু কমিটিতে কারা থাকবে? ধরুন, যে ব্যক্তি করিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে, তার বন্ধু তদন্ত কমিটিতে। অথবা যে কর্মকর্তা করিমকে এমনিতেই পছন্দ করেন না, তিনি কমিটির প্রধান। এই কমিটির রিপোর্ট যাই আসুক না কেন, সেটা কি নিরপেক্ষ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে? নেই। আদালতও সেটা জানেন।

তদন্ত চলছে। করিম কি সেই তদন্তে নিজে উপস্থিত থাকতে পারবে? নিজের কথা বলতে পারবে? তার পক্ষে সাক্ষী দাঁড় করাতে পারবে? বিপক্ষের সাক্ষীকে জেরা করতে পারবে? যদি না পারে, তাহলে এটা তদন্ত নয়, এটা একটা পূর্বনির্ধারিত নাটক। তদন্ত শেষ হলো। রিপোর্ট জমা হলো। কিন্তু রিপোর্টে কি আছে? তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ আছে? নাকি শুধু আছে, "আমরা মনে করি অভিযুক্ত দোষী" এই একটা লাইন? একটা যুক্তিসঙ্গত রিপোর্টে থাকতে হবে কী অভিযোগ ছিল, কী প্রমাণ পাওয়া গেল, অভিযুক্ত কী বলল, এবং সব মিলিয়ে কমিটি কেন এই সিদ্ধান্তে এল। এই ব্যাখ্যাটা না থাকলে রিপোর্ট রিপোর্ট নয়, শুধু কাগজ। এবং সবশেষে, শাস্তিটা কি সঠিক কর্তার অনুমোদনে দেওয়া হয়েছে? প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার একটা কাঠামো থাকে। সেই নিয়ম না মানলে শাস্তিটাই অবৈধ, যতই যুক্তিসঙ্গত হোক না কেন। এই ধাপগুলোর যেকোনো একটাতেও যদি ফাঁক থাকে, আদালত বলে দেবেন, এই শাস্তি টেকসই নয়।

আমি করিমের কথা মনে করলাম। এই ধাপগুলোর কোনোটা কি তার ক্ষেত্রে সঠিকভাবে মানা হয়েছিল? তার ক্লান্ত চোখ দেখে মনে হলো, না।

এখন আসি আরও গভীর একটা জায়গায়। ধরুন, ওপরের সব ধাপ মানা হলো। চার্জশিট দেওয়া হলো, সময় দেওয়া হলো, কমিটি হলো, শুনানি হলো, রিপোর্ট হলো, সঠিক কর্তার অনুমোদন হলো। সব ঠিকঠাক। কিন্তু তারপরও আদালত থামেন না। তারপরও আদালত জিজ্ঞেস করেন, পুরো ব্যাপারটা কি সত্যিকার অর্থে ন্যায্য ছিল? এই প্রশ্নটা হলো ন্যাচারাল জাস্টিসের প্রশ্ন।

"ন্যাচারাল জাস্টিস" শব্দ দুটো আমার বেশ পছন্দের। প্রাকৃতিক বিচার। এমন বিচারের নিয়ম যেটা কোনো আইনের বইয়ে লেখা নেই, কিন্তু তবু যেকোনো সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষ সহজাতভাবে বোঝেন। কারণ এটা মানবিক। কারণ এটা স্বাভাবিক। ধরুন, আপনার পাঁচ বছরের ছেলে রান্নাঘরে গিয়ে বিস্কুটের কৌটা খুলেছে। বিস্কুট খেয়েছে। আপনি শাস্তি দিতে চান। কিন্তু শাস্তি দেওয়ার আগে কি একটু জিজ্ঞেস করবেন না, "কেন খেয়েছ?" হয়তো সে বলবে, "মা, আমার অনেক ক্ষিদে পেয়েছিল।" অথবা বলবে, "দাদা বলল খেতে।" না শুনে শাস্তি দিলে কী হয়? শাস্তিটা হয়তো শারীরিকভাবে প্রয়োগ হয়, কিন্তু ন্যায্য হয় না। এটাই ন্যাচারাল জাস্টিসের প্রথম স্তম্ভ।

ল্যাটিন ভাষায় "Audi Alteram Partem।" উচ্চারণটা কঠিন, কিন্তু অর্থটা সহজ। অন্য পক্ষের কথাও শোনো। এটা কেবল আইনি নিয়ম নয়, এটা মানবিক দায়িত্ব। যাকে শাস্তি দেবে, তাকে আগে কথা বলতে দাও। তার যদি কোনো ব্যাখ্যা থাকে, শোনো। তার যদি কোনো প্রমাণ থাকে, দেখো। তারপর সিদ্ধান্ত নাও। একপক্ষের কথা শুনে যদি সিদ্ধান্ত নাও, তাহলে সেটা সিদ্ধান্ত নয়, সেটা পক্ষপাত। করিমের ক্ষেত্রে কি এটা হয়েছিল? সে কি সত্যিকার অর্থে তার কথা বলার সুযোগ পেয়েছিল? নাকি শুধু কাগজে কলমে একটা সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যেটা ব্যবহার করলে কোনো লাভ হতো না? এই দুটো জিনিসের মধ্যে পার্থক্য আছে। আদালত সেই পার্থক্য বোঝেন।

