এই লেখাটি পড়ার আগে ফজলুর করিম সাহেবের গল্প টি পড়ে আসুন ৷
আমি এইচআর-এ কাজ করি।
অনেকে জিজ্ঞেস করে, "এইচআর মানে কী করো আসলে?"
আমি বলি, "মানুষের কষ্টের কথা শুনি।"
তারা একটু অবাক হয়। ভাবে, এটা আবার কোনো কাজ?
আমিও মাঝে মাঝে ভাবি।
ভয় দিয়ে অফিস চলে, মানুষ চলে না
রফিকুল ইসলাম সাহেব সম্পর্কে একটা কথা চালু ছিল: "স্যার চেয়ারে বসলে চেয়ারটাও ভয় পায়।"
হাসির গল্প। কিন্তু ভেতরে একটা বেদনা আছে।
আমরা এইচআর-এ এটাকে বলি Toxic Culture বাংলায় বললে, ভয়ের সংস্কৃতি। যেখানে মানুষ কাজ করে, কিন্তু মনটা পড়ে থাকে ঘরে। যেখানে অফিসার সভায় বসে মাথা নাড়ে, কিন্তু ভেতরে ভাবে, "কথা বললে বিপদ।"
এই পরিবেশে পারফরম্যান্স হয়। কিন্তু খুব ধীরে ধীরে ভেতর থেকে একটা ক্ষয় হতে থাকে। মানুষ ছেড়ে চলে যায়। ভালো আইডিয়াগুলো জন্মের আগেই মরে যায়। আর একদিন দেখা যায়, অফিসটা চলছে বটে, কিন্তু আসলে কেউ নেই।
ফজলুল করিম সাহেব সেই অফিসে এলেন। আর প্রথম দিন পিয়নকে বললেন, "কালাম ভাই।"
শুধু একটা "ভাই"। কিন্তু সেই একটা শব্দে পুরো অফিসের দেওয়াল একটু কাঁপল।
নেতা সবার শেষে কথা বলে
ফজলুল করিম সাহেবের একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে। তিনি মিটিংয়ে সবার শেষে কথা বলেন।
এটা শুনতে ছোট ব্যাপার। আসলে এটা অনেক বড়।
যে নেতা আগে কথা বলে, বাকি সবাই তার কথার সাথে মাথা মেলায়। কারণ কে আর ডিজিএম সাহেবের সাথে দ্বিমত করতে যাবে? ফলে সভায় অনেক মুখ থাকে, কিন্তু কণ্ঠ থাকে একটাই।
আর যে নেতা শেষে কথা বলে, সে আগে শোনে। সবার কথা শোনে। জুনিয়র অফিসারের কথা শোনে। এমনকি ছয় মাসের প্রবেশনারি অফিসার নাজমুলেরও।
নাজমুল প্রথমবার ডিজিএম সাহেবের কাছ থেকে প্রশ্ন পেয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। তারপর বন্ধুকে ফোন করে বলেছিল, "তুই বিশ্বাস করবি না।"
এইচআর-এ এটাকে বলি Psychological Safety। মানে, কথা বললে বিপদ হবে না এই নিশ্চয়তা। এই নিশ্চয়তা ছাড়া মানুষ কখনো সত্যিকারের কাজ করতে পারে না।
গবেষণা বলে, এই নিরাপত্তাবোধ না থাকলে অফিসে সেরা আইডিয়াগুলো কখনো বাইরে আসে না। সেগুলো ডেস্কের ড্রয়ারে পড়ে থাকে। অথবা মানুষের বুকের ভেতরে।
মানুষ দোষী নয়, সিস্টেম দায়ী
মনিরুল সাহেব ভুল করেছেন। ক্রেডিট ফাইলে গলদ।
পুরনো পৃথিবীতে কী হতো? শোকজ। হয়তো সাসপেনশন। একটা ভয়ের বার্তা, যাতে বাকিরা ঠিকঠাক থাকে।
কিন্তু ফজলুল করিম সাহেব বললেন, "ভুল থেকে শেখাটাই আসল।" তারপর বললেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা: "সমস্যা শুধু তোমার একার না। সিস্টেমেও গলদ আছে।"
এই কথাটা বলতে অনেক সাহস লাগে। কারণ এই কথাটা স্বীকার করে যে আমরাও দায়ী। প্রতিষ্ঠানও দায়ী।
আমরা এইচআর-এ বলি, Blame Culture থেকে বেরিয়ে Learning Culture তৈরি করো। কিন্তু করা সহজ না। কারণ শাস্তি দেওয়া সহজ, বোঝা কঠিন।
মনিরুল সাহেব সেই ঘরে থেকে বের হয়েছিলেন চোখ লাল করে। কিন্তু মুখে একটা অদ্ভুত স্বস্তি ছিল।
সেই স্বস্তিটাই আসল। ওটাই মানুষকে আবার কাজে ফেরায়। ভয় দিয়ে মানুষ কাজ করে, কিন্তু সম্মান দিয়ে মানুষ প্রাণ ঢেলে কাজ করে।
চুরি না করা একটা নেতৃত্বের গুণ
তানজিনা একটা আইডিয়া দিয়েছিল। ডিজিটাল ব্যাংকিং নিয়ে। ভালো আইডিয়া।
ফজলুল করিম সাহেব সেটা তার নিজের নামে পাঠাননি। তানজিনার নামে পাঠিয়েছেন।
