ফজলুল করিম সাহেব ব্যাংকের ডিজিএম হয়ে এসেছেন তিন মাস। তাঁর আগে যিনি ছিলেন, রফিকুল ইসলাম সাহেব, তিনি রিটায়ার করেছেন। রফিকুল সাহেব সম্পর্কে অফিসে একটা কথা চালু ছিল: "স্যার চেয়ারে বসলে চেয়ারটাও ভয় পায়।"
ফজলুল করিম সাহেব সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ। প্রথম দিন অফিসে এসে তিনি পিয়নকে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার নাম কী?"
পিয়ন আবুল কালাম একটু ঘাবড়ে গেল। এত বড় অফিসার নাম জিজ্ঞেস করছেন, এটা তার অভিজ্ঞতায় নেই। সে বলল, "জি স্যার, আবুল কালাম।"
"কালাম ভাই, আমাকে এক কাপ চা দেবেন? দুধ একটু কম দেবেন।"
কালাম প্রায় হোঁচট খেয়ে পড়ল। ডিজিএম সাহেব তাকে "ভাই" বলেছেন। এই ঘটনা দুপুরের মধ্যে পুরো অফিসে ছড়িয়ে গেল।
ফজলুল করিম সাহেবের একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে। তিনি মিটিংয়ে সবার শেষে কথা বলেন। প্রথমে সবাইকে বলতে দেন, জুনিয়র অফিসারদেরও। এমনকি প্রবেশনারি অফিসার নাজমুল, যে মাত্র ছয় মাস আগে জয়েন করেছে, তাকেও জিজ্ঞেস করেন, "নাজমুল, তোমার কী মনে হয়?"
নাজমুল প্রথমবার এই প্রশ্ন শুনে এতটাই চমকে গিয়েছিল যে কিছুক্ষণ কথাই বলতে পারেনি। পরে সে তার বন্ধু রাকিবকে ফোন করে বলেছিল, "তুই বিশ্বাস করবি না। ডিজিএম সাহেব আমার মতামত চাইছেন। আমার! ছয় মাসের প্রবেশনারি অফিসারের!"
রাকিব বলল, "লোকটা কি পাগল?"
নাজমুল বলল, "পাগল না। লোকটা অদ্ভুত।"
অফিসে একটা বড় সমস্যা হলো। এক কর্পোরেট ক্লায়েন্টের ঋণ নবায়নের ফাইলে গুরুতর ত্রুটি ধরা পড়ল। ক্রেডিট বিভাগের সিনিয়র অফিসার মনিরুল সাহেব দায়ী, এটা সবাই জানে। আগের ডিজিএম হলে মনিরুল সাহেবকে শোকজ করা হতো। হয়তো সাসপেনশন হতো। অফিসে একটা ভয়ের আবহ তৈরি হতো।
ফজলুল করিম সাহেব মনিরুল সাহেবকে ডাকলেন। দরজা বন্ধ করলেন। বাইরে সবাই কান পাতল। ভেতর থেকে কোনো চিৎকার এলো না। আধা ঘণ্টা পর মনিরুল সাহেব বের হলেন। তাঁর চোখ একটু লাল। কিন্তু মুখে একটা অদ্ভুত স্বস্তির ভাব।
পরে মনিরুল সাহেব তার সহকর্মী কে আমীনকে ললেন, "জানো স্যার কী বললেন? বললেন যে ভুল হতেই পারে। আমিও ভুল করি। কিন্তু ভুল থেকে শেখাটাই আসল। তুমি বলো, কোথায় সমস্যা হলো, আমরা একসাথে ঠিক করি।"
আমীন বলল, "সত্যি?"
মনিরুল সাহেব বললেন, "সত্যি। এবং সবচেয়ে বড় কথা, স্যার বললেন যে এই ফাইলের সমস্যাটা শুধু তোমার একার না। সিস্টেমেও গলদ আছে। আমরা সিস্টেমটাও দেখব।"
অফিসে একটা পরিবর্তন আসতে শুরু করল। ধীরে ধীরে, অনেকটা শীতের সকালে রোদ ওঠার মতো। টের পাওয়া যায় না, কিন্তু একসময় দেখা যায় চারদিক উষ্ণ হয়ে গেছে।
জুনিয়র অফিসাররা মিটিংয়ে কথা বলতে শুরু করল। আগে তারা চুপ করে বসে থাকত, নোট নিত, মাথা নাড়ত। এখন তারা আইডিয়া দেয়। কেউ কেউ খুব ভালো আইডিয়া দেয়। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের একটা নতুন প্রস্তাব এসেছে প্রবেশনারি অফিসার তানজিনার কাছ থেকে। ফজলুল করিম সাহেব সেটা ম্যানেজমেন্টে পাঠিয়েছেন, তানজিনার নামে।
তানজিনা যখন জানল তার নামে প্রস্তাবটা গেছে, সে বিশ্বাসই করতে পারেনি। সে ভেবেছিল স্যার নিজের নামে পাঠাবেন। বড় অফিসাররা তো সবসময় তাই করেন। জুনিয়রদের আইডিয়া নিজের বলে চালিয়ে দেন।
তানজিনা ফজলুল করিম সাহেবের রুমে গিয়ে বলল, "স্যার, আপনি আমার নামে..."