ন্যাচারাল জাস্টিসের দ্বিতীয় স্তম্ভটা আরও সহজ করে বলি। ধরুন, আপনি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন। এখন সেই অভিযোগের তদন্ত করবেন আপনার বন্ধু, যিনি আপনাকে খুব পছন্দ করেন এবং আমাকে একদম পছন্দ করেন না। তদন্ত হলো। রিপোর্ট এল। স্বাভাবিকভাবেই রিপোর্টে লেখা আছে আমি দোষী। এই রিপোর্ট কি বিশ্বাসযোগ্য? না। কারণ তদন্তকারীর স্বার্থ ছিল। তার মনে আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল। ল্যাটিন ভাষায় একে বলে "Nemo Judex in Causa Sua" ৷ কেউ নিজের মামলার বিচারক হতে পারে না। আদালত এই ব্যাপারটা খুব ভালো করে বোঝেন। যদি প্রমাণ হয় যে তদন্তকারী বা বিচারকের একটুও পক্ষপাত ছিল, একটুও ব্যক্তিগত আক্রোশ ছিল, পুরো প্রক্রিয়াটাই অবৈধ হয়ে যায়। কাগজে কলমে সব ঠিক থাকলেও।

এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলি। ন্যাচারাল জাস্টিস লিখিত আইনের মতো নয়। লিখিত আইনে নির্দিষ্ট থাকে, এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে। কিন্তু ন্যাচারাল জাস্টিস হলো একটা উচ্চতর মানদণ্ড। এখানে বিচারক নিজের প্রজ্ঞা ব্যবহার করেন। সার্বিক পরিস্থিতি দেখেন। বলেন, "এই ঘটনার সামগ্রিক চরিত্রটা কি সুবিচারের ছিল?" যদি উত্তর "না" হয়, তাহলে সব নিয়ম মানলেও শাস্তি টেকে না। এটাই ন্যাচারাল জাস্টিসের সৌন্দর্য। এটা কেবল আইনের ভাষায় কথা বলে না, এটা মানবিক বিবেকের ভাষায় কথা বলে।

আমার মনে পড়ছে ছোটবেলার একটা ঘটনা। স্কুলে একবার ক্লাসের জানালার কাচ ভেঙে গেল। হেডস্যার সবাইকে লাইনে দাঁড় করালেন। তারপর যে ছেলেটা সবচেয়ে দুষ্টু, তাকে ডেকে বললেন, "তুই ভেঙেছিস, তাই না?" ছেলেটা বলল, "না স্যার, আমি করিনি।" হেডস্যার বললেন, "তুই মিথ্যা বলছিস। তুই সবসময় দুষ্টামি করিস।" ছেলেটাকে শাস্তি দেওয়া হলো। পরদিন জানা গেল, আসলে অন্য একটা ছেলে লুকিয়ে বল দিয়ে খেলতে গিয়ে কাচ ভেঙেছিল। হেডস্যার পূর্ব ধারণা দিয়ে বিচার করেছিলেন। তদন্ত করেননি। অন্য পক্ষের কথা শোনেননি। আর যাকে সন্দেহ করেছিলেন, তাকেই দোষী ধরে নিয়েছিলেন। এটাই ন্যাচারাল জাস্টিসের লঙ্ঘন। ছোট স্কুলে হোক বা বড় কর্পোরেট অফিসে, নীতিটা এক।

চায়ের দোকান থেকে বের হওয়ার পর অনেকক্ষণ হাঁটলাম। মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল। এই দেশে, এই শহরে, এই মুহূর্তে, করিমের মতো কতজন মানুষ আছে? যারা প্রতিদিন অফিসে যাচ্ছে। কাজ করছে। এবং ভেতরে ভেতরে জানছে যে তাদের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ হচ্ছে না, কিন্তু কিছু করার নেই বলে মনে করছে। হয়তো অনেকজন।

কিন্তু আসলে কিছু করার আছে। আইন আছে। আদালত আছে। এবং আদালত এই বিষয়গুলো খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন। প্রতিষ্ঠান শৃঙ্খলা রাখবে, এটা ঠিক আছে। শৃঙ্খলা ছাড়া প্রতিষ্ঠান চলে না। কিন্তু শৃঙ্খলার নামে যদি কাউকে অবিচার করা হয়, তাহলে সেটা শৃঙ্খলা নয়, সেটা ক্ষমতার অপব্যবহার। একটা ভালো প্রতিষ্ঠান শৃঙ্খলা এবং সুবিচার দুটোই একসঙ্গে রাখতে পারে। এই ভারসাম্যটাই একটা প্রতিষ্ঠানকে শুধু বড় নয়, মানবিক করে তোলে।

বাসায় ফিরে রাতে ঘুমাতে পারছিলাম না। করিমের কথা মনে পড়ছিল। তার ক্লান্ত চোখের কথা। জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবলাম, এই শহরে কত মানুষ এখন ঘুমাতে পারছে না। কত মানুষ কত রকম কষ্ট বুকে নিয়ে শুয়ে আছে। কেউ কেউ হয়তো আমার মতোই জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। এই শহরটা অনেক বড়। অনেক জটিল। কিন্তু মানুষের মনের দুঃখটা খুব সরল। তারা শুধু চায়, কেউ তাদের কথাটা শুনুক।

করিমও সেটাই চেয়েছিল। আমি শুনেছিলাম। কিন্তু আমার শোনায় তার চাকরির সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। তবু সে হয়তো একটু হালকা হয়েছিল। মানুষ কখনো কখনো সমাধান নয়, শুধু একজন শ্রোতা খোঁজে।