এই ঘটনাটা শুনতে স্বাভাবিক মনে হয়। আসলে এটা ব্যতিক্রম।
আমরা কর্পোরেট জগতে কতবার দেখেছি, জুনিয়রের আইডিয়া সিনিয়রের প্রেজেন্টেশনে যায়। কতবার দেখেছি, পরিশ্রমের কৃতিত্ব অন্য কারো ঘরে যায়।
তানজিনা সেদিন কাঁদেনি। কিন্তু চোখ ভিজে গিয়েছিল।
সেই চোখের জলের মধ্যে একটা বড় সত্য ছিল। মানুষ স্বীকৃতির জন্য প্রাণ দিতে পারে। আর এইচআর-এর ভাষায়, Recognition একটি সবচেয়ে সস্তা অথচ সবচেয়ে কার্যকর engagement টুল।
টাকা ছাড়া, পদোন্নতি ছাড়া, শুধু একটু স্বীকৃতিতে মানুষ আরও পাঁচ বছর প্রতিষ্ঠানে থাকে।
পদবী ক্ষমতা দেয়, বিনয় প্রভাব দেয়
জাহাঙ্গীর সাহেব বলেছিলেন, "জুনিয়ররা মাথায় উঠবে।"
এই ভয়টা অনেকের আছে। সিনিয়র অফিসাররা ভাবেন, সীমানা না রাখলে শৃঙ্খলা নষ্ট হয়।
ফজলুল করিম সাহেব একটা কথা বলেছিলেন। গাছের গল্প। ফলের ভারে যে গাছ নুয়ে পড়ে, সেই গাছেই ফল থাকে।
বছরের শেষে সংখ্যাটা বলে দিয়েছে। পারফরম্যান্স বেড়েছে ২৩ শতাংশ। স্টাফ টার্নওভার কমেছে। কমপ্লায়েন্স ইস্যু প্রায় শূন্য।
এটাকে আমরা এইচআর-এ বলি Sustainable Performance through Culture। মানে, চাপ দিয়ে নয়, পরিবেশ তৈরি করে ফলাফল আনা।
চাপের ফলাফল তাৎক্ষণিক। কিন্তু সেটা দীর্ঘস্থায়ী নয়। পরিবেশের ফলাফল ধীর। কিন্তু একবার তৈরি হলে সহজে ভাঙে না।
এইচআর আসলে কী করে?
এমডি সাহেব জিজ্ঞেস করেছিলেন, "সিক্রেট কী?"
ফজলুল করিম সাহেব বলেছিলেন, "কোনো সিক্রেট নেই। আমি শুধু মানুষগুলোকে কথা বলতে দিয়েছি। শুনেছি। আর যেখানে আমি জানি না, সেটা স্বীকার করেছি।"
এমডি সাহেব বলেছিলেন, "এটাই তো সবচেয়ে কঠিন কাজ।"
এইটুকু কথার মধ্যে পুরো এইচআর-এর দর্শন আছে।
শোনা। বিশ্বাস করা। নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা।
আমরা এইচআর পেশাদাররা পলিসি বানাই, প্রক্রিয়া তৈরি করি, প্রশিক্ষণ পরিচালনা করি। কিন্তু আমাদের আসল কাজ হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যেখানে মানুষ তার সেরাটা দিতে পারে।
সেই পরিবেশ তৈরি হয় না কড়াকড়ি দিয়ে। হয় বিশ্বাস দিয়ে।
আমরা কী চাই?
একটু থামি।
আমরা এইচআর পেশাদার হিসেবে কী প্রতিষ্ঠা করতে চাই?
চাই যে মনিরুল সাহেবরা ভুলের পর সংকুচিত না হোক, বরং শিখুক।
চাই যে তানজিনারা জানুক তাদের আইডিয়া তাদেরই থাকবে।
চাই যে নাজমুলরা মিটিংয়ে মুখ খুলতে পারুক, ভয়ে নয়, আগ্রহে।
চাই যে কালামরা জানুক সে গুরুত্বপূর্ণ, শুধু চা বানায় বলেই নয়, মানুষ বলেই।
এই চাওয়াগুলো পলিসি দিয়ে হয় না। হয় সংস্কৃতি দিয়ে। আর সংস্কৃতি তৈরি হয় একজন ফজলুল করিম সাহেবের মতো মানুষ দিয়ে।
আমাদের কাজ হলো, সেই মানুষটাকে চেনা। তাকে সুযোগ দেওয়া। আর সম্ভব হলে, নিজেরাও একটু সেই মানুষটার মতো হওয়ার চেষ্টা করা।
শেষে একটা ছোট কথা
চায়ের দোকানদার জিজ্ঞেস করেছিল, "আপনি কী করেন?"
ফজলুল করিম সাহেব বলেছিলেন, "মানুষের কথা শুনি।"
দোকানদার অবাক হয়েছিল। বলেছিল, "সেটাও একটা কাজ নাকি?"
আমি এইচআর-এ কাজ করি। এই প্রশ্নটা আমার কাছেও আসে।
আমি এখন বলি, হ্যাঁ।
সবচেয়ে কঠিন কাজ।
কারণ মানুষের কথা সত্যিকার অর্থে শুনতে হলে আগে নিজেকে একটু ছোট করতে হয়। নিজের পদবী, নিজের অভিজ্ঞতা, নিজের "আমি জানি" ভাবটা একটু সরিয়ে রাখতে হয়।
এবং সেই ছোট হওয়ার মধ্যেই, ফজলুল করিম সাহেবের মতো, আসল বড় হওয়াটা লুকিয়ে থাকে।