ফজলুল করিম সাহেব হাসলেন। তাঁর হাসিটা খুব সাধারণ। বললেন, "আইডিয়া তো তোমার। আমার নামে পাঠালে সেটা চুরি হয়ে যেত।"
তানজিনা কিছু বলতে পারল না। চোখ একটু ভিজে গেল।
কিন্তু সবাই কি ফজলুল করিম সাহেবকে পছন্দ করে? না। অফিসে কয়েকজন সিনিয়র অফিসার আছেন যাঁরা তাঁকে "দুর্বল" মনে করেন। তাঁরা বলেন, "এত নরম হলে চলে? ব্যাংকিং তো আর সমাজসেবা না।"
এসব কথা ফজলুল করিম সাহেবের কানে যায়। তিনি কিছু বলেন না। শুধু একটু হাসেন।
একদিন এভিপি জাহাঙ্গীর সাহেব সরাসরি বললেন, "স্যার, আপনি সবাইকে এত সুযোগ দিচ্ছেন। জুনিয়ররা মাথায় উঠবে।"
ফজলুল করিম সাহেব চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। বললেন, "জাহাঙ্গীর সাহেব, একটা গাছ যখন বড় হয়, তখন সে নিচু হয়ে যায়। ফলের ভারে। যে গাছে ফল নেই, সে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।"
জাহাঙ্গীর সাহেব কিছু বলতে পারলেন না।
বছরের শেষে ব্রাঞ্চের পারফরম্যান্স রিভিউ হলো। ফলাফল দেখে সবাই অবাক। ফজলুল করিম সাহেবের অধীনে থাকা ব্রাঞ্চগুলোর পারফরম্যান্স ২৩ শতাংশ বেড়েছে। স্টাফ টার্নওভার কমেছে। কমপ্লায়েন্স ইস্যু প্রায় শূন্যের কাছে।
হেড অফিসে প্রেজেন্টেশনের সময় এমডি সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, "ফজলুল সাহেব, আপনার সিক্রেট কী?"
ফজলুল করিম সাহেব বললেন, "কোনো সিক্রেট নেই স্যার। আমি শুধু মানুষগুলোকে কথা বলতে দিয়েছি। শুনেছি। আর যেখানে আমি জানি না, সেটা স্বীকার করেছি।"
এমডি সাহেব একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, "এটাই তো সবচেয়ে কঠিন কাজ।"
অফিস শেষে ফজলুল করিম সাহেব হেঁটে বাসস্ট্যান্ডে যান। তাঁর গাড়ি আছে, কিন্তু তিনি মাঝে মাঝে হাঁটতে পছন্দ করেন। পথে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা খান। দোকানদারকে জিজ্ঞেস করেন, "ব্যবসা কেমন?"
দোকানদার জানে না এই ভদ্রলোক একটা ব্যাংকের ডিজিএম। সে শুধু জানে, লোকটা ভালো। কথা বলতে ভালো লাগে।
একদিন দোকানদার জিজ্ঞেস করল, "আপনি কী করেন?"
ফজলুল করিম সাহেব বললেন, "চাকরি করি।"
"কোথায়?"
"একটা ব্যাংকে।"
"কী করেন ব্যাংকে?"
ফজলুল করিম সাহেব একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, "মানুষের কথা শুনি।"
দোকানদার হাসল। বলল, "সেটাও একটা কাজ নাকি?"
ফজলুল করিম সাহেব চায়ে চুমুক দিলেন। বললেন, "সবচেয়ে কঠিন কাজ।"
রাতে বাসায় ফিরে ফজলুল করিম সাহেব বারান্দায় বসেন। ঢাকা শহরের আকাশে তারা দেখা যায় না। কিন্তু তিনি জানেন তারা আছে। মেঘ আর ধোঁয়ার আড়ালে লুকিয়ে আছে।
তাঁর মনে পড়ে তাঁর বাবার কথা। বাবা ছিলেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। সারাজীবন মানুষকে শিখিয়েছেন। কিন্তু নিজে বলতেন, "আমি এখনো শিখছি।"
বাবা আরেকটা কথা বলতেন যা ফজলুল করিম সাহেব কখনো ভোলেননি: "যে মানুষ নিজেকে ছোট করতে পারে, সে আসলে সবচেয়ে বড়।"
ফজলুল করিম সাহেব জানেন যে এই কথাটা পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করে না। মানুষ বিশ্বাস করে পদ, ক্ষমতা, টাকা, এসবই মানুষকে বড় করে। কিন্তু তিনি দেখেছেন যে পদ চলে যায়। ক্ষমতা চলে যায়। টাকাও চলে যায়। যা থাকে, সেটা হলো মানুষের মনে একটুকরো জায়গা।
সেই জায়গাটুকু পেতে হলে বিনয় লাগে। আর বিনয় কোনো দুর্বলতা নয়। এটা একটা শক্তি। পৃথিবীর সবচেয়ে নীরব শক্তি।
পরদিন সকালে অফিসে ঢুকতে ঢুকতে ফজলুল করিম সাহেব দেখলেন কালাম দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। কালাম বলল, "স্যার, আজ চা কেমন করে দেব?"
ফজলুল করিম সাহেব হাসলেন। বললেন, "আজ তুমি ঠিক করো কালাম ভাই। তুমি তো আমার চেয়ে চা বেশি বোঝো।"
কালাম হাসল। জীবনে প্রথমবার সে অনুভব করল যে সেও গুরুত্বপূর্ণ। তারও মতামত আছে। তারও একটা পরিচয় আছে।
এবং সেই মুহূর্তে, সেই ছোট্ট হাসির মধ্যে, বিনয়ের আসল অর্থটা ফুটে উঠল। পদবি মানুষকে ক্ষমতা দেয়। কিন্তু বিনয় মানুষকে প্রভাব দেয়। আর প্রভাব, সেটাই তো আসল শক্তি।
সমাপ্ত।
এই লেখাটি ভাল লাগলে "একজন এইচআর পেশাদারের চোখে ফজলুল করিম সাহেবের চরিত্র বিশ্লেষণ" লেখাটিও পড়তে পারেন ৷